হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।
মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ছিলেন চৈতন্যদেব। প্রজ্ঞায়, মনীষায়, পৌরুষে ও দৃঢ়তায় প্রখর সূর্যের ন্যায় ভাস্বর ছিলেন তিনি। চৈতন্যদেবের গভীর দূরদৃষ্টি, আত্মিক চেতনার অপরিসীম গভীরতা এবং মনুষ্যত্বের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সকলের হৃদয়ে সিংহাসনে। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম গণ-আন্দোলনে অবিসংবাদিক সংগঠক, জাতপাতের কঠোর নিয়ম নিগড়ে বাঁধা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধবাদী নেতা এবং সর্বধর্ম সমন্বয়বাদে বিশ্বাসী আচন্ডালে প্রেম বিতরণকারী ভক্তি ধর্মের প্রচারক।
নবদ্বীপের এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে চৈতন্যদেব বা নিমাইচন্দ্র। পিতা জগন্নাথ মিশ্রের আদি নিবাস ছিল শ্রীহট্ট। যদিও চৈতন্যমঙ্গলে জয়ানন্দ বলেছেন, চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষদের বাস ছিলো উড়িষ্যার জাজপুরে। রাজা ভ্রমণের ভয়ে তারা উড়িষ্যা ত্যাগ করেছিলেন। নবদ্বীপ তথা গোটা বাংলায় তখন পন্ডিত হিসেবে বিশাল নাম ডাকছিল নিমাই চন্দ্র মিশ্রের।
এর মধ্যেই পিতৃ বিয়োগ হয় তাঁর। শচীমাতার অনুমতি নিয়ে মেসো চন্দ্রশেখরের সঙ্গে গয়ায় পিণ্ড দিতে যান নিমাই। গয়ায় পিতার পিণ্ডদান করতে গিয়ে পিতা ও প্রথম স্ত্রীর বিয়োগ কাতর নিমাই তাঁর মন্ত্রদাতাগুরু পরম কৃষ্ণ সাধক ঈশ্বরপুরীর সাক্ষাৎ পান। চৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাতের পরপরই ঈশ্বরপুরীকে সম্বোধন করলেন,
“আপনার পাদপদ্ম দেখে আমার গয়া যাত্রা সফল হল। যদি কেউ এই পবিত্র স্থানে পিন্ড নিবেদন করে, তবে তার পিতৃপুরুষের মুক্তি হয়। কিন্তু শুধু আপনার দর্শনে কোটি কোটি পিতৃপুরুষের মুক্তি হয়। তাই আপনার উপস্থিতি এই পবিত্র তীর্থের চেয়েও অধিকতর মঙ্গলজনক। সমস্ত পবিত্র তীর্থই আপনার পাদ পদ্মের ধূলি প্রার্থনা করে। অতএব, হে পুরীপাদ, আমি আপনার পাদপদ্মে আমাকে জড় অস্তিত্বের সমুদ্রের ওপারে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রার্থনা করি যাতে আমি কৃষ্ণের চরণকমলের অমৃত পান করতে পারি।” — (চৈতন্য ভাগবৎ আদি ১/১৭/৪৯-৫৫)
শ্রীল ঈশ্বরপুরী উত্তর দিলেন,
“দয়া করে শোনো, আমি বুঝতে পেরেছি যে তুমি পরমেশ্বর ভগবানের অবতার। আজ সকালে আমি একটি খুব শুভ স্বপ্ন দেখেছি এবং এখন তা বাস্তবে রূপ পেয়েছে। প্রথম যেদিন আমি তোমাকে নবদ্বীপে দেখি, আমি সর্বদা তোমার কথা ভাবতে থাকি। তোমাকে দেখে আমি তেমনই আনন্দ পাই, কৃষ্ণকে দেখে যতটা আনন্দ পাই।”
একথা শুনে মহাপ্রভু মাথা নিচু করে হেসে উত্তর দিলেন,”এটা আমার বড় সৌভাগ্য।”
ঈশ্বরপুরীর কাছ থেকেই তিনি শ্রীশ্রীগোপাল অষ্টাদশাক্ষর মহামন্ত্রেরাজে দীক্ষিত হন। গয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়, মহাপ্রভু তাঁর গুরুর জন্মস্থান কুমারহট্টের পথে এসেছিলেন এবং সেখানে আনন্দে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে শুরু করেন, তাঁর চোখের জলে মাটি ভিজে যায়। অবশেষে তিনি সেই পবিত্র স্থান থেকে কিছু ধূলিকণা সংগ্রহ করে তার উপরের বস্ত্রের কোণে বেঁধে বললেন, “এই ধুলো আমার কাছে আমার জীবনের মতোই প্রিয়।” তারপর তিনি নবদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

কাটোয়ায় মধু নাপিতের বাড়ি এখন চৈতন্য মন্দির
নবদ্বীপে ফিরলেন এক নতুন নিমাই হয়ে। সারাক্ষণ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ করেন। আছাড়ি-পাছাড়ি খান। ঘেমে নেয়ে যান। মুর্চ্ছা যান। মাটিতে পড়ে যান। আবারও উঠে দাঁড়ান। পাগলের পাগলের মত কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলেন।
নিমাইকে তখন একমাত্র সামলাতে পারতেন শ্রীগদাধর। উদ্বিগ্ন শচীমাতা কাঁদতে কাঁদতে গদাধরকে বললেন —
