নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
‘করোনা’ বস্তুটা স্ত্রীলিঙ্গ হবে, না পুংলিঙ্গ হবে—এই রকম একটা চর্চায় এক ভাষাবিদ বিধান দিলেন যে, শুধু করোনা বললে সেটা স্ত্রীলিঙ্গ হবে, আর একত্রে ‘করোনা-ভাইরাস’ বললে সেটা পুংলিঙ্গ হবে। আমি বললাম—এটা কী রাধা থেকে রাধামাধবের মতো ব্যাপার নাকি? রাধা স্ত্রীলিঙ্গ রাধামাধব পুংলিঙ্গ? ভদ্রলোক বললেন—আপনি এক্কেবারে সঠিক উদাহরণ দিয়েছেন—এবং এমনকী লক্ষ্মী-নারায়ণ বললেও ভুল হত। কেননা রাধাকান্ত, রাধামাধব যতই বলুন, রাধার সঙ্গে মাধবের কিন্তু বিয়ে হয়নি। ভাইরাস জিনিসটাও কৃষ্ণের মতো বহুবল্লভ। দেখবেন, মাঝে-মাঝেই নাম পালটে-পালটে এক-একটা আসে কখনও সার্স, কখনও ডেঙ্গু, কখনও করোনা। আর এই যে এত কারফিউ, এত লক্ডাউন—এর কোনোটাই আমার কাছে অশ্রদ্ধেয় নয়, কিন্তু শুধু একুশ দিন কেন, আপনি যদি একশ দিনের কাজ না করে একশ দিনেরও লক্ডাউন করেন, তাহলেও ভাইরাসটা নির্মূল হয়ে চলে যাবে নাকি? করোনা থাকবে।
আমি আর ঠাট্টামস্করা না করে বললাম—সে কী কথা? তাহলে ওই যে ভাবছিলাম—ওর হয়েছে, তার হয়েছে, আমার হবে না, তাহলে? ভদ্রলোক বললেন, আরে, অত ভয় পাবেন না, বর্ষাকালের ডিপ্ ডিপ্রেশন যেমন অনেক সময়েই ‘ল্যান্ড’ করার পরেই শক্তি হারিয়ে ফেলে, তেমনই প্রকৃতির নিয়মে করোনাও শক্তি হারাবে। করোনা থাকতে-থাকতেই মানুষের শরীর তাকে গ্রহণ করবে, বর্জনও করবে, ‘ইম্মিউনিটি’ তৈরী হবে, ভ্যাক্সিন তৈরী হবে, ওষুধ তৈরী হবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ভাবুন না একবার, ম্যালেরিয়ায় তো আমাদের দেশে গাঁ-কে-গাঁ উজার হয়ে গেছে। তারপর কুইনাইন বেরিয়েছে। ম্যালেরিয়ার সেই প্রকোপ আর নেই, কিন্তু ম্যালেরিয়া কি পুরো চলে গেছে? এখনও তো ম্যালেরিয়া হয়। তেমনই করোনাও থাকবে। কিন্তু আপনি বাঁচবেন।
করোনা নিয়ে এরকমই তক্কাতক্কি চলছিল, এমনকী চলছিল নানান মস্করাও। কিন্তু ওই আমার কবি বলেছেন—বজ্র কহে, মূরে আমি থাকি কতক্ষণ/আমার গর্জনে বলে মেঘের গর্জন। আমরাও মেঘের গর্জন শুনছিলাম—চীন থেকে ততদিন করোনা ইংল্যান্ড-অ্যামেরিকা-ইটালিতে পাড়ি দিয়েছে, আমাদের দেশেও একটা-দুটো আরম্ভ হয়ে গছে। পশ্চিমবঙ্গে ততদিনে মমতা কিন্তু কাজ শুরু করে দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবেই এক ‘ফুল স্ট্রাটিজি’ তৈরী করে একত্রিশে মার্চ আবার সব পর্যালোচনা হবে—এই আশ্বাস দিয়েই মমতা কিন্তু সংক্রমণ রোধ করার সাধ্য পথ স্কুল-কলেজ এবং অন্যান্য সংঘট্টের জায়গাগুলি বন্ধ করে গরীব মানুষের চাল-ডালের ভাবনা শুরু করে দিয়েছিলেন এবং তা ১৮/১৯ মার্চের মধ্যেই।
