বর্তমান প্রবন্ধ লেখক মোটেই আলিগড় আঙ্গিকের ইতিহাস আঙ্গিকের অনুগামী নয়। কিন্তু আলিগড় আঙ্গিকের ব্যতিক্রমীদের মধ্যে নুরুল হাসান তাঁর আরাধ্য। জন্মশতবর্ষে লেখাটি তাঁর জন্মশতবর্ষে একলব্য শিষ্য হিসেবে তৈরি করলাম পেজফোরনিউজের জন্যে। আশাকরি লেখাটি পাঠকদের পছন্দ হবে।
ভারতীয় ইতিহাসবিদ্যাচর্চায় সৈয়দ নুরুল হাসান অসামান্য এক উজ্জ্বল নাম। সার্বিকভাবে মধ্যযুগ, বিশেষভাবে মুঘল আমলের ইতিহাসর্চাকে তিনি এবং তার কর্মক্ষেত্র আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির অন্যান্য উজ্জ্বল সদস্য ইরফান হাবিব, এম আতহার আলি ইত্যাদিরা এক নতুন খাতে বইয়ে দিয়েছিলেন। মুঘল আমল পতনের ইতিহাসচর্চায় তিনি মূলত জমিদারিগুলির প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। হয়ত তিনি যে পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, সেই পশ্চাদপট তাঁর আগামী দিনের পড়াশোনার দিক নির্ণয়ে সাহায্য করেছে।
সৈয়দ নুরুল হাসানের জন্ম উত্তরপ্রদেশের লখনউ শহরের এক অভিজাত তালুকদারি বা মদদইমাশ [মুঘল আমলের খাজনা না দেওয়া জমির সত্ত্ব ভোগী জমিদারি] জমিদার পরিবারে। বাবা সৈয়দ আবদুল হাসান, মা নূর ফতিমা বেগম। বাবা ছিলেন জেলা সেটলমেন্ট অফিসার, পরে ইউনাইটেড প্রভিন্সের কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের সভাপতি। মাতামহ স্যার সৈয়দ ওয়াজির হাসান, অযোধ্যা আদালতের প্রধান বিচারপতি, মুসলিম লিগের সভাপতি, জনপ্রিয় নেতাও ছিলেন। তিনি ১৯৩৬-এ হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। দুজন মামার মধ্যে একজন প্রখ্যাত মার্কসবাদী চিন্তানায়ক সৈয়দ সাজ্জাদ জাহির এবং অন্যজন মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আলি জাহির। পারিবারিক আভিজাত্য হয়ত তাঁর চলার পথ তৈরি করে দেয়। পড়াশোনা শুরু লক্ষ্ণৌ থেকে কলকাতা থেকে এলাহাবাদ হয়ে অক্সফোর্ডে শেষ হয়। অক্সফোর্ডের ইন্ডিয়ান মজলিসের সভাপতিও হন। তিনি লন্ডনের অক্সফোর্ডে বেশি দিন পড়ান নি, দেশের ডাকে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। ১৯৬৯ থেকে রাজ্যসভার সদস্য এবং ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রিয় সরকারের শিক্ষা, সমাজ কল্যাণ এবং সংস্কৃতি দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বের রাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন। এখানেই তিনি দেহত্যাগ করেন।

তিনি সারা জীবন শুধু শুকনো ইতিহাসচর্চা করেন নি, কেন্দ্রিয় সরকারে মন্ত্রীত্ব করার সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অসামান্য সঙ্গঠক হিসেবে তিনি বেশকিছু জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র তৈরি করেন এবং বেশ কিছু সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। তিনি ভারতীয় ইতিহাস সংসদএর(আইসিএইচআর) প্রতিষ্ঠাতা। ভারতীয় সমাজ বিজ্ঞান গবেষণা পর্ষদ (আইসিএসএসআর) যে ২৭টা জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা করবে, সেই ভাবনাটার অন্যতম অংশীদার তিনি ছিলেন। কেন্দ্রিয় সরকারে মন্ত্রী থাকাকালীন, উত্তর প্রদেশের বিখ্যাত রামপুর রাজা লাইব্রেরির ব্যয়ভার কেন্দ্রিয় সরকার গ্রহণ করে। কলকাতার মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজএর প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
