| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বুড়িগঙ্গা সংস্কার আন্দোলন : দীপাঞ্জন দে

Reporter
দীপাঞ্জন দে / ৩২৫৯ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০২৩

নদিয়ার চাকদহের বুড়িগঙ্গা হলো গঙ্গা নদীরই পুরনো একটি ধারা। কালের নিরিখে জনবসতীর ক্রমবর্ধমান চাপ, মাত্রাতিরিক্ত দূষণ এবং সংস্কারের অভাব— সব মিলে চাকদহ জনপদের বুড়িগঙ্গা খালের চেহারা নেয়। তারপর একটা সময় জনপদের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সচেতনতার অভাব এই খালকেও মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়। কৃষ্ণনগরের অঞ্জনার ন্যায় বুড়িগঙ্গাও নর্দমার চেহারা নিতে থাকে। চাকদহ জনপদের প্রাণভ্রমরা এভাবেই নিঃশেষ হতে থাকে, আর কেউ তার খোঁজও রাখে না। এমতাবস্থায় বুড়িগঙ্গার আইসিইউ পর্যায় চলাকালেই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কিছু মানুষকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তারা চাকদহের বুড়িগঙ্গার মৃতপায় অবস্থা লক্ষ করেন এবং এর সংস্কারের দাবি তোলেন। সে প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা।

প্রায় ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বুড়িগঙ্গা সংস্কারের দাবি তোলা হচ্ছিল। কিন্তু তাতেও কর্তৃপক্ষের কোনও টনক নড়েনি। ২০২৩ সালে এসে শেষপর্যন্ত বুড়িগঙ্গা সংস্কারের দাবি মান্যতা পায়। বুড়িগঙ্গার বুকে জমে থাকা আবর্জনার পাহাড় পরিষ্কার শুরু হয়। মজে যাওয়া বুড়িগঙ্গার স্তব্ধ জলে দোলা লাগে। ২০২৩ সালের ১২ জুন থেকে সেচ দফতরের তত্ত্বাবধানে বুড়িগঙ্গা সংস্কারের কাজ শুরু হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশেও বুড়িগঙ্গা নামে একটি নদী রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ কি.মি., প্রস্থ গড়ে ৪০০ মিটার এবং গড় গভীরতা ১০ মিটার। সেখানে বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরী নদীর একটি শাখা। পুরনো ঢাকা শহর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল। এটি ফুলবাড়িয়ার কাছে ধলেশ্বরী নদী থেকে বের হয়েছে এবং ভুইরার কাছে গিয়ে ধলেশ্বরীতে পড়েছে। তবে এখানে আমাদের আলোচ্য জলধারা হলো চাকদহের বুড়িগঙ্গা।

নদিয়া জেলার একটি প্রাচীন জনপদ হলো চাকদহ, যা ভাগীরথীর অববাহিকায় অবস্থিত। আর বুড়িগঙ্গা জলধারা হলো চাকদহের প্রাণ। বুড়িগঙ্গার জন্ম রানিনগরের মোহনা থেকে, যেখানে চূর্ণি নদী ভাগীরথীতে এসে মিশেছে। অর্থাৎ কল্যাণী ব্লকের চান্দুরিয়া দুই নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের চিঁড়েরকল এলাকা থেকে বুড়িগঙ্গার যাত্রাপথ শুরু। সেখান থেকে ৮ কিলোমিটার বয়ে গিয়ে বুড়িগঙ্গা চাকদহ ব্লকের চান্দুরিয়া এক নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের মুকুন্দনগরে আবার ভাগীরথীতেই মিশেছে। বুড়িগঙ্গা হলো চাকদহ শহরের একমাত্র নিকাশি মাধ্যম। কিন্তু অর্বাচীন কাল থেকে বুড়িগঙ্গার সংস্কার না হওয়ায় তার গতিপথ রুদ্ধ হয়ে যায় এবং আস্তে আস্তে সে ভরাট হয়ে যায়। সংলগ্ন অঞ্চলের যাবতীয় আবর্জনা বর্জ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী জমতে জমতে একসময় ভাগীরথীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন হয়। এভাবেই বুড়িগঙ্গা— নদী থেকে খাল এবং খাল থেকে নালায় পরিণত হয়। তার বৃহদাংশ কচুরিপানায় ভরে যায়, ক্রমে বুড়িগঙ্গার কলেবর সংকীর্ণ হতে থাকে।

