অশোক টিভি দেখছিল। পাপিয়া বিকেলের চা দিতেই বলল,
— আজকে রাতে একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ব। মাঝরাতে নাইট ডিউটি যেতে হবে। মনে আছে তো তোমার? আর হ্যাঁ দুটো রুটি টিফিন ডাব্বায় ভরে দিও। রাত জাগলে আমার আবার খিদে পায়।
— হ্যাঁ রে বাবা মনে আছে। এই নিয়ে কতবার বলবে বলতো!
— আমার নতুন বৌটার একলা ঘরে থাকতে ভয় করবে না তো, পাপিয়ার থুতনি নেড়ে আদর করে অশোক বলল।
পাপিয়া কপট রাগ দেখাল।
— ভয় করতে ভারি বয়েই গেছে আমার! শীতের রাতে আমাকে ছেড়ে যেতে তোমারই কষ্ট হবে।
— কি করি বলো, চাকরি বড় বালাই।
নতুন দাম্পত্যের উষ্ণতায়, আরামে শীতের রাতে অশোক, পাপিয়া দুজনেই বড় সুখে ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ। পাপিয়া ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল।
— কে গো, দরজা ঠকঠক করছে!
— কলম্যান।
নির্বিকার মুখে বিছানা ছাড়তে ছাড়তে বলল অশোক।
— কলম্যান? সেটা আবার কে!
— আরে এ আমাদের পুড়শুড়া কোলিয়ারির কলম্যান। রাত বারোটায় নাইট যাবার জন্যে সবাইকে ডেকে দেওয়াই ওর ডিউটি।
আধা শহরের, যৌথ পরিবারে বড় হওয়া পাপিয়ার কোলিয়ারি কলোনির জীবনযাত্রা নিয়ে বড়ই কৌতুহল।
অশোক জামাকাপড় বদলাতে ব্যস্ত হল। পাপিয়া দৌড়ে দরজা খুলে কলম্যানকে দেখতে গেল। রাতের কুয়াশার ঝালরে, আলো-আঁধারিতে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
লম্বা-চওড়া, বিকট দর্শন, কালো কুচকুচে একটা লোক। হাতে লাঠি। সম্ভবত লাঠি দিয়েই দরজা ঠকঠক করছিল। মাথায় হনুমান টুপি। পায়ে গামবুট। পাপিয়াকে দেখেই নমস্কার ঠুকে বলল,
— নমস্তে মেমসাহাব। সাহাবকো ডিউটী যানা হ্যায়। ম্যয় কলম্যান হুঁ।
তার কালো মুখে সাদা দাঁতের পাটি ঝকঝক করছে। যমদূতের মত কলম্যানকে দেখে পাপিয়ার ভেতর অবধি কেঁপে উঠল। অশোক ডিউটি চলে যাবার পর সে রাতে অনেকক্ষণ ঘুম এলোনা পাপিয়ার।
কলম্যান রঘুবীর কাহারের মনটাও বিষণ্ণ হয়ে গেল। প্রতি রাতে এই খারাপ কাজটা তাকেই করতে হয়। বেচারি সাহাবকা নয়ী নয়ী শাদী হুয়া হ্যায়! ঘরে যে তারও বিবিকে রোজ ছেড়ে আসতে হয়। অনুযোগ করে ঊষা,
— দুসর ডিউটি নিতে পারো না! মাঝরাতে চোরের মত ঘরে ঢোকো।
নাইট ডিউটি ওলাদের জাগাতে জাগাতে রঘুবীরের অর্ধেক রাত কাবার হয়ে যায়। কলোনীর একপ্রান্তে জঙ্গলের পাশে তার ডেরা। চাঁদনী রাতে কুকুরের পাল আরো বেশি পেছনে ঘেউ ঘেউ করে। বিদঘুটে লকড়বগ্গা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তখন হাতের লাঠির ঠকঠক আর মুখে রামরাম, সিয়ারাম ভরসা রঘুবীরের।
আগে যখন একা ছিল তখন এত তোয়াক্কা করত না রঘুবীর। এখন তার ঘরেও যে নয়ী দুলহিন! বিয়েটা অবশ্য কোন ছোটবেলায় হয়ে গেছিল। আবছা মনে আছে সেসব কথা। ঊষা যখন ডাগর হল, তখন তার গওনা হল। পহেলি বার দুলহিন শ্বশুরাল এল। ছুট্টি নিয়ে রঘুবীর ঘরে গিয়ে ঊষাকে দেখে পুরা ফিদা। ক্যা খাপসুরত হ্যায় হামর বিবি! পেয়ারী সি মুখড়া। মোটে মোটে আঁখে। কানো মে ঝুমকে। পরনে ফুলছাপ শাড়ি। মাঙ্গমে ভরা সিন্দুর। পায়েল আর হাতভর্তি কাঁচের চুড়ির খনক আংরেজি শরাবের থেকেও বেশি নেশা ধরায়।
নিজের দিকে তাকিয়ে লজ্জা হয়েছিল রঘুবীরের। নেহাত তার সরকারী নোকরি। বাপ-মা মরা, বিনা দহেজের দুলহিন ঊষা। তাই এই বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা দুলল। মাঈয়ের কাছে পাক্কা একবছর ঘরকন্নার ট্রেনিং নিয়ে অল্পদিন হল ঊষা তার কাছে এসেছে। সুন্দরী বৌকে মাথায় তুলে রেখেছে রঘুবীর। তবে ঊষা যেন এখনো সহজ হতে পারে নি। গভীর রাতে ঘরে পৌঁছে রঘুবীর ঘনিষ্ঠ হতে চায়। ঊষা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার নাকি নিদ লাগে।
সরল সাদা রঘুবীর ভাবে ঊষার একটু সময় লাগবে বদসুরত আদমীকে মানিয়ে নিতে। ততদিন রঘুবীর চেষ্টা চালিয়ে যাবে। তবে ভয় হয় তার। রূপের আগুন জ্বালিয়ে ঊষা প্রতিরাতে জঙ্গলের ধারে একলা পড়ে থাকে যে!