কিন্তু রাজ্যের এই অন্তর্ভাবনার মধ্যে তো কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু সহযোগিতা লাগে এবং তাঁরা তো প্রায় সংক্রমণটা হতে দিলেন। ১০/১১ মার্চের সময় থেকেই যদি আন্তর্জাতিক বিমান-পরিষেবা বন্ধ হত এবং ভারতীয় নাগরিকদের বিশেষ বিমানে ফিরিয়ে এনে শুধু হাসপাতালের ‘কোয়ারিনটাইনে’ ঢুকিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে এই দুর্গতি হত না। কিন্তু তা হল না। কেননা অনেক মহান বুদ্ধিমান আছেন, যারা বজ্রপাত দেখার পরেও শঙ্কিত হন না। ভাবেন বুঝি—ওদের মাথায় পড়ছে, আমার মাথায় তো পড়েনি। কিন্তু কবি তো বলেই দিয়েছেন—এঁরা তখনই বোঝেন যখন নিজের মাথায় পড়ে—‘মাথায় পড়িলে বলে বজ্র বটে’। সারা ভারতবর্ষে যখন ‘করোনাতত্ত্ব’ ঢুকে গেছে, তখন আমাদের একটা আতঙ্কের Test নেওয়া হল ‘জনতা কারফিউ’ করে। আতঙ্ক যথেষ্ট ছিল বলেই আতঙ্কের পরীক্ষাও বেশ সফল হল।
প্রভু এটা জানতেন যে, দুনিয়া জুড়ে আতঙ্কের আবহে তাঁর এই পরীক্ষা সফল হবেই। আর জানতেন বলেই আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা তালি-থালি, তুরী-ভেরী, শঙ্খ-করতাল সব বাজাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু অশনি সংকেত পেলেন। তিনি গরীবদের জন্য চাল-ডাল জোগাড় এবং তার বিলি-বন্টনের ভাবনা সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসার সুব্যবস্থায় মন দিলেন। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ করার জন্য তিনি যে এত দিন বলে যাচ্ছিলেন, সেটা কিন্তু ২৩ তারিখ পর্যন্তও কেন্দ্রীয় প্রভুরা বন্ধ করলেন না। ফলত রোগ-বহন পূর্ণ হওয়ার পর ২৪-এর রাত বারোটার পর থেকেই ঘরবন্দি হয়ে গেল মানুষ। এই ঘটনাটা নিশ্চয়ই খুব প্রয়োজন ছিল, নিশ্চয় প্রয়োজন ছিল এই প্রভুসম্মিত আদেশের। মানুষ সাতঙ্কে চলতে আরম্ভ করল নিয়ম-মত।
কিন্তু এত বড় আদেশের কিছু অনুষঙ্গ থাকে। নিধিরাম সর্দারেরও এই সময় ঢাল-তরোয়াল প্রয়োজন হয়। সেখানে করোনা-মোকাবিলায় হাসপাতালগুলির ‘ইনফ্রা-স্ট্রাকচার’ তৈরী করা থেকে লক-ডাউনের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য ‘ফুড-চেইন’ ঠিক রাখার জন্য যে অসাধ্য সাধন করে দেখালেন মমতা, তাতে এটা প্রমাণ হল যে, ভারতীয় রেল-ব্যবস্থা বঙ্গবাসীর ক্ষুধার রাজ্যে কোনো অপরিহার্য বস্তু নয়। চলমান রেলগাড়ির চেয়ে চলমান মমতাই আমাদের কাছে অপরিহার্য।
লক-ডাউনের মধ্যেও আমরা বেশ চলছিলাম, ঘরে থাকার ফলে খাওয়া-দাওয়া প্রায় চর্ব্য-চোষ্যে পরিণত হয়েছে। এমনও রসিকতা ছড়িয়ে পড়ছে যে, লোকে বলছে—যাই বাবা, তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি, কাল থেকে আবারও হাড়-ভাঙা বিশ্রামের কাজ চলবে। ঘরবন্দি মানুষের এই বিনোদন-বিপননের মধ্যে কি আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কোনো অংশ নিতে পারতেন? নাকি, তাদের এই বিনোদনে রাখার জন্য কোথায় কোন ওয়ার্ডে চাল দিতে হবে, কোথায় ফুলচাষীরা ফুল বিকোতে পারছে না, বিড়ি বাঁধার লোকগুলো কীভাবে বাড়ি থেকে কাজ করবে, কোথায় মিড-ডে-মিলের চাল দেওয়া হবে, রাজারহাটের করোনা-সেন্টার ‘রেডি’ হল কিনা—এই হাজারো সমস্যায় মমতা যখন তরঙ্গিণী—তখনই প্রভু পুনরায় আবদার করলেন—দিয়া জ্বালাও, মোমবাতি জ্বালাও, টর্চ জ্বালাও।