আই বলে, বাপ তুমি সর্বদা থাকিবা।
ছাড়িয়া উহার সঙ্গ কোথাও না যাইবা।।
নিমাই এভাবে নবদ্বীপ লীলা সাঙ্গ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে মনস্থির করেন। আকাশ ভেঙ্গে পড়ল শচীমাতা ও বিষ্ণুপ্রিয়ার মাথায়। কিন্তু নিমাই অনড়। তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করবেনই। চলে এলেন শ্রীকেশব ভারতীর কাটোয়ার আশ্রমে।
শিবাই নদীর সংগমে অবস্থিত কাটোয়া শহরটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। এর পূর্ব নাম কণ্টকনগর। চৈতন্যোত্তর কাল থেকে কাটোয়া ‘শ্রীধাম’ নামে পরিচিত। তাকে দেখতে গা উজাড় করে লোকজন এলেন। মধু নাপিত অর্থাৎ মধু শীলকে ডাকা হল নিমাইয়ের মস্তক মুন্ডন করতে। মধু সামনে বসে নিমাই। কিন্তু মধু কিছুতেই ক্ষৌরকর্ম করতে পারছেন না। তার হাতই উঠছে নিমাইয়ের মাথায়। কান্নাকাটি করে তিনি আকুল হচ্ছেন। শেষে নিমাইয়ের উপর্যুপরি অনুরোধে ক্ষৌরকর্ম করলেন শ্রীমধু, কাটোয়া শহরের কাশিগঞ্জ পাড়ার বাসিন্দা তিনি।
মাঘ মাসের মকর সংক্রান্তির পূর্নিমা তিথিতে পাকুর গাছের তলায় কাটোয়ার গৌরাঙ্গ সুন্দরের মস্তক মুন্ডন এবং সন্ন্যাস গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কথিত আছে মস্তক মুন্ডনের সময় নিমাইকে স্পর্শ মত এক দিব্য অনুভূতি হয় মধুর। মধু বুঝতে পেরেছিলেন নিমাই পন্ডিত হলেন পরমেশ্বর।এরপর থেকেই সেই মধুনাপিত শ্রী চৈতন্যদেবকে আরাধ্য দেবতা হিসেবে মেনে নেন। মধু নাপিতের বংশে আর কোনদিন কেউ নাপিত পেশায় যুক্ত হননি। তারা এই পেশাকে অভিশপ্ত বলে মনে করেছিলেন। কাশিগঞ্জ পাড়ায় বাড়িতে মহাপ্রভুর সাধন ভজন শুরু করেন। পরে সেই বাড়ি হয়ে ওঠে বাংলার বৈষ্ণব আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান। আজও মধু নাপিতের বাড়ি বঙ্গের অন্যতম বৈষ্ণবতীর্থ। নাট মন্দির, মহন্তদের আবাস গৃহ সহ প্রায় এক একর জায়গা। পশ্চিমে মালিপুকুর, উত্তরে শাহী মসজিদ বা দুর্গর গড় খাতের অংশ। মন্দিরের রয়েছে বীণাপাণি সরস্বতীর মূর্তি, রাধা গোবিন্দজি, রাধাশ্যামজী, উদ্ধারণ দত্তর পূর্ণ মূর্তি এবং ভূমি স্পর্শ মুদ্রায় শ্বেত পাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি উদাহরণ দত্ত পূর্ণমূর্তি। মন্দিরের পাশে সেবায়ীদদের বংশ পরম্পরায় সমাধিক্ষেত্র ও মহাপ্রভুবন চরণচিহ্ন রয়েছে।
এই মন্দিরে বৈষ্ণব সাধকরা সখী সেজে গৌরাঙ্গ সেবা করতেন। তাই এর নাম সখীর আখড়া।সখীর আখড়ার শেষ সখী ছিলেন সত্যবালা দাসী। ১৯৮০ সালে তিনি দেহ রাখেন।সখি আখড়ার দোল কাটোয়ায় বেশ জনপ্রিয় ও বিখ্যাত। প্রয়াত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ধীরেন্দ্রনাথ তা এই দোলের উদ্যোক্তা। অনেকে ধীরেন শ্যাগরা দলও বলে। নিত্য সেবা, পাঠ হয় এই আখড়ায়। কিছুদিন আগে রাধাঅষ্টমীতে এখানে বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
শ্রীচৈতন্য জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কাটোয়াতে কাটালেও সে ভাবে পর্যটকদের কাছে গুরুত্ব পায়নি এই শহর৷ বছরের এক একটা বিশেষ সময় দর্শনার্থীদের আধিক্য চোখে পড়লেও সারা বছর তেমন দর্শনার্থীর ভিড় চোখে পড়ে না কাটোয়া শহরে৷ পঞ্চবৈষ্ণব তীর্থের একটি হলেও অনেকটা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে কণ্টকনগরী৷ পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকলেও প্রচারের আলো না থাকায় অবহেলিত গৌরাঙ্গের সন্ন্যাস দীক্ষাক্ষেত্র৷ তবে প্রচারের আলো পড়লে অদূর ভবিষ্যতে কাটোয়া যে রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে নিজের পৃথক জায়গা করে নিতে পারবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷
তথ্যঋণ :কাটোয়ার ইতিহাস, উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য
সমৃদ্ধ হলাম।খুব উপযুক্ত ও ভাল লেখা।
Dhonyobad ????