তাঁর ব্যতিক্রমী ইতিহাসচর্চা বিষয়ে একটা উদাহরণ উল্লেখ করি। উপনিবেশিক ইতিহাসে নুরজাহানকে ভ্যাম্প দেখানো হয়েছে। নুরজাহানকেঘিরে জাহাঙ্গিরের রাজত্বে একটা রাজনৈতিক চক্র সক্রিয় ছিল, সৈয়দ নুরুল হাসান এই তত্ত্বের স্পষ্ট বিরোধিতা করেন এবং নুরজাহানের কপালে যে কলঙ্কের টিকা লাগানো হয়েছিল সেটিকে অপনোদন করেন।
এই তত্ত্বের প্রবক্তা বেণী প্রসাদ হিস্ট্রি অব জাহাঙ্গিরে ব্রিটিশ দূত টমাস রো’র তথ্য অবলম্বন করে নূর জাহানের নেতৃত্বে শাহজাহানের রাজদরবারে পারিবারিক ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরির তত্ত্ব আনেন। সাম্রাজ্ঞী নুরজাহান, তাঁর বাবা দেওয়ান ইতিমদৌলা গিয়াস বেগ, ভাই উজির আসফ খান এবং শাহজাদা খুরম মিলে খুবই শক্তিশালী পারিবারিক জোট তৈরি করে দরবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। একেই বেণী প্রসাদ জুন্টা আখ্যা দিচ্ছেন। এরা মহবত খানের মত প্রবীন অভিজাতর উত্থান রুখে দেন, এদের অঙ্গুলি হেলনে খানইআজম গ্রেফতার হন, খুরমের উত্থান ঘটে, পারভেজের পতন ঘটে, খসরুর ভাগ্য ওঠানামা করে। বেণী প্রসাদের মতে ১৬১৬ থেকে নূর জাহান এবং জাহাঙ্গিরের সম্পর্ক বিষিয়ে যেতে থাকে। মুতামদ খান পাদশাকে এই বিষয়ে অভিযোগ করতে থাকেন। নুরজাহানের দলের অভিজাতরা গুরুত্বপূর্ণ জায়গির দখল করে নেন। যদিও ইকবালনামাইজাহাঙ্গিরি আহবলইশাহজাদাগি শাহজাহান পাদশা নামক দুটি সূত্র নূরজাহানের ক্ষমতা কেন্দ্রিকতার বিরোধিতা করেছে কিন্তু কামগর হুসেনের মাসিরইজাহাঙ্গিরিতে একই অভিযোগ করা হয়েছে। বেণী প্রসাদ বহু তথ্য তার বক্তব্যের সপক্ষে উপস্থিত করে বলেন জুন্টার পতন ঘটে ইতিমদৌলার মৃত্যু আর শাহজাহানের বিদ্রোহে।
THE THEORY OF THE NUR JAHAN ‘JUNTA’—A CRITICAL EXAMINATION প্রবন্ধে নুর জাহানের সময় তার পরিবারের নেতৃত্বে জাহাঙ্গিরের দরবারে একটা শক্তিশালী লবি তৈরি হয়েছিল, এবং তারা জাহাঙ্গিরেরে বকলমে দরবার নিয়ন্ত্রণ করত — এই তত্ত্বের স্পষ্ট বিরোধিতা করেন নুরুল হাসান। খুব ইন্টারেস্টিং তত্ত্ব দিচ্ছেন অসামান্য ঐতিহাসিক নুরুল হাসান। তাঁর বক্তব্য শাহজাহানের রাজত্বে ইতিহাস লেখার দায়িত্বে থাকা ঐতিহাসিকদের শাহী বয়ান তৈরিতে দুটো সমস্যা হচ্ছিল। শাহজাহানের বিদ্রোহকে সমর্থন করার অর্থ হল (যে বিদ্রোহ নিয়ে আওরঙ্গজেব ১৬৫৮-য় আদাবইআলমগিরিতে বাবাকে বিদ্রুপ করেছেন) তারা রাজদ্রোহের মত এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক তত্ত্বকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন; আর বিদ্রোহকে নিন্দা করার অর্থ হল বর্তমানের সিংহাসনে আসীন সম্রাটের মহত্বকে অপমান করা; তাই শাহজাহানের সময়ের ঐতিহাসিকেরা মধ্যপন্থ বেছে নিয়ে জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে শাহজাহানের ক্ষোভের সূত্র ‘স্বার্থী’ নুর জাহানের ঘাড়ে চাপালেন। সাপও মরল লাঠিও ভাঙল না। নুরজাহান ভ্যাম্প হলেন। এই তত্ত্বই অনুসরণ করেছেন বেণী প্রসাদ। সেই তত্ত্ব নুরুল হাসান স্পষ্টভাবে খারিজ করলেন। সারাজীবন রাজনৈতিক গুরুদায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এরকম বেশ কিছু চলতি জনপ্রিয় ইতিহাসকে মিতগ্যে প্রমান করেছেন।