করোনার রাহু তখন তুঙ্গী। অতএব কেউ মোম জ্বালাল, কেউ বা জ্বালাল না। কিন্তু যারা দিয়ার বদলে শব্দবাজি ফাটাল, তারা কি আশা বুকে নিয়ে উৎসব করল নাকি বিদ্রুপ করল? কে জানে? আসলে সত্যি কথাটা কী জানেন, প্রভু! এইরকম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান স্বয়ং ‘রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠেন। আমার প্রভু রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য দেবীর অকাল-বোধন করেছিলেন বটে, কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে রাবণকে হত্যা করার আগ-পর্যন্ত তিনি আকালিক দীপাবলী করেননি। দীপাবলী হয়েছিল রামচন্দ্রের অযোধ্যায় ফেরার পর। তাই বলছিলাম প্রভু! লগ্ন বলে একটা জিনিস আছে। কবি লিখেছিলেন—‘লগ্ন যদি হয় অনুকূল মৌন-মধুর সাঁঝে।’ আমাদের সমগ্র দেশে গত রবিবারও করোনার ত্রাস এমনই ছিল, যাতে লগ্ন পার্থিব মধুরতায় মৌন হতে পারেনি, সেখানে এই আকালিক দীপাবলী তাই শব্দবাজিতে মুখর হয়ে উঠেছিল। সেদিনও তাই প্রভু! খানিক মৌনতাই মানাত ভাল।
তাছাড়া এই দুর্বল মনে কিছু প্রশ্নও জাগে প্রভু। দেখুন এই হন্তারক সময়ে ‘ডলার’ নামক লক্ষ্মীদেবী এতই চঞ্চলা হলেন যে, এক ধাক্কায় এক ডলারের দাম হয়ে গেল সাতাত্তর টাকা। অথচ পেট্রলের দাম এত কম হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশের পেট্রোলক্ষ্মী কোমড়ে হাত দিয়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আর এই রাষ্ট্রের মহাজনী ব্যবসাটারও বলিহারি—ঠিক এই সময়েই—যখন করোনাতঙ্কে দেশের মানুষের মুখে কোনো প্রতিবাদী ‘রা’ নেই, ঠিক এই সময়েই সুদের হার কমিয়ে দিয়ে আমাদের মতো হাড্ডি বুড়ো, যারা সুদের ওপরেই খায়, সেই বুড়োদের আতঙ্কের ‘ক্ষতে ক্ষার’ নিক্ষেপ করে দিল, প্রভু! তবু কত শুভ সংবাদ আছে আমার জন্য, আমার গাড়ি কেনার সুদ কমেছে, বাড়ি করার সুদও কমেছে। কিন্তু প্রভু! এই সময়ে কে আর বাড়ি-গাড়ি করবে! আমার মতো বুড়োকে তো লোন্ও দেবে না, তাহলে এগুলির সুদ কমিয়ে আমারো লাভ নেই, অন্যদেরো লাভ নেই। কিন্তু করোনার পথ-নৈঃশব্দ্যের মধ্যে মানুষের সামান্য সঞ্চয়ের পথটুকু এবং আমার অন্নের জোগানী সুদটুকুও এই সময়েই কমিয়ে দিলেন, প্রভু! সমস্ত ‘ভারতীয় জনতা’ সব সময় বলে—আপনার নাকি দয়ার শরীর, তা এই করোনার সময় আমার অন্ন-ব্যঞ্জন কমিয়ে দেবার সময় আপনার একটু মায়া হল না। আপনার মতো মানুষের কথার ওপরে কথা বলার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাই প্রভু! বরঞ্চ এই সময়টায় আমাদের এই অনন্ত বৈরাগ্যময় বিশাল বিশ্রামের মধ্যে যে মানুষটি অস্থির হয়ে আছেন এই পশ্চিমবঙ্গে, আমাকে সেই মমতাময়ী অস্থিরতার সঙ্গে অস্থির হয়ে ওঠার আদেশ দিন, প্রভু! তারপরে সময় আসবে—‘দেব তোমায় শান্ত সুরের সান্ত্বনা।’ এই মমতাই দেবেন সেটা।