প্রাচীনকালে একজন শাসক কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন এটা বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হয় সে রাজাটি তার প্রজাদের কাছ থেকে কতটুকু উপঢৌকন গ্রহণ করতেন। সেকালে অর্থলোলুপ রাজারা একটি প্রথা চালু করেছিলেন। যখনই কোনো প্রজা রাজা মহারাজাদের সঙ্গে দেখা করতে আসত দরখাস্ত কিংবা কোনো আর্জি নিয়ে, তখনই প্রজাদের দিতে হতো বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বের কথা। চাণক্যের অসীম সাহায্য, সহযোগিতা ও বুদ্ধি বলে তার যোগ্য শিষ্য চন্দ্রগুপ্ত মগধের অত্যাচারী, বর্বর ও অর্থলোলুপ রাজা ধননন্দকে উৎখাত করে বসেছিলেন সিংহাসনে। ধননন্দকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করার বেশ কিছুদিন আগে একদিন পণ্ডিত চাণক্য উপস্থিত ছিলেন ধননন্দের রাজ দরবারে। তিনি তার পুঁথিতে লিখেছেন— একদিন বেশ কিছু প্রজা কর কমানোর আর্জি নিয়ে রাজ দরবারে হাজির হয়েছেন। রাজা ধননন্দকে যথাসময়ে জানানো হলো সে কথা। ধননন্দ বললেন, বুঝলাম। কিন্তু রাজদর্শন করতে এরা কি কোনো উপঢৌকন সঙ্গে এনেছে? আবেদন-নিবেদন-বিচার-যে কাজেই আসুক, রাজসভায় পদার্পণ করলে রাজাকে উপঢৌকন দিতে হয়। পুরনো এ প্রথার কথা কি এদের জানা নেই? চাণক্য ধননন্দের এসব কথা শুনে মনে মনে বললেন, এটা তো সমস্ত দেশবাসীরই জানা। এটাই হচ্ছে ধননন্দের ব্যক্তিগত আয়ের আরেকটি উৎস। প্রধানমন্ত্রী, অমাত্য বটুকেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বললেন, উপস্থিত আবেদনকারীরা রাজার জন্য কী কী উপঢৌকন এনেছেন তাড়াতাড়ি সম্রাটকে নিবেদন করুন। অমাত্য বটুকেশ্বর লজ্জিতভাবে বললেন, এরা কিছুই আনেনি সম্রাট। সবাই রিক্ত হস্তে এসেছে। বলছে উপঢৌকন দেয়ার মতো সামর্থ্য এদের নেই। বিকৃত হয়ে উঠল ধননন্দের মুখ। এতদিনের প্রচলিত প্রথা লঙ্ঘন করেছে এরা। এদের গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিন রাজ দরবার থেকে।
এ তো গেল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের ইতিহাস। এখন দু’শ বছর আগের একটি কাহিনী বলি। সময়টা ১৭১৫ সাল। তখন সম্রাট আওরঙ্গজেব গত হয়েছেন। তার নাতি ফররুখ্শিয়ার দিল্লির বাদশা। ইংরেজরা কলকাতায় ব্যবসা-বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন ভালোই। তারা তাদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে চান আরো বহুগুণ। তারা চিন্তা করলেন বিপুল পরিমাণ ঐশ্বর্য-উপঢৌকন নিয়ে দেখা করবেন ফররুখশিয়ারের সঙ্গে। ফরর্খুশিয়ার বিলেতি খেলনা খুব ভালোবাসেন। বড় হয়েও খেলনার লোভ ছাড়তে পারেননি তিনি। ইংরেজরা ভাবলেন অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে সম্রাটকে বেশকিছু উৎকৃষ্ট বিলেতি খেলনা উপহার দিলে হয়তো কাজের সুবিধা হতে পারে। ইংরেজরা এক লাখ দুই হাজারের কিছু বেশি টাকার বিভিন্ন জিনিসপত্র ও খেলনা উপহার দিলেন সম্রাটকে। আজকের বাজার মূল্যে যা শতকোটিরও বেশি হবে। সম্রাটের দরবারের আমির ওমরাহদের জন্য সেসব জিনিসপত্র দেয়া হলো তার দামও এক লাখ আট হাজার টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দরখাস্ত পেশ করা হলো যথাসময়ে। কিন্তু সম্রাটের কাছ থেকে কোনো উত্তর তো আর আসে না। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, যে উজিরের মাধ্যমে দরখাস্ত দেয়া হয়েছে তার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। রাজ দরবারে সত্যিকারের কিছু ক্ষমতা ছিল যাদের তারা দুই ভাই, আবদুল্লা আর হুসেনের। এবার এ দুই ভাইকে যথেষ্ট পরিমাণ উৎকোচ দিয়ে পুনরায় দরখাস্ত পেশ করা হলো। এবার কাজ হলো জাদুর মতো। ফররুখশেয়ার ইংরেজদের কলকাতার কাছে চব্বিশটি গ্রামের জমিদারি বকশিশ দিলেন। এ হলো বর্তমানে কলকাতার চব্বিশ পরগনা জেলা।
