গত ২৮ এপ্রিলের আগে বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে তাঁর এলাকার বাইরে আর কেউ কি চিনতেন? তিনি ভারতীয় কুস্তি সংস্থা Wrestling Federation Of India-র সভাপতি। কিন্তু ক্রীড়া জগতের কতজন মানুষ তাঁকে চিনতেন? ক্রীড়া জগতে বিশেষ পরিচিতি না থাকলেও গোটা উত্তরপ্রদেশে ব্রিজভূষণ পরিচিত ছিলেন ‘বাহুবলী’ নামে। সেই পরিচয়ের একটি দিক হল — ব্রিজভূষণ খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি ইত্যাদি একাধিক মামলায় অভিযুক্ত। তাঁর সম্পর্কে শুধু এটুকু বললে যথেষ্ট হয়না। কারণ নেপথ্যে থাকলেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং ছিলেন বাবরি মসজিদ কাণ্ডের অন্যতম পাণ্ডা। রাম জন্মভূমি আন্দোলনে তিনি লালকৃষ্ণ আডবাণীর রথের চালক ছিলেন। ১৯৯১ সালে এই নেতাটি বিজেপি-তে যোগ দেন। তবে একাধিক দুর্নীতি ও অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে, দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে একটি টাডা মামলায় অভিযুক্ত ব্রিজভূষণ দেড় দশক কাল বিজেপি রাজনীতি করার পরও তাঁকে গেরুয়া শিবির থেকে ঘাড়ধাক্কা খেতে হয়। নিজের দল তাড়িয়ে দিলেও তিনি রাজনীতি বিমুখ হয়ে থাকতে পারেননি। ওই বছরই তিনি উত্তরপ্রদেশের আর একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন। ছ’বছর সেই দল থেকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পর, ফের তিনি ছেড়ে আসা দল বিজেপি-তে ফিরে আসেন। এরপর থেকে ব্রিজভূষণ শরণ সিং কাইসারগঞ্জ থেকে ছবার সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচবার বিজেপি থেকে আর একবার সমাজবাদী পার্টির হয়ে লোকসভায় গিয়েছেন এই নেতা।
কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিং বিজেপি দলের অতি মূল্যবান সম্পদ, মোদী-শাহ-যোগীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। কিন্তু দু’টি এফআইআরে মোট ১০টি নিগ্রহের ঘটনায় নির্দিষ্ট করে বলা আছে কোথায়, কখন, কাকে নিগ্রহ করেছেন ব্রিজভূষণ। সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মহিলা কুস্তিগির নিগ্রহ থেকে মহিলা কুস্তিগিররাও তাঁর কদর্য যৌন লালসার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ। অপ্রাপ্তবয়স্ক মহিলা কুস্তিগিরের অভিযোগ, ব্রিজভূষণ ছবি তোলার নাম করে তাঁর শরীর ছুঁয়েছেন, নিজের শরীরের দিকে জোর করে টেনেছেন, কাঁধ এবং বুকে হাত দিয়েছেন এবং শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করার জন্য তাঁকে বার বার উত্যক্ত করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক একজন কুস্তিগিরের অভিযোগ, ব্রিজভূষণ তাঁকে রেস্তরাঁয় খেতে ডেকে তাঁর বুকে, পেটে হাত দেন। একবার নয়, একাধিক বার এমন করেছেন। তাঁর আরও অভিযোগ, ব্রিজভূষণ নিজের অফিসে ডেকেও তাঁর শরীরে হাত দেন, কুস্তিগিরের পায়ের উপর পা রাখেন, হাঁটুতে হাত দেন। এই কুস্তিগির স্পষ্ট বলেন, তাঁর চুপ করে থাকার সুবিধা নেন ব্রিজভূষণ।
নিশ্বাস-প্রশ্বাস দেখার নাম করে এক মহিলা কুস্তিগিরের শরীরে হাত দেন ব্রিজভূষণ। আর অনুশীলনে কোচের অনুপস্থিতিতে তাঁর জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে দেন, নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেছেন মহিলা কুস্তিগির। এইভাবে ছ’জন মহিলা কুস্তিগির কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিংহের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। এদের মধ্যে যারা ভয় পেয়েও কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতির নোংরা কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ব্রিজভূষণ হুমকি দিয়ে জানান, “বেশি চালাকি করতে যেয়ো না। আগামী দিনে কোনও প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে না”। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশও প্রথমে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে এফআইআর করতেই চায়নি। পাশাপাশি গোপনে দিল্লি পুলিশের তরফে সাতজন অভিযোগ কারীনির নামও ব্রিজভূষণের কাছে ফাঁস করা হয়। এরপরেই ব্রিজভূষণের তরফে অভিযোগ তুলে নিতে তিন-চারজন কুস্তিগীরকে ভয় দেখানো হয়, প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, তাদেরকে টাকার প্রলোভনও দেখানো হয়।
প্রশ্ন হল, কেন্দ্রীয় সরকার তথা শাসক দল বিজেপি অস্বস্তিতে পড়েও কেন ব্রিজভূষণ শরণ সিংহের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না? কুস্তিগিরেরা আন্তর্জাতিক আসর থেকে পাওয়া পদক গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন কিন্তু বিজেপি জাতীয় কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতির মাথার উপর থেকে হাত তুলে নিতে পারেনা। যেভাবে লখিমপুর-খেরির ঘটনার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনির ছেলে অভিযুক্ত হওয়ার পরও তাঁকে পদ থেকে সরানো হয়নি। একই অবস্থান ব্রিজভূষণের ক্ষেত্রেও। তাছাড়া বিজেপি ফৈজাবাদ তথা অযোধ্যায় ব্রিজভূষণের প্রবল প্রতাপের কথা জানে। লোকসভা নির্বাচনের আগে কি গেরুয়া শিবির ব্রিজভূষণকে ক্ষুণ্ণ করে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইবে?
প্রয়াত অটল বিহারী বাজপেয়ী সরাসরি যার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন, সেই বিতর্কিত নেতার গোটা উত্তরপ্রদেশ জুড়ে এতটাই দাপট যে, তাঁকে ‘মাফিয়া ডন’ না ‘ডন অফ মাফিয়া ডনস’ বলা হয়। গোটা উত্তরপ্রদেশ জুড়ে সেই ব্রিজভূষণ ৫০টির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আছে প্রাইভেট জেট, হেলিকপ্টার, তিনি নিজেই কেবল সাংসদ নন, তাঁর স্ত্রী জেলা পরিষদের সভাধিপতি, ছেলে গোন্ডা অঞ্চলের বিধায়ক। আর সেই কারণেই অভিযুক্ত হয়েও এখনও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।