ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনছে, শুধু এই জন্যই কী আগামী ২৭শে অগাস্ট থেকে ট্রাম্পের ভারতের ওপর চাপানো মোট আমেরিকার শুল্ক ৫০ শতাংশ হতে যাচ্ছে। ভারত ছাড়া এশিয়ার আর কোনো দেশে এত চড়া হারে আমেরিকার শুল্ক বসেনি। বস্তুত এই ৫০ শতাংশ হার ভারতকে ব্রাজিল (লাতিন আমেরিকার যে দেশটির সঙ্গে আমেরিকার রীতিমতো ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে)-এর সঙ্গে একই বন্ধনীতে এনে ফেলেছে। এই মুহুর্তে ভারত বছরে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার পণ্য আমেরিকায় রফতানি করে। ট্যারিফের এই হার বজায় থাকলে তার প্রায় পুরোটাই বাণিজ্যিকভাবে ‘আনভায়াবেল’ হয়ে পড়বে — মানে অন্য দেশের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারত টিকে থাকতে পারবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষঙ্গেরা।
কয়েক মাস আগেও ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২১২ বিলিয়ন ডলার। যদিও ভারতের পক্ষে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদী সেই হিসাব জেনেও আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বাণিজ্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। জানা যায়, শুল্ক নিয়ে আলোচনার সময় ভারত আমেরিকাকে প্রস্তাব দিয়েছিল, আমেরিকার শিল্পপণ্যের উপর থেকে ভারত শুল্ক তুলে নিয়ে আমেরিকা থেকে আরও বেশি পরিমাণ প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি পণ্য কিনবে। কেবল তাই নয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ চাপ থাকা সত্ত্বেও আমদানি করা গাড়ির উপর কর কিছুটা কমানোর কথাও তারা বিবেচনা করবে। তবে কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের উপর থেকে ভারত শুল্ক ওঠাতে পারবে না। কারণ কোটি কোটি মানুষ এই দুটি ক্ষেত্রে যুক্ত তাছাড়া ভারতীয় রাজনীতিতে এই দুটি জায়গা অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের আলোচনাটি কী কেবলমাত্র বাণিজ্যকেন্দ্রিক ছিল? বিশেষঙ্গদের মতে এর পিছনে মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত শেষ হওয়া নিয়ে দু’দেশের দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকও একটি বড় বিষয়। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের বিরতিতে তিনি মধ্যস্থতা করেছেন এই দাবি ট্রাম্প বারবার করলেও ভারত কিন্তু প্রতিবার ট্রাম্পের দাবি অস্বীকার না করলেও এই নিয়ে মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের কথা হয়নি। অন্যদিকে পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করবে বলে জানায়। এদিকে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এলে পাকিস্তান আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে খনিজ ও তেলের মজুত অনুসন্ধান নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করে। এতে পাকিস্তানের জন্য ভারতের অস্বস্তি আরও বাড়ে। পাশাপাশি কিছুদিন আগে পর্যন্ত ট্রাম্প ও মোদী একে অপরকে প্রকাশ্যে ‘বন্ধু’ বললেও এখন যে তাঁদের সেই বন্ধুত্ব আর নেই সেকথা বলাই যায়। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখায় ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক যে মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ নয় সেকথাও বলা যায়। ইতিমধ্যে ভারত ট্রাম্পের শুল্ককে ‘অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে। কেবল তাই নয়, দিল্লি জানিয়েছে, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির লক্ষ্য হল দেশের মানুষের জ্বালানির চাহিদা মেটানো।
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের পর প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাচ্ছেন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে। উল্লেখ্য, আমেরিকার বাণিজ্যিক আঘাতের পর ভারত নিজেকে গোটা দুনিয়ায় একটি অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চলতি বছরই ভারত সফরে আসছেন। ইতিমধ্যে মস্কো সফরে আছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীও যাচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা এই পরিস্থিতিকেই ট্রাম্পের সঙ্গে মোদীর সম্পর্কের অবনতি হিসাবে দেখছেন। যদিও জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরলে অনেক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তাকে আরও বেশি নিশ্চয়তা দেবে। কিন্তু মাত্র ছয় মাস না যেতেই সবটা বদলে গেল। প্রথমে ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল কেনার দায়ে ভারতকে ২৫ শতাংশ শুল্কে দণ্ডিত করেছেন। পরবর্তীতে আরও ২৫ শতাংশ। এতে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি যেমন অনিশ্চিত, তার