ঘরের তিক্ততা কত ভাবেই না প্রকাশিত হয়। সেই তিক্ততায় সাময়িক মধু মিললেও তার রিক্ততা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। এজন্য ঘরমুখো হওয়ার কথা বললেই মনটা কেমন করে ওঠে। সেখানে বাইরের মুক্ত জীবনের হাতছানি যেন ভেঙচি কেটে ঘরে পাঠিয়ে দেয়। সকাল সকাল অফিসফেরত স্বামীকে দেখে স্ত্রীর মুখে কারণ দর্শানোর নোটিশ উঠে আসে। যেন স্বামী আসামী। স্বামীও কম যায় না, বদনে হাসি তুলে স্বামীজি হয়ে জানালে, ‘বসকে বললাম, এখন কি করবো? উনি বললেন, জাহান্নমে যাও। আমি তাই বাড়ি ফিরে এলাম।’ উত্তর শুনে সেই স্ত্রী হেসেছিল, কি কেঁদেছিল, তা জানা যায় না, তবে বোঝা যায়।
আগে বাড়ি ছিল প্যারিসের মতো, সব রাস্তা যেখানে এসে মেলে। দিনের শেষে একান্ত আপন। সেই বাড়ির মধ্যে আরও একান্ত করে পাওয়া ঘর ছিল যাপনের পরম পরশ। তখন আপন-পর বলতে ঘরে-বাইরের সম্পর্ক। বাড়ির সেই আভিজাত্য মন্দিরে একাত্ম হয়ে ওঠে, অস্থায়ী বাসায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, বাড়ির আবাসে একদিকে তার পবিত্রতা নেমে আসে, অন্যদিকে তার স্বপ্ন জেগে থাকে। এজন্য আশ্রমিক জীবনের ছোঁয়ায় তার বিস্তার লাভ ছিল সময়ের অপেক্ষা। আনন্দ আশ্রম, আনন্দ মঠ, আনন্দ নিকেতন, শান্তিনিকেতন, শ্রীনিকেতন থেকে বৃদ্ধাশ্রম, অনাথাশ্রম প্রভৃতিতে তার বিস্তার। অন্যদিকে স্বপ্নেও সেই বাড়ির ঠিকানা। ‘স্বপ্ননীড়’, ‘একান্ত আপন’, ‘ভালো-বাসা’, ‘নীল নির্জন’ থেকে ‘জীবন সায়াহ্নে’, ‘অবশেষে’ ‘শেষ ঠিকানা’ তার কত নাম-ডাক। সেই বাড়ির পারিবারিক বন্ধন সময়ের টানে শিথিল হয়ে পড়ে। তখন ঘর হয়ে ওঠে পর। সুইট হোম শেষে বিটার-এ ঠেকে সোয়েট হোমে এসে দাঁড়ায়। তখন বাইরের ঘাম শুকনোর বাড়িই ঘাম ঝরানোর আধার হয়ে বসে। পারিবারিক সম্পর্ক শেষে পরিবার ছেড়ে বিজ্ঞাপনে আন্তরিক মনে হয়। মায়ের হাতের রান্না তখন হোটেলে সুলভ হয়ে আসে।
যে বাড়ি ছিল মুক্ত জীবনানন্দের হাতছানি, সেই বাড়িই মনে হল বন্দিজীবনের একঘেয়েমি। সেখানে বাইরের টান তীব্র মনে হয়। ঘরকুনো বাঙালিও ভ্রমণবিলাসী হয়ে ওঠে। এজন্য সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ায় পটু বাঙালি ঘরকেই দিল বেঘোর করে। সেখানে খেয়ালখুশির নিত্য হাতছানিতে রস ও রসনাতৃপ্তির পেল্লায় আয়োজনে মনের চলন সদা সচল। বাড়ির নামে উঠে এল ‘রবিবার’, ‘ছুটি’, ‘অবসর’ আরও কত কি! তবু রবিবার আসে না, ছুটি মেলে না আর অবসরের আনন্দ হাতছানি দিয়ে ডাকে না। আসলে আমরা নামধাম পাল্টে বাড়িকে আপন করতে গিয়ে তাকে আরও পর করে তুলেছি। সেখানে ঠাকুরঘরকে ছোট করে রান্না ঘর বড় হয়ে উঠেছে। আগের ছোট্ট পাকঘর থেকে কতজনের রসনাতৃপ্তি হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। এখন ঢাউস কিচেনের খাবারেও ডাইনিং টেবিলটি নীরবতা পালন করে। ঝিকে মাসি বলে তো আর মাসির স্বাদ মেটে না। মাসি বলায় নয়, থাকে মনে। এজন্য চার দেওয়ালের মধ্যে বাড়িঘরের পরশ মেলে না, আমাদের মনেই তার বসতি, তার সজীবতা। তাতে নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশটা বড়। যখনই আমরা মনের মধ্যে আন্তরিকতার পরশ অনুভব করি, তখনই সেই ঘরটি জেগে ওঠে, চারপাশটা বাড়ি মনে হয়। করোনা ভাইরাস আমাদের চার দেওয়ালে আবদ্ধ করলেও মনে আমরা খোলা জানালা, দরাজ দরজা। সেখানে ঘর রুদ্ধ হয় হোক ক্ষতি নেই, মনের বাতিঘরটি যেন না নেভে। আমরা যে সকলের তরে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া ৭২৩১০৪।