বাবুল সুপ্রিয় পদ্মশিবির ছেড়ে ঘাসফুলে যোগ দিলে আসানসোলের সাংসদ পদটি খালি হয়। অন্যদিকে বালিগঞ্জের বিধায়ক সুব্রত মুখোপাধ্যায় গত বছর কালীপুজোর দিন প্রয়াত হওয়ায় ওই বিধানসভা কেন্দ্রটি এতদিন ফাঁকা পড়েছিল। মঙ্গলবার ছিল ওই দুটি কেন্দ্রের উপনির্বাচন। আসানসোলে বাবুল সুপ্রিয় পরপর দুটি লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে জেতায় কেন্দ্রটি গেরুয়া গড় বলেই পরিচিত। তাহলে কী এবারও আসানসোলে পদ্মফুল ফুটবে, নাকি ঘাসফুল বিজেপির হাত থেকে শিল্পাঞ্চলের রাশ কেড়ে নেবে? অন্যদিকে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পুরনো গড় বালিগঞ্জে বাবুল সুপ্রিয় ভোটের ব্যবধান আরও বাড়াতে পারেন কিনা সেটাই ঘাসফুলের জন্য চ্যালেঞ্জ।
এদিন নির্বাচন কমিশন জানায়, আসানসোল লোকসভা উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে বালিগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে ভোটের শতকরা হার ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ বালিগঞ্জে ভোটের হার অপেক্ষাকৃত কম। তবে এদিন ভোট গ্রহণ শুরু হতেই বিরোধীরা বালিগঞ্জ এবং আসানসোলের বিভিন্ন বুথে রিগিং-এর অভিযোগ তোলে। যদিও সেই অভিযোগে নির্বাচন কমিশন কর্ণপাত না করে কোথাও কোনও রিগিং হয়নি বলেই স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। কিন্তু সকাল থেকেই দুই কেন্দ্রের নির্বাচন ঘিরে একাধিক অশান্তির ছবি সামনে এসেছে। আসানসোলের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালকে বারাবণীতে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়৷ তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়িও ভাঙচুর করা হয় বলেও অভিযোগ তোলেন অগ্নিমিত্রা।
প্রসঙ্গত, এদিনের নির্বাচনের দুটি কেন্দ্রেই তৃণমূল দুজন তারকা প্রার্থীর উপর ভরসা রেখেছেন। ওই দুজন প্রার্থী আবার পদ্মশিবির ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। দুজনেই বিজেপির হয়ে নির্বাচন লড়েছেন, দুজনেই সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব সামলেছেন। অর্থাৎ এদিনের ভোটে তৃণমূলের হয়ে তাঁরাই লড়লেন তাঁদের ছেড়ে আসা দল বিজেপির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে তৃণমূল এই দুই প্রার্থীকে দিয়েই দুই কেন্দ্রে বাজিমাত করতে কৌশল নিয়েছে। উল্লেখ্য, আসানসোল সাতের দশক থকে বামেদের দখলে ছিল। সেই আসনটি বামেদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। আসানসোলের লাল দুর্গ ২০১৪ ও ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বাবুল সুপ্রিয়র জয়ের কারণেই গেরুয়া হয়েছিল। দুবারই তিনি হারিয়ে দিয়েছিলেন তৃণমূলের প্রার্থীকে। ২০১৪ সালে তিনি ত্রিমুখী লড়াইয়ে হারিয়েছিলেন তৃণমূলের দোলা সেনকে। আর ২০১৯-এ হারিয়েছিলেন মুনমুন সেনকে। অর্থাৎ লাল দুর্গ আসানসোলকে গেরুয়া বানানোর অন্যতম কারিগর ছিলেন বাবুল সুপ্রিয়। তৃণমূল এখন পর্যন্ত আসানসোলের লোকসভা আসন জিততে পারেনি। কেবল তাই নয়, বিগত দুটি নির্বাচনে আসানসোল কেন্দ্রে তৃণমূল বিজেপির কাছে যথেষ্টভাবেই পর্যুদস্ত হয়েছিল। যদিও বিজেপি গত বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় তৃণমূলের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরেছে কিন্তু তারা এবারও তাদের পুরনো কেন্দ্রটি যাতে হাতে থাকে সে বিষয়ে আশাবাদী। অন্যদিকে তৃণমূল এবার এই আসনটি তাদের দখলে আনতে মরীয়া। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসানসোল যাতে কোনওভাবেই হাতছাড়া না হয় তার জন্যই ওই কেন্দ্রে বিজেপির অগ্নিমিত্রা পালের বিরুদ্ধে প্রার্থী করেছেন বলিউড স্টার শত্রুঘ্ন সিনহাকে। এবার দেখার তৃণমূলের কৌশল কতটা সফল হয়।
আসানসোল ছেড়ে বাবুল সুপ্রিয় তৃণমূলের টিকিটে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনটি তৃণমূলের বরাবর জেতা আসন। আসনটি ধরে রাখতে তৃণমূলের কোনও সমস্যা হওয়ারই কথা নয়। তবে কোনও দলের কোনও প্রার্থীই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোটের লড়াইতে ছোট করে কখনও দেখেন না। এই কেন্দ্রে বাবুল সুপ্রিয়র লড়াই বিজেপির কেয়া ঘোষের সঙ্গে হলেও লড়াইতে রয়েছেন বামপ্রার্থী সায়রা হালিমও। তিনিও বাবুল ও কেয়াকে সমানে ফাইট দিয়েছেন। বালিগঞ্জ কেন্দ্রে প্রচারে বাবুলের বিরুদ্ধে বিজেপি ও বাম উভয়েই দলবদলু ইস্যু খাড়া করার চেষ্টা চালিয়েছে। বাবুলও নিজের প্রচারে বিজেপি ছাড়ার কারণ জানিয়েছেন। কেন তিনি বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে এসেছেন তা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। বাবুল কেবলমাত্র তার নিজের কেন্দ্র বালিগঞ্জ নয় তার পুরনো কেন্দ্র আসানসোল নিয়েও জানান, অগ্নিমিত্রা পাল তাঁর হাত ধরেই রাজনীতিতে এসেছিলেন। কিন্তু ২০২২-এর উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী শত্রুঘ্ন সিনহার সামনে তিনি ঝড়ের মতো উড়ে যাবেন। অগ্নিমিত্রা বাবুলকে যেমন বিজেপির প্রাক্তনী বলে খোঁটা দিতে ছাড়েননি, তেমনি শত্রুঘ্ন সিনহাকে বহিরাগত প্রার্থী বলেছেন। তিনি মনে করেন আসানসোলের মাটি বিজেপির। আসানসোলবাসী নরেন্দ্র মোদীকে দেখে ভোট দেবেন। আর বহিরাগত প্রার্থী শত্রুঘ্ন সিনহাকে এখানকার মানুষ মেনে নেবে না।
২০২১ বিধানসভায় আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা আর তৃণমূল প্রার্থী সায়নী ঘোষের সঙ্গে জোর লড়াই হয়েছিল। তবে শেষহাসি হাসেন বিজেপি প্রার্থী। এবার সেই বিধায়কই লোকসভা উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে লড়ছেন শত্রুঘ্ন সিনহার সঙ্গে। বলিউড স্টার জিতলেও অগ্নিমিত্রা বিধায়ক রয়ে যাবেন। আর অগ্নিমিত্রা জিতলে আসানসোলে ফের উপনির্বাচনের দামামা বাজবে।