উপর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। তবে একথাও ঠিক যে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের পক্ষে বরাবরই চাপের ছিল। অনেক বছর ধরে ট্রাম্পের আমেরিকা ভারতকে তার বাজার খুলতে, শুল্ক কমাতে এবং আমেরিকার প্রযুক্তি, ফার্মা ও কৃষি পণ্যগুলির জন্য সুরক্ষা দিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি একথাও বলতে হয়, অতীতেও সম্পর্ক একেবারে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কারণ ভারত একদিকে আমেরিকায় দ্বিগুণ রপ্তানি করতো, অন্যদিকে আমেরিকার পণ্যগুলি ভারতীয় বাজারে প্রবেশের সুবিধা পেয়েছে। এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রায় সব বাণিজ্য সহযোগীর উপর শুল্ক নিয়ে হুমকি দেওয়ার পর ভারত ও আমেরিকা একটি চুক্তি করতে চাইলেও ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণ, তথ্য সুরক্ষা ও মেডিকেল ডিভাইসের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ হওয়ায় চুক্তি সাক্ষরে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক বিশেষঙ্গেরা বলছেন, এটা ট্রাম্পের চাপ দেওয়ার বিশেষ কৌশল হলেও ভারত যে ট্রাম্পের এই ধরনের চাপে দমে যাবে না সেটাও ঘটনা, কারণ তার নিজের দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও কৃষকদের রক্ষা করতে হবে। ট্রাম্পের ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হওয়ার একটি কারণ হল ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে যখন ট্রাম্প চাপ দিচ্ছে তখন ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও অস্ত্র কেনায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালে পুতিন মোদিকে রাশিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক “অর্ডার অব সেন্ট অ্যান্ড্রু” দেয়। শুধু তাই নয়, রাশিয়া ভারতের অন্যতম বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। সেইসঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারতের রাশিয়ান তেল কেনাও বেড়েছে। পহেলগামে জঙ্গি হামলায় ২৬টি প্রাণহানীর পর ভারত-পাকিস্তান যে সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তারপর ট্রাম্প দাবি করেন, তিনিই ভারত ও পাকিস্তানকে সংঘাত থেকে সরে আসতে রাজি করিয়েছেন, তা নাহলে বাণিজ্য বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু ভারতের বক্তব্য, সংঘাত থেকে সরে আসতে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছিল না, তারা নিজেরাই সমঝোতা করেছে। কিন্তু এরপর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি নজিরবিহীন ঘটনা বলেই অভিহিত করা যায়। ঘটনার পরদিন ট্রাম্প মোদীকে “চমৎকার মানুষ”বললেও মুনিরকে যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি পাকিস্তানকে ভালোবাসেন এবং দাবি করেন, তিনি ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ থামিয়েছেন। এছাড়া প্রযুক্তি খাতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিয়েও ট্রাম্পের অবস্থান অত্যন্ত কড়া। তিনি বলেই দিয়েছেন, ভারতের কর্মীদের নিয়োগের দিন শেষ। ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন, ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে তেল কিনে সেটি বাজারে বিক্রি করে লাভ করছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন, ভারত কী রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, না সেই সম্ভাবনা খুবই কম। ভারত স্বাধীনতার পর থেকেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখেই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটিয়েছে। ট্রাম্প ভারতকে রাশিয়ার থেকে দূরে থাকতে চাপ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভারত উলটো পথে হেঁটেই তার নিজের অবস্থানে অনড় থাকবে। কিন্তু ভারতের এই অবস্থান ভবিষ্যতে কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে? এটা ঘটনা যে এখন দু’দেশের পারস্পরিক কূটনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না বলেই নানা দিক থেকে ভারতকে চাপে ফেলতে চাইছেন। কিন্তু ট্রাম্পের এটাও জানা বোঝা দরকার যে দেশ হিসাবে ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনও কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকেরা মনে করেন ট্রাম্পের এই ক্ষোভ ধীরে ধীরে কমতে বাধ্য, তবে রাশিয়া যদি যুদ্ধ চালিয়ে যায় তবে ক্ষোভ কমে যাবে কথাটি ভুল বলা হবে। কিন্তু ভারত কী রাশিয়াকে যুদ্ধ থামাতে বলবে? ভারতের পক্ষে বলাটাই যুক্তিযুক্ত কারণ, এটা তো স্পষ্ট যে ট্রাম্প পুতিনের উপর জমে থাকা ক্ষোভই ভারতের উপর ওগড়াচ্ছেন। সেদিক থেকে ভারত রাশিয়াকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য চাপ দিতেই পারে।