ওয়ার্ডপিছু ৪০জন ডেঙ্গি রোগীর নিরীখে ১৬টি ওয়ার্ডকে অতি ডেঙ্গু-প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করল কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ। অর্থাৎ আগের বছর ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৬টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪০ বা তার আশে পাশে। সেই ১৬টি ওয়ার্ডকেই আরো বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে এই বছর। এছাড়া ২০২১ সালে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে কলকাতা পুর এলাকার ৬৯টি ওয়ার্ডে ১ হাজার জন বাসিন্দাপিছু ১ জন ম্যালেরিয়া রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মেয়র পারিষদ তথা কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ জানিয়েছেন, ‘ এই ৬৯টি ওয়ার্ডে ম্যালেরিয়া দমনের কাজ জোরদার করা হবে।’
ডেঙ্গি নোটিয়ায়েবল অসুখ হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক স্বার্থে কলকাতা পৌরসংস্থা একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা ২০১৪ সাল থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে অবস্থিত সরকারি ও বেসরকারি ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, নার্সিংহোম ইত্যাদি থেকে প্রতিদিন একজন সুনির্দিষ্ট কর্মীকে পাঠিয়ে ডেঙ্গু্ ও ম্যালেরিয়ার রিপোর্ট সংগ্রহ করে এবং সেই রিপোর্ট অনুযায়ী দ্রুত রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। বলা বাহুল্য, এই উদ্যোগ অভিনব।
দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও তার চিকিৎসা, ত্রিস্তরীয় নজরদারিতে বছরের গোড়া থেকে শহরের ১৪৪টি ওয়ার্ডে ভেক্টর কন্ট্রোলের কাজ এবং বর্ষব্যাপী জনসচেতনতা-প্রচারের ফসল হিসেবে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে।
২০১০ সালে এ শহরে ম্যালেরিয়া-রোগীর সংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার ৯০৯। ২০১১ সালে রোগীর সংখ্যা নেমে হয়েছিল ৪২ হাজার ২০০। ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে রোগে ভুগেছেন যথাক্রমে ৩১ হাজার ৭৭২ জন, ১৫ হাজার ৬৫৬ জন এবং ৭ হাজার ৪১ জন। ২০১৬ সালে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৫৬৪ জন, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৩৬৯ জন এবং ২০২০ সালে শহরে ম্যালেরিয়ার দাপট কমেছিল প্রায় ৯৫.২ শতাংশ। তারপর দুই বছর করোনা মহামারি পর্ব আমরা পার করেছি।

প্রাণঘাতি ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়াকে আজ ঠেকানো গেছে অনেকাংশে। ২০১০ সালে শহরে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৪ হাজার ১০৪ জন। ২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৩১৭, অর্থাৎ ২০১০ সালের তুলনায় ২০২০ সালে শহরে ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ার দাপট কমেছে প্রায় ৯৮ শতাংশ। প্রসঙ্গত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বুলেটিন “International Travel and Health 2020” -তে বলা হয়েছে, রাজ্যের অন্যান্য শহরের তুলনায় কলকাতা শহরে ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক কম।
উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে ডেঙ্গু মোকাবিলার ক্ষেত্রেও। একসময় শহরে ডেঙ্গু-আক্রান্তের সংখ্যা সঠিকভাবে জানার কোনও ব্যবস্থাই ছিল না পৌরসংস্থায়। দু’একটি হাসপাতাল এবং কিছু প্রাইভেট প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হতো সমস্যার গভীরতা। প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালে শহরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ৩ হাজার ৫৪৬ জন, মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের। ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৯৬০, ৩৪০, ১ হাজার ৮৫২, ২৩৮ এবং ৯০৪। ২০১৪ সালের আগে ঠিকমতো রিপোর্ট না আসায় শহরের বিভিন্ন নন-কেএমসি সেন্টারে চিহ্নিত অনেক ডেঙ্গু রোগীর খবর অজানা থেকে যেত। ২০১৪ সালে WHO-এর পরামর্শ অনুযায়ী, শহরের ১৪৪টি ওয়ার্ডে অবস্থিত সমস্ত প্রাইভেট প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোম থেকে ওয়ার্ড পিছু একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে দিয়ে প্রতিদিন ডেঙ্গুর রিপোর্ট সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেয় পুর স্বাস্থ্য বিভাগ। এর ফলে পুরসভার নিজস্ব ক্লিনিকে চিহ্নিত রোগীর পাশাপাশি নন-কেএমসি সেন্টার থেকেও আসতে শুরু করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। আর এই বাড়তি Dengue Surveillance-এর ফলে ডেঙ্গু-আক্রান্তের সংখ্যা ২০১৫ সালের ১ হাজার ৬১৯ থেকে ২০১৯ সালে ৬ হাজার ১৫৭-এ গিয়ে পৌঁছয়। বিশেষজ্ঞ মহলের বক্তব্য, Dengue Surveillance-এর কাজ যত ভালো হবে, ডেঙ্গু-আক্রান্তেরছবি তত স্পষ্ট হবে।
ডেঙ্গু শনাক্তকরণের বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়মিত তথ্য হাতে আসার ফলে শহরে ডেঙ্গু-সমস্যার বহর মাপার সুযোগ বেড়েছে এবং রোগ-প্রবণ এলাকাগুলিতে চিহ্নিত করে বছরভর সেইসব এলাকায় রোগের বাহন ঈডিস মশার উৎস খুঁজে বের করে তা বিনাশের কাজ সহজতর হয়েছে। প্রসঙ্গত, ভারত সহ বহু দেশে ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের সুব্যবস্থা না থাকায় গোটা বিশ্বে প্রতিবছর ঠিক কত মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়, তা জানা নেই আজও। কাজেই ডেঙ্গু দমনের ক্ষেত্রে পুর স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নেওয়া তথ্য তালাশের উদ্যোগটি এককথায় অভিনব। প্রতিটি নাগরিককে স্বাস্থ্য সচেতন করার বিষয়ে কলকাতা পৌরসংস্থা লাগাতার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একসময় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে গুটিকয়েক সতর্কবার্তা সম্বলিত সাদা-কালো লিফলেট বিতরণ এবং বছরের দু-তিন সপ্তাহ অটো-মাইকিং করেই সাড়া হতো জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচার। সুনির্দিষ্ট কোনও বাজেট বরাদ্দ না থাকায় ব্যাপকভাবে কোনদিনই জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনও উদ্যোগ নেওয়া হতো না। বিগত ১২ বছরে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ। তৈরি করা হয়েছে IEC Code : 00/6225/600। অভিনবত্ব আনা হয়েছে প্রচারের কাজেও।

বছরের শুরুতেই জনসচেতনতা পদযাত্রা, পুর প্রতিনিধি এবং সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসদের জন্য ওয়ার্কশপ, চার ভাষায় তৈরি রঙিন লিফলেট, শহর জুড়ে হোডিং ও ব্যানার, সানপ্যাক বোর্ড, এলইডি পর্দার মাধ্যমে তথ্যচিত্রের প্রদর্শন, মেট্রো স্টেশনের টিভি, অটো-মাইকিং, এফ এম চ্যানেলের মাধ্যমে প্রচার, ওয়ার্ড স্তরে সচেতনতা মিটিং, স্বাস্থ্য ও জনসচেতনতা শিবিরের আয়োজন, শহরের ডেঙ্গিপ্রবণ ওয়ার্ডগুলিতে স্বাস্থ্য দপ্তর-সহ পৌরসংস্থার সংশিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের কর্মীদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতা বৃদ্ধির অভিযান, পাড়ার দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারে অর্ন্তভুক্ত করার জন্য ‘স্বাস্থ্যবান্ধব’ প্রতিযোগিতার আয়োজন, ডেঙ্গু বিজয় অভিযান — এভাবেই মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে প্রচারপর্ব চালাচ্ছে পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ।
কলকাতা পুরসভার জনসচেতনতা বৃদ্ধি কর্মকান্ডের তালিকায় সাম্প্রতিকতম সংযোজন কেএমসি হেলথ অ্যাপ। ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার লক্ষণ, রোগের চিকিৎসা, ১৪৪টি পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঠিকানা, ম্যালেরিয়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে Dos & Don’ts-সহ অন্যান্য তথ্য সম্বলিত এই হেলথ অ্যাপ বিনামূল্যে ডাউনলোড করে উপকৃত হচ্ছেন অনেকেই। উদ্যোগটি ভূ-ভারতে প্রথম।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পৌরসংস্থার আবেদনে সাড়া দিয়ে রাজ্য সরকার পুর আইনের ৪৯৬ ধারাটি পরিবর্তন করে ৪৯৬ এ ধারা প্রবর্তন করেছে। এই ধারা মোতাবেক যদি কেউ মশার উৎস বিনাশের কাজে পুর-পরামর্শকে অগ্রাহ্য করেন তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে মিউনিসিপ্যাল কোর্টে কেস হতে পারে এবং ১ হাজার টাকা থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ইতিমধ্যে জরিমানা করার কাজ শুরু হয়ে গেছে।