জোব চার্নকের পদার্পণের সময় তো বটেই, তার পরেও কলিকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুর ছিল অরণ্যময়, শ্বাপদসংকুল, নাগ-নাগিনীপূর্ণ গ্রামদেশ৷ বাঘ, হরিণ, বন্যবরাহ, শিয়াল, কুকুর, ভেড়ার পাল তখন কলকাতার ‘শিবঠাকুরের আপন দেশে’ সাক্ষাৎ বাস্তব৷ আদি সপ্তগ্রামের বসুক (বসাক) ও শেঠরা জোব চার্নকের আগে থেকেই কলকাতার বনজঙ্গল কাটানোর কাজ শুরু করে দেন৷
যদিও পরবর্তী গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বসাক-শেঠরা নয়, ‘বাসিক এবং সেত’-রা (দুই কাঠুরিয়াসম্প্রদায়) কলকাতার ভূমিপুত্র হিসেবে জঙ্গল কাটানোর কাজ প্রথমে শুরু করে৷ ইংরেজরা এসেও জঙ্গল নিকেশে মনোনিবেশ করে৷ তবু অষ্টাদশ শতকের শেষভাগেও চৌরঙ্গি ও ধর্মতলা ঘন জঙ্গলে ঘেরা অঞ্চল বলে পরিচিত ছিল৷ আদি কলকাতায় বন্যজন্তুরা রসেবেশে থাকলেও শিকারিরাও নিশ্চিতভাবেই ওত পেতে ছিল৷ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের স্থান-নামেও রয়ে গেছে শিকারের চিহ্ণ৷ এক এক করে বলা যাক৷
আহিরিটোলা : উত্তর কলকাতার আহিরিটোলা ছিল শিকারিদের বাসভূমি৷ ‘আহিরি’ বা আহিড়ি’ শব্দটি অসছে ‘আহেরিয়া’ (মূল-সংস্কৃত ‘আখেট’) থেকে৷ অর্থটি হচ্ছে মৃগয়াশিকারী বা শিকারী৷ আহিরিটোলার শিকারিরা উত্তর কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় শিকার করে বেড়াত৷ আহিরিটোলা ঘাটে বজরা মারফত শিকার করা বন্য জন্তু চালানের ব্যবস্থাও ছিল৷ বাগবাজারের রঘু মিত্রর ঘাটও এ বিষয়ে খ্যাতি লাভ করেছিল৷ আহিরিটোলায় প্রচীন শিকারচিহ্ণ এখনও কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা জানি না, তবে পাশে কুমোরটুলিতে ডোমটোলা এবং বৌবাজারের কাছে মুচিপাড়ায় চামারদের বসবাস সে সময় শিকার করা বন্যজন্তুদের সদগতির ব্যবস্থা করতেই যেন তৈরি হয়েছিল৷ অনেকে অবশ্য আহিরিটোলায় গোয়ালা তথা গোপজাতির বসবাসের কথাও বলেন৷ তাঁদের মতে ‘আহির’ শব্দটি আসছে সংস্কৃত ‘আভীর’ থেকে৷ মানে ‘গোয়ালা’৷ ‘আহিরী’ মানে ‘গোয়ালিনী’৷ একটি অঞ্চলে কেবলমাত্র গোয়ালিনীরাই থাকবেন, এটা তো হতে পারে না৷ বাস্তবে সম্ভবও নয়৷ তাই আহিরিটোলা পুরোনো কলকাতার শিকারচিহ্ণই বহন করছে, গোয়ালার নয়৷ রাধারমণ মিত্রের ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এও আহিরীটোলায় গোয়ালা বা আভীরদের বসবাসের কথা বলা হয়েছে৷ এটা একেবারেই ভুল৷ কেন-না তাহলে জায়গাটির নাম আহীরটোলা বা আহিরটোলা হত৷ আহিরীটোলা (আহিরিটোলা) হত না৷
ঠনঠনিয়া : উত্তর কলকাতার ঠন্ঠনিয়া বা ঠনঠনিয়া অঞ্চলটি কালীবাড়ির জন্য বিখ্যাত৷ ঠনঠনিয়ার চটিও একদা খুব বিখ্যাত ছিল৷ ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে ‘ঠন্ঠনি’ শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ‘বাণে বাণে আঘাতের শব্দ’৷ ঠনঠনিয়া অঞ্চলে ‘ঠন্ঠনি’ শোনা যাওয়ার কারণ সেখানে গভীর অরণ্য তো ছিলই, উপরন্তু নিষাদদের আস্তানাও ছিল৷ হরিণ, শুয়োর শিকার এখানে ছিল জলভাত৷ কালীবাড়িটি গড়ে ওঠে এই কিরাতভূমিতেই৷ শিকার করা হরিণের চামড়া বা অজিনের ভালো চটিও বানানো হত৷ সেই থেকেই কি ঠনঠনের বিখ্যাত চটি আবির্ভাব?
