৩০ অক্টোবর আমরা আমাদের প্রতিবেদনে বলেছিলাম ‘তিন শূন্যর পর শনিবারের ভোট শেষে তৃণমূল আবারও চার শূন্য’ হলও ঠিক তাই। বাংলার মাটি দখলের রাজনীতিতে গেরুয়া শিবির যে লক্ষ মাইল পিছিয়ে, তার প্রমাণ মিলল রাজ্যের চার উপনির্বাচনের ফলাফলে। একুশের বিধানসভার পর পদ্ম বাগান ফের একবার দুর্মুশ হল জোড়া ফুলের দাপটে। গোসাবা, দিনহাটাতে তৃণমূল কেবলমাত্র যে রেকর্ড ব্যবধানে জয় পেল তাই নয়, গত বিধানসভা নির্বাচনে জেতা আসন দুটিও এবার আর ধরে রাখতে পারল না বিজেপি। বিজেপির দখলে থাকা দিনহাটা ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০৯ ভোটে জিতে নিয়েছেন উদয়ন গুহ। অন্যদিকে, খড়দহে বিজেপি কেবল তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হারেনি বামেরা এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থান দখল করে বিজেপিকে তৃতীয় স্থানে সরিয়ে দিয়েছে।
একুশের বিধানসভা ভোটেও বিজেপি উত্তরবঙ্গে কিছুটা ভাল ফল করেছিল। কিন্তু সেই গেরুয়া-গড় কোচবিহারে তৃণমূলের ধাক্কায় বিজেপি কার্যত কুপোকাত। দিনহাটায় তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ বিজেপি প্রার্থী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আসন কেড়ে নিয়েছেন রেকর্ড ভোটে জিতে। গত ভোটে এই কেন্দ্রে বিজেপি মান রক্ষা করেছিল তৃণমূলের হেভিওয়েট প্রার্থী উদয়ন গুহকে হারিয়ে। যদিও ব্যবধান ছিল মাত্র ৫৭ ভোটের। ৬ মাসের মধ্যে উপনির্বাচনে বিজেপি হারল ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮০৯ ভোটে। এককথায় রেকর্ড ভোটে জয়। এক কথায় এই ব্যবধান বিগত দিনের সমস্ত নির্বাচনী রেকর্ড ভেঙে দিল।
নদিয়ার শান্তিপুরে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে জয় হাসিল করেছিল বিজেপি। এবার আর বিজেপি সেই কেন্দ্র ধরে রাখতে পারল না। তৃণমূল প্রার্থী ব্রজকিশোর গোস্বামী এই আসনে প্রায় ৬৪,৬৭৫ হাজারের ভোটে জিতলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে সাংসদ জগন্নাথ সরকার এখানে ৩০ হাজারেরও বেশী ভোটে জয় পেয়েছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের পর সাংসদ হিসাবেই থাকতে চেয়ে জগন্নাথবাবু বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। ফলে বঙ্গ বিজেপির কাছে আসনটি ধরে রাখাটা রীতিমত চ্যালেঞ্জের ছিল। কিন্তু তৃণমূলের সুনামিতে বিজেপি উড়ে গেল। ঠাকুরবাড়ির সদস্য ব্রজো কিশোর গোস্বামী মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট টেনে ৬০ হাজারের বেশি ব্যবধানে জেতাটা এই উপনির্বাচনে তৃণমূলের মাস্টারস্ট্রোক। গত লোকসভা থেকে একুশের বিধানসভা নির্বাচনেও মতুয়াদের একটা অংশ বিজেপির সঙ্গেই ছিল। কিন্তু বিজেপি সরকার এখনও নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করার সাহস দেখাতে পারেনি। এই ফলাফলে এখানে যে বিজেপির বিরুদ্ধে মতুয়াদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তা কার্যত স্পষ্ট।
প্রসঙ্গত; উপনির্বাচনের এই চার কেন্দ্রের একমাত্র গোসাবা কেন্দ্রটি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত। গোসাবায় তফসিলি জাতির আনুমানিক হার ৬১.৫৮ শতাংশ। তফসিলি উপজাতির আনুমানিক হার ৯.৯৬ শতাংশ এবং মুসলিম জনসংখ্যার আনুমানিক হার ১৩ শতাংশ। একুশে এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী জয়ন্ত নস্কর জিতেছিলেন ২৩,৭০৯ ভোটে। এখানে তৃণমূল পেয়েছিল ১ লক্ষ ৫ হাজার ৭২৩ ভোট আর বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন ৮২ হাজার ১৪ ভোট। ভোটের ফল প্রকাশের পর করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় জয়ন্ত নস্করের। কিন্তু ৬ মাস বাদে উপনির্বাচনে হিসেব গেল বদলে। এ বার সুব্রত মণ্ডল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫১ ভোটে জিতেছেন। ব্যবধান গুনে গুনে ৬ গুণ বাড়িয়েছেন সুব্রত। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে সবথেকে বেশি ভোটে জয়ের রেকর্ড ছিল আবদুল গনির। মালদহের সুজাপুর থেকে তৃণমূল প্রার্থী আবদুল গনি জিতেছিলেন ১ লক্ষ ২৯ হাজার ভোটে।
আপাতদৃষ্টিতে উল্লেখিত তিন কেন্দ্রের ফলাফলের সঙ্গে খড়দহের বিশেষ কোনও পার্থক্য নেই। তবে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল এবং সাম্প্রতিককালে সম্ভবত এই উপনির্বাচনেই প্রথম ঘটল এমনটা, প্রথম রাউন্ডের গণনা থেকেই সিপিএম প্রার্থী বিজেপি-কে পিছিয়ে তার পরবর্তী স্থানে রেখে দেয়। তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব সব সময়েই এগিয়ে ছিলেন, পাশাপাশি বাম প্রার্থী দেবজ্যোতি শুরু থেকেই বিজেপি-কে তৃতীয় স্থানে সরিয়ে উঠে এসেছেন। তবে শোভনদেবের ধারেকাছে ছিলেন না বিরোধীরা। একুশের ভোটে দেবজ্যোতি খড়দহ কেন্দ্রে ছিলেন তৃতীয় স্থানে। পেয়েছিলেন ২৬,৯১৬ ভোট। যা মোট ভোটের ১৪.৭০ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন ৬১,৬৬৭ ভোট, অর্থাৎ ৩৩.৬৭ শতাংশ ভোট। উল্লেখ্য; বিজেপি একুশের ভোটে তবু লড়াই দিতে সক্ষম হয়েছিল কিন্তু ছ’মাস পরে উপনির্বাচনে তারা একেবারেই হারিয়ে গেল। অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থীরা নির্বাচনে ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়ে ফেললেন। তৃণমূলের কেউ এত ব্যবধানে আগে জেতেনি। সেই রেকর্ড দিনহাটায় সবথেকে বেশি ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮০৯ এরপর গোসাবায় ১ লক্ষ ৪৩ হাজার ৫১, খড়দহে ৯৩ হাজার ৮৩২ এবং শান্তিপুরে ৬৪,৬৭৫ হাজার।