মাইনিং সর্দার ভিষম সিংয়ের কাছে হাতজোড় করে আর্জি জানিয়েছিল রঘুবীর,
— মেরা দুসরা ডিউটি দে দিজিয়ে সর্দার।
— কিঁউ?
— বিবি আয়ী হ্যায় মেরে ঘর মে।
— তো ক্যয়া?
— ও একেলে ডরতি হ্যায় রাতকো। এক কোনা মে মেরা ঘর হ্যায়।
— আচ্ছা! বহোত খাপসুরত হ্যায় ক্যয়া তেরা বিবি?
হাত কচলে সরল রঘুবীর ঘাড় নাড়লো। ভিষম সিংয়ের পাশে তার শাগরেদ লালু চোখ টিপল। সে একঝলক দেখেছে ঊষাকে। মেয়ে নয় তো, যেন কড়ক বিজলি। ইশারায় বুঝিয়ে দিল, একদম মস্ত।
— না না, এখন কোনো রিলিভার নেই। সারাদিন তো বৌয়ের কাছে থাকিস। রাতেও চাই! খ্যাকখ্যাক করে বিচ্ছিরি হেসে অশ্লীল ইঙ্গিত করল সর্দার।
— মেরে কো দিন মে খাদান কা ডিউটি দে দিজিয়ে সর্দার।
— খাদান কা ডিউটি তো অর ভি খতরনাক! তুই মরে গেলে তোর পেয়ারের বিবি যে বিধবা হবে রে! যা যা ভাগ। অন্য কোনো ডিউটি আমার হাতে নেই এখন।
— ঠিক হ্যায়, বাদ মে দেখ লিজিয়েগা। মনখারাপ করে ফিরে গেল রঘুবীর।
সেদিন শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। রুটির সঙ্গে ব্যাগন কা চোখা বানিয়ে ছিল ঊষা। সঙ্গে ধনিয়া কি চাটনি। ঊষার রান্নার হাতটিও বড় চমৎকার। আজও পূর্ণিমা। কুয়াশা আর চাঁদের আলো মাখামাখি হয়ে রাত বড় মোহময় হয়ে আছে। হাওয়া চলছে জোর।
কম্বলটা ভালো করে গায়ে মাথায় জড়িয়ে নিল রঘুবীর। কুকুরগুলোর চাঁদনিরাতে এত কান্না পায় কেন কে জানে!
পুড়শুড়া কোলিয়ারির কলম্যান নাইটডিউটিওলাদের ঘরে ঘরে গিয়ে দরজায় টোকা দিচ্ছে ঠকঠক, ঠকঠক।
ঘরের ভেতর থেকে সাড়া পেলে তবেই আবার অন্য ঘরের দরজায় আওয়াজ করে রঘুবীর। ডিউটিতে তার কোনো খামতি নেই।
বাড়ি ফেরার সময় হাড় কাঁপানো শীতে যেন আর পা চলছেনা রঘুবীরের। এই ঠান্ডায়, আধিরাতে বিবি তো ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকবে! নিদ্রামগ্ন ঊষাকে জাগাতে হবে ভেবে আবার খারাপ লাগল রঘুবীরের। এবার নিজের দরজায় গিয়ে ঠকঠক করল কলম্যান।
— জাগো ঊষা জাগো। দরওয়াজা তো খোলো। দোর খোলে না কেন তার ঘরওয়ালি!
রঘুবীরের সন্দেহ হল। একটু ঠেলা দিতেই দরজা খুলে গেল।
একি, দরজা খোলা কেন? ঊষা কি তবে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছিল? কি সর্বনাশ! দৌড়ে ঘরে গিয়ে রঘুবীর দেখে শূন্য বিছানা, শূনী ঘর খাঁ খাঁ করছে। ঘরে, আঙ্গনে ঊষার কোথাও চিহ্নমাত্র নেই। বালিশ-কম্বল, বাক্স-প্যাঁটরা তোলপাড় করে পাগলের মত ডাকতে লাগল রঘুবীর,
— ঊষা, ঊষাআআ, দুলহিইইন। কাঁহা গয়ী রে মেরী ঘরওয়ালীইইই। একেলে কাঁহা ভাগ গয়ী তু? মেরে কো ছোড়কে কিঁউ চলি গ্যয়ী রেএএএ।
কলম্যানের এই ডাক শুনসান শীতের রাতে আর কেউ শুনতে পেল না। খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে হু হু করে কনকনে উত্তুরে হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ল।
কি সুন্দর লেখা কিন্তু মনখারাপ হয়ে গেলো।
মনখারাপের গল্প রে। সব পেশার ভালো -খারাপ দুদিক যে আছে।
একরাশ ভালো লাগা।