হরিণবাড়ি : আহিরিটোলা থেকে চিৎপুর রোড ধরে বরাবর দক্ষিণে গেলে টেরিটিবাজারের কাছে দেখা মিলত হরিণবাড়ি লেন-এর৷ জনশ্রুতি আছে ওয়ারেন হেস্টিংস অরণ্যসংকুল হরিণবাড়িতে হাতির পিঠে চেপে বন্যবরাহশিকার করতেন৷ হরিণবাড়িতে ইংরেজরা বৃহৎ পুষ্করিণীও খনন করেছিল ঘোড়াদের স্নান করানোর জন্যে৷ অর্থাৎ হরিণ, শুয়োর, ঘোড়া সবই জলজ্যান্ত বাস্তব ছিল হরিণবাড়িতে৷ হরিণবাড়ি যে আদতে ছিল ‘হড়ি’-র বাড়ি বা হাড়িকাঠ-ওয়ালা বাড়ি এবং ইংরেজরা জেলখানার সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলত তা পরবর্তী গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে৷
খিদিরপুর : খিদিরপুর ছিল আসলে খিঞ্জিরপুর৷ ‘খিঞ্জির’ মানে শুয়োর৷ খিদিরপুরে শুয়োরের বাড়বাড়ন্ত ছিল এককালে৷ এখানে খ্রিস্টানদের শুয়োর শিকার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার৷ খিদিরপুরের কাছে বিচালিঘাট শুয়োরের আর্ত চিৎকারে মুখরিত হত৷
বরাহনগর : স্ট্রেনশান মাস্টার নামক বিলিতি পর্যটক কলকাতায় এসে ১৬৭৬এ বরানগরে শুয়োরের কসাইখানা ও শুয়োরের মাংস জারণ করার কারখানা লক্ষ করেছিলেন৷ তাই শুয়োর তথা বরাহ থেকে বরাহনগর বা বরানগর নামের সৃষ্টি হয়েছিল বলে কলকাতা বিশেষজ্ঞদের ধারণা৷ যদিও বর্তমান বিশ্বাস অনুযায়ী বর্হা তথা ময়ূরের পেখম-এর ব্যবসা ছিল বরানগরে৷ বড়োলোকের বাড়ির বৈঠকখানা সাজাতে, উৎসবের সময় ঢাকের সজ্জা হিসেবে আর মৎস্যরসিকদের মাছ ধরার ফাতনা সরবরাহের জন্য ময়ূরের পালকের বিরাট ভূমিকা ছিল এবং এখনও আছে৷ তাই চোরাশিকারিরা ময়ূর মারার কারবার খুলেছিল সেখানে৷ সর্পহিংসক বা ময়ূর এভাবেই আস্তে আস্তে কলকাতার বুক থেকে অবলুপ্তির পথে চলে যায়৷
বাগমারি-বাগজোলা-বাগবাজার : বগ্ বা পাখপাখালির চিহ্ণ এইসব অঞ্চলে৷ বগ্ এখানে সমগ্র পক্ষীসমাজের প্রতিভূ৷ ‘কলিকাতার কিরাতরা’ তিরধনুকের সাহায্যে কতশত পাখির ভবলীলা সাঙ্গ করেছিল তার ইয়ত্তা নেই৷
ভাল্লুক বস্তি : উত্তর কলিকাতার ভাল্লুক বস্তিতে ‘ভল্ল্’ তথা ‘বর্শা’-র ব্যাবসা ছিল৷ শিকারের পক্ষে আদর্শ অস্ত্র এই বল্ল্ম বা ভল্ল্৷ ভল্ল্ মানে ভাল্লুকও৷ তাই মনে হয় ভল্ল্ প্রস্তুতকারক কামারের পাশাপাশি ‘ভাল্লুক নাচিয়ে’ বেদেরাও এসে জুটেছিল এই বস্তিতে৷ ভাল্লুক বস্তি এখন আর নেই৷ শিকারি কলকাতার ভাল্লুকজ্বরও ছেড়ে গেছে৷ কলকাতায় এখন ‘মৃগয়ালব্ধ পশুমাংস’ আর বিক্রি হয় না, যেমনটি হত দুশো বছর আগের শোভাবাজার আর সুতানুটির বাজারে৷
সূত্রঃ বঙ্গীয় শব্দকোষ – হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলিকাতা সেকালের ও একালের- হরিসাধন মুখোপাধ্যায়