কোভিড স্পষ্ট করেছে ভারতের শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোগত বৈষম্যকে। অতিমারিতে মৃত্যুর ঘটনা শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি। কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গেও অব্যাহত এই প্রবণতা। শহরের তুলনায় গ্রামে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী শুধু এপ্রিলেই দেশে কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ হাজার। বিশ্বে ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে একদিনে ৪ লক্ষ নতুন সংক্রমণ ধরা পড়েছে। দ্বিতীয় তরঙ্গের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এটা আরও বাড়বে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, এটা ঘটবে মে’র মাঝামাঝি বা তারও একটু পরে। সংক্রমণ ভয়াবহ চেহারা নেবে তখন। এই ধাক্কা অবশ্য শহরের গায়েও লাগবে বলে তাদের অভিমত।
গ্রামে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ হল শহরের তুলনায় সেখানকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। অথচ জনসংখ্যার চাপ সেখানেই সবচেয়ে বেশি। মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতাও চোখে পড়ার মত কম। একটা ছোট উদাহরণ দিলেই এই সীমাবদ্ধতার ছবিটা পরিস্কার হবে। ২০১৯ এর ন্যাশনাল হেলথ প্রোফাইল অনুযায়ী ভারতের গ্রামীণ হাসপাতালগুলিতে শয্যার সংখ্যা মাত্র ৩৭ শতাংশ। বোঝাই যাচ্ছে বড় সংক্রমণের মোকাবিলা করার নূন্যতম পরিকাঠামো সেখানে নেই। এই সমস্যার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতাও তুলনামূলকভাবে গ্রামে কম। এই কারণে সেখানে লোকে সংক্রমণ এড়ানো ও আগেভাগে অতিমারি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেন না। এমনকি আক্রান্ত হওয়ার পরেও চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করে ফেলেন।

এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা জানা সত্যিই কঠিন। সব খবরই সরকারের কাছে আসে অনেক দেরিতে। আক্রান্ত হওয়ার পর সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার আগেই ছড়িয়ে যায় রোগ, ঘটে যায় মৃত্যু। সঙ্কটের প্রকৃত ছবিটা তাই সবসময় অধরা থেকে যায়। সব মিলিয়ে গ্রামে অতিমারি সংক্রমণ তাই ব্যাপক আকার নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মতে, ভারতে অতিমারিতে মৃত্যুর হিসেব সরকারি হিসেবের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ সব হিসেব প্রশাসনের কাছে এসে পৌঁছয় না। ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের হিসেব অনুযায়ী দেশে কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৬,৫৪,৩৯৫। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে আন্ডার রিপোর্টিং অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যা কম করে দেখানোর প্রবণতার জন্য অতিমারিতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা অনেক সময়ই সামনে আসে না। তাদের মতে, ভারতে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা যা বলা হচ্ছে তার তিনগুণ বেশি দাঁড়াবে।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নত না করতে পারলে কোভিডে গ্রামীণ মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যু যে আরও বাড়বে তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোন দরকার নেই। পরিসংখ্যানের জাগলারিতে মৃত্যু ঢাকা পড়বে না।