করোনা নিয়ে মাত্রাছাড়া আতঙ্কে ভুগলে প্রতিমুহূর্তেই হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা। মনে রাখা দরকার, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ এবং ডিপ্রেশন বা অবসাদ মানুষের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে তিল তিল করে শেষ করে দিতে পারে। ফলে এমনও হতে পারে, যে করোনা আতঙ্কে একজন ভুগছেন তাঁর শরীরে করোনা ভাইরাসের কোনও অস্তিত্ব আদৌ খুঁজে পাওয়া গেল না, অথচ তিনি হয়তো অন্য কোনও গুরুতর রোগের কবলে পড়ে গেলেন। যার হাত ধরে মৃত্যুর পদধ্বনিও বিচিত্র নয়। মনোরোগ-বিজ্ঞান বলছে গোটা দুনিয়া এবং অবশ্যই আমাদের দেশের মানুষ সম্প্রতি যে ধরণের সঙ্কটের মধ্যে পড়েছেন তাতে অনেকেই হয়তো হারিয়ে ফেলছেন মানসিক ভারসাম্য। শিকার হচ্ছেন মনোবিকারের। মনস্তত্ত্বের ভাষায় সাধারণভাবে যাকে বলা যায়, Fear cum Phobic Anxiety, sometime psychotic dimension.
কথা হচ্ছিল ‘ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি’র অধিকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার সাহার সঙ্গে। বললেন, এইরকম পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে Fear psychosis দেখা দিতেই পারে। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে, সুগার কিংবা ব্লাডপ্রেসার যাঁদের মধ্যে বর্ডার লাইনে ছিল বা আছে, আচমকা তা বেড়ে গিয়ে দেখা দিতে পারে ঘোরতর বিপত্তি। ফ্যামিলি হিস্ট্রিতে থাকলে বেড়ে যেতে পারে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কিংবা সেরিব্রাল অ্যাটাকের সম্ভাবনাও। Fear cum Phobic Anxiety শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে যাতে সহজেই প্রবেশ করতে পারে করোনা বা আরও কোনও বিপজ্জনক অসুখ। তাই ‘আমার করোনা হবেই। ধ্বংস হয়ে যাবে গোটা পরিবারটাই’—এমন কোনও অমূলক আশঙ্কাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয় কখনওই। কোনওভাবেই আমন্ত্রণ জানানো উচিত নয় আরও বড় কোনও বিপদকে। বরং আমরা নিজেরাই পারি এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে—এই আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে নিজেদের মধ্যে।

সমস্যাটা হচ্ছে মাস্ক এবং স্যানিটাইজারের অপ্রতুল জোগান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে উদ্বেগের মাত্রাটাকে। ডা. প্রদীপ সাহার মতে, এই নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারণই নেই। ঘনঘন হাত ধোয়ার জন্য যে কোনও সাবানই যথেষ্ট। পরীক্ষায় দেখা গেছে COVID-19-এ একটা পেরেক বা হুল জাতীয় জিনিস আছে যার নিচে আছে ফ্যাটজাতীয় স্তর। যা আকৃষ্ট করে সাবানজলকে। মাত্র ১৫/২০ সেকেন্ড সাবানের কেমিক্যাল-এর সংস্পর্শে এলেই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় ভাইরাস। অতএব, স্যানিটাইজার পেলে ভালো। না পেলে ঘাবড়াও মাত। মাস্ক না মিললেও ক্ষতি নেই। স্বস্তির কথা, এই ভাইরাসের আকার তুলনামূলকভাবে বড়। তাই কাপড় কিংবা রুমাল দিয়ে, কিছু না হলে কাগজ দিয়ে নিজেই তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে মাস্ক। একবার ব্যবহারের পরে তা নষ্ট করে ফেললেই হলো। আর করমর্দন এড়িয়ে করজোড়ে নমস্কার, এর তো সত্যিই কোনও বিকল্প নেই।
আসলে দুশ্চিন্তা করে কোনও লাভ নেই। মানসিক অসুস্থতাকেও ডেকে এনে লাভ নেই। ডা. সাহার যুক্তি, করোনার হামলায় মৃত্যুর হার কিন্তু এখনও পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে কম। ৩.৪ শতাংশ। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। কিন্তু ১০ বছরের নিচে কোনও শিশুর মৃত্যুর খবর নেই এখনও। তবে বয়স্করা অবশ্যই স্পর্শকাতর। তা ছাড়া আমাদের দেশের তাপমাত্রাও তুলনামূলকভাবে তেমন একটা সুবিধেজনক নয় এই ভাইরাসের দাপটবৃদ্ধির পক্ষে। মনে রাখা দরকার, খাবার আগে হাত তো আমাদের এমনিতেই ধুতে হয়। পেটের অসুখ থেকে বাঁচতে এটাই নিয়ম। এক্ষেত্রে না হয় কোনও কিছুতে হাত দিলেই অন্তত ১৫/২০ সেকেন্ড ধরে সাফ করতে হবে সাবান দিয়ে কিংবা স্যানিটাইজার দিয়ে। ঘনঘন হত ধুতে হবে নিজে বাঁচতে, অন্যকে বাঁচাতে। তা হলে অসুবিধেটা কোথায়? আসলে নিয়ম মেনে যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করতে পারলে এই ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই। শুধু শুধু ভয় পাওয়ার কোনও কারণই নেই। দরকার শুধু ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সঠিক পরিকল্পনা এবং রূপায়ন। নিজেকে ব্যস্ত রাখলে, সৃষ্টিশীল কাজে ডুবে থাকলে, গল্পগুজব করলে, বাড়িতে বসে বই পড়লে, মনের মতো রান্নাবান্না, লেখালেখি বা গান-বাজনা করলে এবং অবশ্যই টিভিতে চোখ রাখলে প্রশ্রয় পাবে না অমূলক ভয়। সব মিলিয়ে একটু চাপমুক্ত রাখতে হবে নিজেকে।
লক্ষ্য করার বিষয়, এসএসকেএমের ‘ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি’তে রোগীর ভিড় লেগেই আছে। মানসিক রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি করোনার ব্যাপারেও রোগী এবং পরিজনদের সচেতন করছেন মনের ডাক্তাররা। প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে গত দু-দিনে প্রায় হাজারখানেক মানসিক রোগী সামলেছেন ১০ জন ডাক্তার। নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা তো আছেনই। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় প্রশাসকরাও। এইভাবেই বিভিন্ন হাসপাতালে আপোসহীন লড়াই চলছে এই সঙ্কটের মুহূর্তে। কেউই বিন্দুমাত্র পাত্তা দিচ্ছেন না উদ্বেগ কিংবা দুশ্চিন্তাকে।