উপরোক্ত দৃষ্টান্ত দুটি থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, যুগে যুগে দুর্নীতিগুলো আসলে শুরু হয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই। তারপর সেটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে নিচের স্তরে। মাছের পচন যেমন শুরু হয় মাথা থেকে ঠিক তেমনি। বিগত চার-পাঁচ বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে লুট হয়ে যায় হাজার হাজার কোটি টাকা। শিক্ষামন্ত্রী তার উন্মুক্ত বক্তৃতায় রাষ্ট্রের কর্মচারীদের কম করে ঘুষ খেতে পরামর্শ দেন ইত্যাদি। ঘুষ, দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস চারদিকে এমন অরাজক পরিস্থিতি দেখেও দেশের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। দেশের সাধারণ মানুষের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে কেন তারা পাচ্ছেন না এর যথাযথ প্রতিকার। এর উত্তরও রয়েছে ইতিহাসের পাতাতেই, শুধু চোখ দুটো খুলে একটু দেখতে হয়। উত্তর আমেরিকার ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের একটি দেশ হলো ডমেনিকান রিপাবলিক। দেশটি স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে ১৮২১ সালে। ১৯৩০ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে র্যাফায়েল লিউনাইডাস ত্রোহিও। কিন্তু এরপর তিনি দেশটিতে আর কোনোদিন নির্বাচন দেননি। ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৬১ সাল অর্থাৎ আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। তার এ ৩০-৩১ বছর শাসনকালকে বলা হয় ‘ত্রোহিও যুগ’। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার শিক্ষালয়গুলোতে স্বৈরশাসকের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হয় ত্রোহিও যুগ। রাষ্ট্রপতি ত্রোহিও ক্ষমতায় টিকে থাকতে শুধু কাগজ-কলমে গুম, খুন ও হত্যা করেছিলেন পঞ্চাশ হাজার মানুষ। তার শাসনামলে সুশাসন মানবাধিকার এগুলো তো অনেক দূরের কথা, শুধু দুর্নীতির কারণেই দেশটি যেন অচল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। ত্রোহিও ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দেখলেন কাকে রেখে কাকে ধরবেন উনি। দুর্নীতিবাজরা কমবেশি সবাই তার পেটোয়া বাহিনী কিংবা অপকর্ম দলের সদস্য। কয়লা থেকে ময়লা উনি কীভাবে আলাদা করবেন। কম্বল থেকে উল পৃথক করার চেষ্টা করলে হয়তো দেখা যাবে সম্পূর্ণ কম্বলটিই আর থাকছে না। ত্রোহিও ছিলেন অতি ধুরন্ধর ও হিসেবি ধরনের মানুষ। তিনি তার কোষাগার পূর্ণ করার জন্য এক অভিনব ফন্দি আঁটলেন। তিনি ঘোষণা দিয়ে দিলেন সমস্ত ঘুষখোরের ঘুষ বৈধ হয়ে যাবে যদি তারা তাদের প্রাপ্ত অবৈধ অর্থ থেকে ২৫% সরকারি কোষাগারে জমা করে দেন। ত্রোহিওর কোষাগারে কত টাকা জমা পড়েছিল সেটা আমার জানা নেই। তবে আমার ব্যক্তিগত মত এই যে, ত্রোহিওর বাতলে দেয়া এ পন্থা এখন বাংলাদেশেও অনুসরণ করার সময় এসে গেছে।
এবার বেগম জিয়া প্রসঙ্গে আসি। মাস দেড়েক আগে হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কে বা কারা ‘বেগম জিয়ার সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে সৌদি সরকার’ মর্মে একটি কাল্পনিক খবর প্রচার করতে থাকে। পরবর্তীতে ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ একটি নিউজ করে বেগম জিয়ার তথাকথিত এ অর্থসম্পদ নিয়ে। প্রকাশিত খবরটির সোর্স হিসেবে অবজারভার ক্যানাডিয়ান টিভি চ্যানেল দ্য ন্যাশনাল এবং আরবভিত্তিক চ্যানেল দ্য গ্লোবাল ইনটেলিজেন্স নেটওয়ার্ক বলে উল্লেখ করে। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর এ সময়ে কল্পনাপ্রসূত, বানোয়াট কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো খবর প্রচার করে কি পার পাওয়া সম্ভব? কারণ যেখানে প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতে আছে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট। ইতোমধ্যে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, ক্যানাডায় দ্য ন্যাশনাল টিভি চ্যানেল কিংবা আরবভিত্তিক দ্য গ্লোবাল ইনটেলিজেন্স নেটওয়ার্ক নামে কোনো চ্যানেলের অস্তিত্ব নেই।
তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে কেন এ মিথ্যা অপপ্রচার। সন্দেহ নেই এর উত্তরও কিন্তু ইতিহাসের পাতা খুললে স্পষ্টই চোখে পড়বে। এটি একটি অতি প্রাচীন ও প্রচলিত অপকৌশল। সে বিষয়ে আলোকপাত করার আগে বেগম জিয়ার চরিত্রের কয়েকটি দিক একটু এখানে তুলে ধরতে চাই। তার সঙ্গে কথা বলে কিংবা তাকে কাছ থেকে যতটুকু দেখেছি আমি, শুধু সেটুকুই বলতে পারি। ভবিষ্যতে হয়তো তার অতি নিকটজন লিখবেন তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী। পাঠকদের হয়তো মনে আছে ১৯৯৬ সালে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে সচিবালয়ের উপকণ্ঠে জনতার মঞ্চ নামক একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। তো হয়েছে কী, সেই মঞ্চ থেকে তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল। তখন বিএনপির দুজন ওপরের সারির নেতা ও মন্ত্রী বেগম জিয়াকে বললেন, দেখেছেন কী শুরু করছে ওরা! আপনি এক্ষুনি পুলিশ দিয়ে এসব মঞ্চফঞ্চ উঠিয়ে দিন। তাদের কথা শুনে বেগম জিয়া সেদিন বলেছিলেন, আন্দোলন করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আর আমি যদি এখন পুলিশ দিয়ে এ মঞ্চটি ভেঙে দেই তাহলে দেশের মানুষ হয়তো সেটা ভালো চোখে দেখবে না। বলতে গেলে বলতে হয় একেবারে সোজাসাপটা মানুষ বেগম জিয়া। অন্তরে যা পোষণ করেন মুখেও তাই বলে দেন। কোনো দেখানোপনা নেই।
রাজনৈতিক স্ট্যানবাজি পছন্দ করেন না একেবারেই। অনেক সময় দেখা যায়, ফুটবল খেলার মাঠে গোলকিপার যে বলটা হয়তো অতি সহজেই ধরতে পারেন কিন্তু সে বলটাই তিনি তখন লাফ দিয়ে উঁচুতে উঠে ধরেন। তারপর মাটিতে পড়ে ডিগবাজি খায় কয়েক দফা। বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চেও অনেক খেলুড়ে নেতাকে দেখা যায়, রাজনৈতিক স্ট্যানবাজির আশ্রয় নিতে। আরেকদিনের ঘটনা। আমি গিয়েছি বেগম জিয়ার গুলশান অফিসে। বেগম জিয়ার বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আমাকে দেখেই বললেন, বেগম জিয়ার কক্ষে সব আইনজীবী উনার মামলা নিয়ে কথা বলছেন। যাও তুমিও গিয়ে বস ওখানে। শিমুল বিশ্বাস আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। আমাকে পুত্রতুল্য স্নেহ করেন। আমি একটু ইতস্তত করছি দেখে বললেন, তোমার জন্যও একটি চেয়ার রাখা আছে, যাও অসুবিধা নেই। আমি কক্ষে ঢুকতেই বেগম জিয়ার একজন ফটোগ্রাফার আমাকে দেখে একটু হাসি-মশকরা করে বললেন, কী ব্যাপার! আজ তো দেখছি মুজিব কোট পরে এসেছেন। আমি বললাম, কেন উনি (বঙ্গবন্ধু) কি এমন রংচঙের মেরজাই (মুজিবকোট) পরতেন নাকি। বেগম জিয়া ঈষৎ হেসে বললেন, পোশাকের আবার ধরন কী, পোশাক তো পোশাকই। ওইদিন বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বন্ধুবর ব্যারিস্টার মীর হেলাল ছাড়াও আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার, অ্যাডভোকেট সজলসহ কিছু আইনজীবী।
বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গটি এলো বলেই হয়তো সেদিন বেগম জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক প্রশংসা করলেন। বললেন, উনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তার মধ্যে দেশপ্রেম ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যারা দেশ চালাচ্ছেন তাদের এহেন দেশ পরিচালনা যদি আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন আর সেটা তিনি নিজ চোখে দেখতেন তাহলে হয়তো তিনিও কষ্ট পেতেন। যারা বলেন, বেগম জিয়া তার জন্মদিনের কেক কাটেন প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বশবর্তী হয়ে তাদের উদ্দেশে বলছি, পৃথিবীর সব মানুষ এটা বিশ্বাস করলেও অন্তত আমি বিশ্বাস করি না এ কারণে যে, সেদিন ওই কক্ষে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন না যে তাকে খুশি করার জন্য বেগম জিয়া এসব বলেছিলেন। যে মানুষ আমাদের এতগু মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করলেন অথচ তিনিই প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির কারণে কেক কাটবেন, এটা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন। উনি যে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না তার আরেকটি উদাহরণ দেই। এখন বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারের কারণ প্রসঙ্গে দু’চার কথা বলা যাক। আমি আগেই উল্লেখ করেছি জনপ্রিয় কোনো নেতা কিংবা নেত্রীকে অজনপ্রিয় কিংবা অপদস্থ করার অতি প্রাচীন একটি কৌশল হচ্ছে তার বিরুদ্ধে নানা প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচার। হোক সেটা দুর্নীতি কিংবা অন্যকিছু। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ব্রুটাসের হাতে নিহত হওয়ার পর সিংহাসনে বসলেন তার ভাগ্নে অগাস্টাস সিজার। জুলিয়াস সিজারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মার্কঅ্যান্টনি ছিলেন অসাধারণ যোদ্ধা সেই সঙ্গে অনেক সৈন্যবাহিনী ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। তিনি রোমের জনগণ ও রাজনীতিবিদ উভয়পক্ষের কাছেই ছিলেন সমান জনপ্রিয়। অগাস্টাস সিজার দেখলেন মার্কঅ্যান্টনি যদি বেঁচে থাকে তাহলে তার জন্য একটা বড় হুমকি হচ্ছেন তিনিও। কারণ যে কোনো সময় মার্কঅ্যান্টনি দখল করে নিতে পারে সিংহাসন। আবার তাকে হঠাৎ গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যা করলেও বিপদ, কারণ তখন হয়তো রোমের জনগণের রোষানলে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। অগাস্টাস সিজার তক্কে তক্কে রইলেন। বিদ্রোহীদের দমন করতে মার্কঅ্যান্টনি যখন মিসর গেলেন তখন অগাস্টাস সিজার মার্কঅ্যান্টনির বিরুদ্ধে খবর রটিয়ে দিলেন যে মার্কঅ্যান্টনি মিসরের সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার সঙ্গে যোগসাজশ করে রোমের বিরুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন ষড়যন্ত্রে। এভাবে তিনি রোমের জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুললেন। তারপর তার বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেন মিসর এবং হত্যা করলেন মার্কঅ্যান্টনিকে। অগাস্টাস সিজার মোটেও ভালো যোদ্ধা ছিলেন না। তিনি শুধু নৌবহরে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন আর জেনারেলরা তার এসব হুকুম তামিল করেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি যখন হেরে যায় তখন জার্মান জেনারেল এরিক লুডেনডফ অভিযোগ করে বলেছিলেন যে- ‘আমাদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের গভীর অপপ্রচারের কারণেই আমরা হেরে গেছি।’ এরিক লুডেনডফের এ উক্তিটিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন হিটলার আর এ জন্য তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শুধু প্রোপাগান্ডার জন্য বিশেষভাবে নিযুক্ত করেছিলেন ডক্টর জোসেফ গোয়েবলসের মতো লোককে। কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি হিটলারের। এই তো কয়েক দশক আগের ঘটনা, ফিলিপাইনে বেনিগনো অ্যাকুইনো নামে একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। কারণ সে সময়কার স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৮০ সালে মার্কোস তাকে পাঠাল নির্বাসনে। ১৯৮৩ সালে যখন বেনিগনো দেশে ফিরে এলেন সেদিন ম্যানিলা বিমানবন্দরেই তাকে হত্যা করল মার্কোসের ভাড়া করা আঁততায়ী। ফিলিপাইনের জনগণ ঘর থেকে বের করে নেতা বানাল বেনিগনোর স্ত্রী কোরাজন অ্যাকুইনোকে। কিছুদিনের মধ্যেই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন কোরাজন অ্যাকুইনো। নির্বাচনের আগে মার্কোস এমন কোনো অপপ্রচার নেই যে অ্যাকুইনোর বিরুদ্ধে করেননি। ১৯৮৬ সালে ব্যাপক অনিয়ম ও ভোট জালিয়াতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। নির্বাচন সহিংসতায় মারা গেলেন অ্যাকুইনোর অনেক প্রভাবশালী নেতাকর্মী। নির্বাচনের পর মার্কোসের অনুসারীরা যখন আনন্দ-উল্লাস করেছিলেন ঠিক তখনই জনসাধারণের আন্দোলনের মুখে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেলেন মার্কোস। প্রোপাগান্ডা কিংবা অপপ্রচার যাই বলি না কেন এটা কিন্তু সাধারণত তিন ভাবে বিস্তৃত হয়।
প্রথমত, পরামর্শ দ্বারা মিডিয়া কিংবা প্রভাবশালীদের প্ররোচিত করা। দ্বিতীয়টি পক্ষপাতিত্বমূলক আর তৃতীয়টি হচ্ছে, আদর্শিক। এই যে বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্র বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে এমন একটি সংবাদ প্রচার করল, এর দায় কে নেবে? বাংলাদেশ না হয়ে যদি পশ্চিমা দেশগুলোতে এটা হতো তাহলে কী হতো? এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল ইরাক যুদ্ধের সময়। অনেকেরই হয়তো এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ২০০২-০৩ সালে জর্জ বুশ, কলিন পাওয়েল, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, কন্ডোলিজা রাইস প্রমুখ ব্যক্তি টিভির সামনে এসেই আমেরিকান অনুনাসিক উচ্চারণে কিছু বুলি আওড়াতেন ‘ইরাক হ্যাজ গট দ্য উইপন অব মাস ডেস্ট্রাকশন্স’। বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায়- ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এ প্রোপাগান্ডাটি যিনি সর্বপ্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন তার নাম জুডিথ মিলার। অর্ধেক ইহুদি ও অর্ধেক রোমান ক্যাথলিক এ সাংবাদিক কাজ করতেন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে। তিনি সর্বপ্রথম ইরাক নিয়ে সম্ভবত ২০০২ সালের দিকে একটি সংবাদ প্রচার করেন, তার কাছে ‘তথ্য-উপাত্ত’ আছে যে, ইরাকের কাছে প্রচুর পরিমাণ পরমাণু অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে জর্জ বুশ, কলিন পাওয়েল প্রমুখ বিভিন্ন টিভি মিডিয়ায় জুডিথ মিলারের লেখাসংবলিত পত্রিকাটি হাতে তুলে নিয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে বললেন, দেখুন, শুধু আমরা নই বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক জুডিথ মিলারও বলছেন, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। বিভিন্ন সময় আরববিরোধী মনোভাবের কারণে তখন থেকেই অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, মিলার আমেরিকার বড় বড় রাঘববোয়াল ইহুদি লবিস্টের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করেছেন। ইরাকে যখন গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পাওয়া গেল না তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে হয় মামলা। সে মামলায় ফেডারেল কোর্ট তার পরিবেশিত সংবাদের উৎস সম্পর্কে জানতে চান তার কাছে। কিন্তু প্রকাশিত খবরের উৎস বলতে না পারায় কোর্ট তাকে আদালত অবমাননার দায়ে ১৮ মাসের কারাভোগের শাস্তি প্রদান করেন।
দেশবাসী খুব ভালো করেই জানেন বাংলাদেশে পাওয়া যাবে না এর কোনো প্রতিকার।
লেখক: গল্পকার ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট