শুক্রবার সন্ধ্যায় বালেশ্বরের বহানাগা বাজার স্টেশনের কাছে করমণ্ডল এক্সপ্রেস, একটি মালগাড়ি ও যশবন্তপুর এক্সপ্রেস — এই তিনটি ট্রেনের ভয়াবহ দুর্ঘটনার অনিবার্য পরিণতি প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু ও ১২০০ জন আহত। এঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনার পরে রেলের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় দুর্ঘটনাস্থলে সিগনালের সঙ্গে লাইনের পয়েন্টের কোনো মিল ছিল না। স্পষ্ট কথায় সবুজ সিগনাল থাকলেও লুপ লাইনের দিকে পয়েন্ট খোলা ছিল। মেইন লাইন ধরে ছুটছিল করমণ্ডল এক্সপ্রেস, তার আগে আগে একই লাইন ধরে এগোচ্ছিল মালগাড়ি। করমণ্ডলের রাস্তা ছেড়ে দিতে লুপ লাইনের দিকে পয়েন্টের মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এতে মালগাড়ি মেইন লাইন থেকে লুপ লাইনে ঢুকে যায় আর খালি হয়ে যায় মেইন লাইন। মেইন লাইন দিয়ে যাতে করমণ্ডল যেতে পারে তার জন্য পয়েন্টের লুপ লাইন বন্ধ হয়ে মেইন লাইন খুলে যাবার কথা সেই সঙ্গে সিগনালও সবুজ হবার কথা।কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কি হল? সিগনাল সবুজ হলেও পয়েন্টের মুখ খোলেনি। খোলা ছিল মেইন লাইনের পরিবর্তে লুপ লাইনের দিকে। ফলে করমণ্ডল লুপ লাইনে হুড়মুড় করে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়ির পেছনে বিপুল জোড়ে মারলো ধাক্কা। এই গণ্ডগোল বাধালো কে? স্বয়ংক্রিয় সিগনালিং ব্যবস্থা? রেল সূত্রে তেমনটাই জানা যাচ্ছে।
বালেশ্বরের এই দুর্ঘটনার চার মাস আগে কর্নাটকের মাইসোরে এমনই এক দুর্ঘটনার হাত থেকে কোনোমতে রেহাই পেয়েছিল রেল। তার পরেই দক্ষিণ-পশ্চিম রেলের চিফ অপারেশন ম্যানেজার মাইশোর ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজারকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, সিগনালিং ব্যবস্থার নিয়মিত নজরদারি, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নতি না করলে দুর্ঘটনা যে কোনো দিন ঘটবে। কিন্তু এই ধরনের সতর্কতাকে কি রেল শীর্ষ কর্তারা গুরুত্ব দেন? যাত্রী নিরাপত্তাকে তাঁরা আমলই দেন না। বরং যাত্রীদের জীবন তাঁরা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন। তাই মাইশোর রেহাই পেলেও বালেশ্বর রক্ষা পায়নি। ক্যাগ রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ সালের মধ্যে যে ২০১৭টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৬৯ শতাংশই লাইনচ্যুতির ফলে। আর ১১২৯টি দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট জানাচ্ছে লাইনচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ ভুল পয়েন্ট এবং সিগনালিং ব্যবস্থার ত্রুটি। প্রশ্ন, এইসব রিপোর্ট কি মোদী সরকার ও তার রেল মন্ত্রককে কোনোভাবে প্রভাবিত করে বা তাঁদের কাছে কোনও গুরুত্ব পায়? বিগত কয়েক বছরে রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা যদিও বা সামান্য কমেছে কিন্তু শেষ মুহূর্তে দুর্ঘটনা এড়ানোর ঘটনা বেড়েছে। ক্যাগের এই রিপোর্ট জানিয়ে দেয় যাত্রীদের জীবনের অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। পুরনো ঝরঝরে লাইন সংস্কার না করেই চলছে আরও জোর গতির ট্রেন।
বালেশ্বরের দুর্ঘটনায় রেলের বিভাগীয় তদন্ত, জিআরপি’র তদন্ত, সর্বোপরি রেল নিরাপত্তা কমিশনের তদন্ত শুরু হয়েছিল, তাদের তদন্তে সিগনালিং ব্যবস্থার ত্রুটির কথাই উঠে আসছিল কিন্তু সেই তদন্ত শেষ হবার মুখেই আচমকা সিবিআইকে নামিয়ে দেওয়া হল। এদিকে রেলমন্ত্রী সকাল বেলায় জানালেন দুর্ঘটনার কারণ জানা গিয়েছে এবং এর জন্য যারা দায়ী তাদেরও চিহ্নিত করা গেছে। কিন্তু রেল নিরাপত্তা কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ার আগেই নামিয়ে দেওয়া হল ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করা এজেন্সি সিবিআইকে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে রেলের উন্নত মানের প্রযুক্তির অভ্যন্তরীণ জটিলতার রহস্য ভেদ করা এবং সেই প্রযুক্তিগত ত্রুটি বিচ্যুতির অনুসন্ধান করা কি সিবিআই-এর কাজ? ওই সংস্থায় বিশেষঙ্গ প্রযুক্তিবিদ কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ কতজন আছেন? তাদের এই অনধিকার চর্চায় সব মহলই বিষ্ময়ে হতবাক। প্রশ্ন উঠেছে তবে কি কেন্দ্রের সরকার রেলের আসল সত্য ধামাচাপা দিয়ে সমস্যার মূল থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই সিবিআই-কে নামিয়ে দিয়েছে?
প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা, ২০১৮-১৯ সালে রেললাইন সংস্কার, নতুন লাইন বসানোর জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল ৯,৬০৭ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ সালে সেই বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ৭,৪১৭ কোটি টাকা। সিবিআই কি তদন্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল কেন ২৩শতাংশ ছাঁটাই করা হয়েছে, সুরক্ষা তহবিলের বরাদ্দ কেন ৭৯শতাংশ কমানো হয়েছে, এর উত্তর খুঁজে পাবে? ইস্ট কোস্ট রেলওয়েতে সুরক্ষার লক্ষ্যে লাইন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কেন হয়নি, রেলে দীর্ঘদিন ধরে কেন ৩ লক্ষাধিক পদ শূন্য পড়ে আছে? কেন ট্রেন চালকদেরই বিশ্রাম ছাড়াই কাজ করে যেতে হবে — এই সব প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া সিবিআই-এর পক্ষে অসম্ভব। কারণ রেল সুরক্ষা, সিগনাল ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতির প্রযুক্তি সম্পর্কে সিবিআই-এর কোনো ধারণা নেই। তাই বালেশ্বরে দুর্ঘটনার পর এতগুলি দিন পেরিয়ে গেলেও, প্রায় ৩০০ জন যাত্রীর মৃত্যু হলেও কেন্দ্র সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা বা দায়িত্বের চিহ্ন মাত্র লক্ষ্য করা যায়নি। বরং তাঁরা নিজেদের গাফিলতি আর ব্যার্থতা আড়াল করতে জনমানসে নানা ধরণের তত্ত্ব ঢুকিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন! আর ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করা এজেন্সি যারা নিজেদের কাজেই আজ পর্যন্ত ১০ শতাংশ সফলতার দৃষ্টান্ত রাখতে পারেনি তারা রাজনৈতিক বাধ্যতার জন্যই রেল দুর্ঘটনার আসল কারণের মধ্যে ঢুকতে পারবে না।