দেখা গেছে কলকাতা এবং সংলগ্ন শহরাঞ্চলে ভোটের হার গ্রামীণ এলাকার চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম হয়। সেই প্রবণতা আরও একবার দেখা গেল রাজ্যের চার কেন্দ্রের উপনির্বাচনে। শনিবার নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা পর্যন্ত নদিয়ার শান্তিপুর কেন্দ্রে ভোটদানের হার ছিল ৭৬.১৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবায় ৭৫.৯১ শতাংশ। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা কেন্দ্রে ৬৯.৯৭ শতাংশ এবং উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহে ভোট শতাংশ ৬৩.৯০।
বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ঘটনা ছাড়া চার কেন্দ্রেই ভোট মোটের উপর শান্তিপূর্ণ। উল্লেখ্য, যে চারটি কেন্দ্রে শনিবার উপনির্বাচন হল তার দু’টিতে বিজেপি ও বাকি দু’টিতে জয় হাসিল করেছিল তৃণমূল। এবার দেখার যে, এই উপনির্বাচনে গেরুয়া বাহিনী তাদের নিজেদের গড় ধরে রাখতে পারে কিনা। অন্যদিকে, বিধানসভায় তৃণমূলের নিজেদের আসন বেড়ে কোথায় দাঁড়ায়। এদিনে ভোটে শান্তিপুরে হয়েছে চতুর্মুখী লড়াই বাকি তিনটিতে ত্রিমুখী।
১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে বিজেপি ভালো ফল করেছিল। একুশের বিধানসভাতে সেই রেশ পুরোটা ধরে রাখতে না পারলেও সারা বাংলার প্রেক্ষিতে বিজেপিকে একমাত্র খুজে পাওয়া যায় উত্তরে। কোচবিহারের দিনহাটা কেন্দ্র থেকে বিজেপির সাংসদ প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক জিতেছিলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনের ফল অনুযায়ী দিনহাটা বিজেপির জেতা আসন। তার মানে এই উপনির্বাচনে গেরুয়া বাহিনীর জন্য গড় ধরে রাখারা লড়াই। কিন্তু, এদিন দেখা গেল খোদ কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকের বুথেই বিজেপি পোলিং এজেন্ট দিতে পারলো না।
প্রসঙ্গত গত বিধানসভা ভোটে দিনহাটার ফলাফলে জয়ী হয়েছিল বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক কিন্তু সেই জয়ে ব্যবধান ছিল মাত্র ৫৭ ভোটের। বিজেপির কাছে এই উপনির্বাচন প্রেস্টিজ ফাইট। আসনটি টিকিয়ে রাখতে তারা মরিয়া। কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াইতে ৫৭ ভোটের থেকে ব্যবধান বাড়ানো কি তাদের পক্ষে আজ সম্ভব?
বিধানসভা ভোটে নিদারুণভাবে স্বপ্নভঙ্গের পর দিনহাটার মতো শান্তিপুরের জেতা আসন ধরে রাখতে মরিয়া বিজেপি। কিন্তু ছ’মাস আগেই বাংলার বিধানসভা ভোটের ফলাফলে ঝড় তুলে দিয়েছিল তৃণমূল। সেই ঝোড়ো হাওয়া যে এখনও জোড়াফুলের দিকেই বইছে, তৃণমূলের পক্ষে সেটা প্রমান করা যতটা সহজ ভাঙনের স্রোত বওয়া বিজেপি শিবিরের পক্ষে ঠিক ততটাই কঠিন। এবার দিনহাটা ও শান্তিপুর আসনে তৃণমূলের জয় বুঝিয়ে দিতে পারবে বিজেপি রাজবংশী বা মতুয়া ভোটের একচেটিয়া অধিকারী নয়। প্রসঙ্গত যে চারটি আসনে এদিন ভোটগ্রহণ হল তার মধ্যে দু’টিতে তৃণমূল আগেও জিতেছিল। এবার এই দু’টি আসনে তৃণমূল জয়ের ব্যবধান বাড়ানোর পাশাপাশি বাকি দু’টি আসনও বিজেপি-র কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
একুশের বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পরে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি কার্যত ছন্নছাড়া। উপরন্তু দলে ভাঙনের স্রোত অব্যাহত। ভোটের পর ছ’মাস কেটে গেলেও তাঁরা সেই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। উপনির্বাচনে লড়াইতে ফিরে আসতে যে বারতি উৎসাহ দরকার পড়ে সেই মনোবলেও যথেষ্ট ঘাটতি। অন্যদিকে তৃণমূল চাইছে চার-শূন্য ফলে জিতে বিজেপি-কে আরও জোর ধাক্কা দিতে। বস্তুতপক্ষে এই উপনির্বাচন নিয়ে তেমন কোনও চাপ নেই তৃণমূলের। তারা সহজ জয় হাসিল করবে এমন একটা ভাবনানিয়েই অপেক্ষা করছে। অন্যদিকে ভোটে বিপর্যস্ত বিজেপি থেকে ইতিমধ্যেই পাঁচ বিধায়ক তৃণমূলে নাম লিখিয়েছেন। তৃণমূলের লক্ষ্য এই উপনির্বাচনে আরও শক্তিবৃদ্ধি করা। সেই লক্ষ্য পূরণ হলে আরও কয়েকজন বিজেপি বিধায়ক দল ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেবে।
ভোটে উত্তেজনামূলক ঘটনা ঘটেই থাকে। তুলনায় কম শক্তিশালী হওয়ার কারণে বিরোধী দল শাসক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এদিনও জাল ভোটার ঘিরে খড়দহে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্বভাবতই বিজেপি প্রার্থীর নিশানায় ছিল শাসক দল তৃণমূল। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী খড়দহের তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে দেখা গেল পার্টি অফিসে বসে তিনি ডাবের জল পান করছেন। অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী জয় সাহাকে দেখা গেল খড়দহের মুড়াগাছায় গাড়ি থেকে নেমে তিনি ধাওয়া করলেন জাল ভোটার ধরতে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবরে জানা যায় ৯২ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে গোসাবাতে ২৩ কোম্পানি, খড়দহে ২০ কোম্পানি, দিনহাটাতে ২৭ কোম্পানি ও শান্তিপুরে ২২ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন করে এদিন ভোট হয়েছে। গোসাবা ও শান্তিপুরে ভোট নির্বিঘ্ন ভাবে হলেও দিনহাটা ও খড়দহে বিক্ষিপ্ত অশান্তি হয়েছে। এই উপনির্বাচনে দিনহাটা ও শান্তিপুর দুটি কেন্দ্রেই জয় পাওয়া তৃণমূল ও বিজেপির কাছে রীতিমত প্রেস্টিজ ফাইট। কেননা এই দুই কেন্দ্রে একুশের নির্বাচনে জয়ের মুখ দেখেছিল বিজেপি। বিজেপি চায় সেই জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে তা না বিজেপির মুখ পুড়বে। অন্যদিকে একুশের বিধানসভা ভোটের ফলাফলের ঝড়েই বিজেপি উড়ে যাবে বলে আশা রাখে তৃণমূল।