আমার জীবনে যে কজন ঐতিহাসিকের কাজ প্রভাব ফেলেছে, তাঁদের মধ্যে সৈয়দ নুরুল হাসান অন্যতম প্রধান। তাঁর গল্প শেষ করব দুটি আকর্ষণীয় এনেকডোট দিয়ে। গপ্প দুটি আমার দুই বন্ধুর মুখে শোনা। এই গল্পে বহুরঙ্গিন মানুষ ব্যক্তি সৈয়দ নুরুল হাসানকে খুঁজে পাই যিনি মুঘল জমিদারি আভিজাত্য, অসামান্য পাণ্ডিত্য এবং অসীম রাসজনৈতিক বৈদগ্ধের বৃত্তের বাইরে সাধারণ মানুষ হিসেবে উপস্থিত হন।
ঐতিহাসিক সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম, আজকের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সুব্রহ্মণ্যমের বাবা সামরিক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ কে সুব্রহ্মণ্যম ঐতিহাসিক নুরুল হাসান বন্ধু ছিলেন। কারন দুজনেই একদা কূটনীতিক ছিলেন।

নুরুল হাসান যখন বাংলার রাজ্যপাল, সে সময় কে সুব্রহ্মণ্যম কোনও এক কাজে কলকাতায় রাজ্যপালের কাছে এসেছিলেন। রাত খাবারের আগে সুব্রহ্মণ্যম দেখলেন ধর্মপ্রাণ রাজ্যপাল বন্ধুর সম্মানে সাজিয়েগুজিয়ে মদ্যপানের আসর বসিয়েছেন। অবাক সুব্রহ্মণ্যম জিজ্ঞেস করলেন আপনি ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়ে মদ্য পান করেন?
নুরুল হাসান বললেন তিনি রাজভবনের ব্রিটিশ আমলের কাট গ্লাসগুলো তো পছন্দ করেনই; তাছাড়া তিনি বহুকাল থেকেই উত্তম স্কচের সমঝদার। বন্ধুকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, মহান নবির সময় আরবে খেজুর থেকে মদ্য তৈরি হত। নবি খেজুরের ব্যবসা এবং জনগণের জন্যে খেজুর সরবরাহ ঠিক রাখার জন্যে খেজুরের মদ্য তৈরি নিষিদ্ধ করেন।
অবাক সুব্রহ্মণ্যমকে আরও অবাক করে বললেন আমি ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আমি নবির নির্দেশমত খেজুরের মদ্য পান করি না। কিন্তু তিনি হুইস্কিতে কোনও নিষেধ জারি করেন নি। আমি বিনা বাধায় হুইস্কি পান করি।
নুরুল হাসান সম্বন্ধে দ্বিতীয় গল্পটি লেখককে বয়ান করেছিলেন বন্ধু নৃতাত্ত্বিক ইন্দ্রনীল বিশ্বাস। তাঁর রাজ্যপালের সময়ের ঘটনা। ইন্দ্রদা বলছেন “বড়দা রাজভবনে D&P-র দপ্তরে করণিক। কলেজ পালিয়ে এসপ্লানেডে এলেই বড়দার অফিস আর ডেকার্স লেনে মুরগীর স্যুপসহ পাউরুটি অবারিত। একবার দাদার টাইপরাইটারের পিছনে একটা ঢাউস চেয়ার দেখে কৌতুহলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এটা কার। দাদা জানিয়েছিলেন রাজভবনের প্রতিটি সরকারি দপ্তরে রাজ্যপাল প্রটোকল ভেঙে আড্ডা মারতে আসতেন, এই চেয়ার তাঁর জন্য। একবার নুরুল হাসান ভয়ংকর অসুস্থ হওয়ার পর দাদার কাছে গেলাম। দাদা বললেন তিনি সুস্থ হয়ে পুনরায় আড্ডা মারতে রাজভবনের সরকারি দপ্তরে হাজির। সেখানকার কর্মীবৃন্দ হাই প্রোফাইল রাজ্যপালকে তাঁর শরীর কেমন আছে জানতে চাইলে বলতেন ‘দ্যাখো বাপু, আমি ইতিহাস পড়েছি আর তোমরাও সময় পেলে ইতিহাস পোড়ো। ডাক্তারকে বলেছি তোমাকে সরকার টাকা দিচ্ছে আমার চিকিৎসা করার, আমার খাওয়ার উপর নিষেধ আরোপ করার জন্য নয়। আমি প্রতিদিন মোঘলাই বিরিয়ানি খাবো তুমি তোমার চিকিৎসাশাস্ত্র বুঝে নাও’।
শতবর্ষে এই প্রবন্ধে ব্যতিক্রমী মানুষটাকে প্রাণাম জানালাম গঙ্গা জলে গঙ্গাপুজা করে।