বুড়িগঙ্গা নদী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য অনেক আগেই হারিয়েছে। একদা এই বুড়িগঙ্গার উপর এলাকার বহু মৎস্যজীবী পরিবার নির্ভরশীল ছিল। কত ধরনের যে মাছ পাওয়া যেত, তার সীমা নেই! কত জলজ প্রাণীর আশ্রয় ছিল চাকদহের বুড়িগঙ্গা। স্থানীয় প্রকৃতির শোভাবর্ধনে বুড়িগঙ্গার ভূমিকা ছিল অনেকটাই। আর সেই জলধারাই একবিংশ শতকে নর্দমার রূপ নিল। মলমূত্র, আবর্জনা থেকে শুরু করে মৃত প্রাণীর দেহ— সবকিছুরই ঠাঁই হলো বুড়িগঙ্গায়। একদা এই জনপদের প্রাকৃতিক শোভাবর্ধনকারী জলধারা পরিবেশ দূষণের প্রতীকে পরিণত হলো। বুড়িগঙ্গার তীরে সমৃদ্ধ জনপদ— আনন্দগঞ্জ। সেখানে নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে একসময় নৌ-বাণিজ্যের রমরমা ছিল। জনগণের বিনোদনের জন্য মেলা বসত। গণেশজননীর মেলা এখনও হয়, যা প্রায় তিনশত বছরের পুরনো। এছাড়াও চড়ক মেলা, হাজরা উৎসবের মতো গ্রামীণ মিলনোৎসবের জায়গা এই জনপদ। অন্যদিকে বুড়িগঙ্গা ভরাট করা, তার জমি লুঠ করা, বুড়িগঙ্গার চর জাগা, সেই চর বিক্রি, সেখানে দোকান ঘর নির্মাণ— এই সবকিছুরই সাক্ষী এই জনপদ। বুড়িগঙ্গা নির্ভর চাকদহ জনপদের নিকাশি ব্যবস্থাকে এভাবেই ধীরে ধীরে ধ্বংস করা হয়েছে। এই আমুল পরিবর্তন একদিনে হয়নি। বুড়িগঙ্গার স্বাস্থ্যের প্রতি না প্রশাসক, না এলাকাবাসী— কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ ছিল না। অতিরিক্ত বৃষ্টির জল ধারণ করা তার পক্ষে আর সম্ভব হলো না। পরিণামে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে দু-কুল ছাপিয়ে গেল এবং এলাকা ভাসলো জলে।

বন্যায় চাকদহের বাস্তুহারা মানুষদের সরাসরি এর ভুক্তভোগী হতে হলো।  এবার তাদের ঘুম ভাঙতে শুরু করল। পূর্বে সুনীলচন্দ্র দাস, অজয় নন্দী, বিপুলরঞ্জন সরকার, অভয় বিশ্বাস, নন্দদুলাল বিশ্বাস-এর মতো বেশ কয়েকজন বুড়িগঙ্গার সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। তাঁদেরই অনুসরণ করে পরবর্তীতে চাকদহ জনপদের পরিবেশ সচেতন নির্ভীক কয়েকজন মানুষ ‘চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা’-র ব্যানারে বুড়িগঙ্গা বাঁচানোর লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্থানীয় জনগণ, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ীরাও সমর্থন জানিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু ততদিনে বুড়িগঙ্গার জলধারা প্রায় মজে গিয়েছে। যাইহোক, প্রায় ৪০০ মৎস্যজীবী, ১৫,০০০ ব্যবসায়ীদের সংগঠিত করা সম্ভব হয়। গড়ে ওঠে ‘দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম’, ‘মহিলা মৎস্যজীবী ফোরাম’, ‘চাকদহ ব্যাবসায়ী সমিতি’। লাগাতার সচেতনতামূলক প্রচার কর্মসূচি চালানো হয়। পথপরিক্রমা, সাইকেল মিছিল, পথসভা, সেমিনার, পথনাটিকা, পোস্টারিং প্রভৃতির মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা সংস্কারের কথা ক্রমাগত বলা হয়। জলাভূমি বাঁচানোর এই আন্দোলন সংগঠনে পরিবেশকর্মী বিবর্তন ভট্টাচার্য ও তাঁর সঙ্গীরা বিশেষ ভূমিকা নেন। ১৯৯৪ সালে তাঁরা স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যের বিষয়টি চিন্তা করে চাকদহের জলে আর্সেনিকের মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণের কথা প্রমাণ করার লড়াই করেছিলেন। তখনই চাকদহের পানীয় জলের স্তর যে নিম্নগামী, সে বিষয়টি তাঁরা জানতে পেরেছিলেন। আর রিচার্জিং রিজার্ভার বৃদ্ধি করলে যে জলস্তরের উন্নতি ঘটবে, সেই বিষয়টি সম্পর্কেও অবগত হয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই বুড়িগঙ্গা সংস্কারের দাবি জোরালো ভাবে তোলা হয়। আর একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি এই আন্দোলন তীব্র মাত্রা পায়।

‘চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা’ এবং ‘দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম’- এর বুড়িগঙ্গা, গঙ্গা ও জলাভূমি বাঁচাও আন্দোলনের একটি পর্যায়ে চাকদহের সর্বত্র তারা পোস্টার লাগিয়ে প্রতিবাদ জানান। সেই পোস্টারের বয়ান ছিল এইরূপ— “চাকদহের প্রাণ… ‘বুড়িগঙ্গা’ কবে সংস্কার হবে সরকার জবাব দাও। বুড়িগঙ্গা নিয়ে ৫ বছর যাবৎ যে টালবাহানা চলছে… কৃষক, মৎস্যজীবী ও চাকদহের আপামর মানুষ জবাব চাইছে…”। ‘চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা’-র সদস্যরা ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের কাছেও বুড়িগঙ্গা ও চূর্ণীর সংস্কার নিয়ে তাদের দাবি জানিয়ে আবেদন করেছিলেন— “বুড়িগঙ্গা ও চূর্ণীর সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরী। এর ফলে প্রবল বর্ষায় বন্যার হাত থেকে ও ভাঙন থেকে রেহাই পাবে গঙ্গাপ্রসাদপুর, মুকুন্দনগর, পোড়াডাঙা, ঝাউচর, জকপুর, মশনের মাঠ ও নরেন্দ্রপল্লীর কিয়দংশ। এই নদী দুটি সংস্কার করা হোক।”

আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে চাকদহ পৌরসভা, বিডিও অফিস থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারের সেচদফতর, জলসম্পদ দফতরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে বারংবার যাওয়া হয়, ডেপুটেশন দেওয়া হয়। রাজ্যের মুখ্য সচিবের কাছেও লিখিতভাবে বুড়িগঙ্গা সংস্কারের দাবি পেশ করা হয়। বুড়িগঙ্গা সংস্কারের পক্ষে হাজার মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত দাবিপত্র ২০২২ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও জমা পড়ে। কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া না মেলায় অগত্যা চাঁদা তুলে গ্রামবাসীরা খালের মাটি কাটা শুরু করেন। অবশেষে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়— ‘বুড়িগঙ্গা সংস্কারে সেচ দফতর’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, নদিয়া পাতা, ২৫ এপ্রিল ২০২৩)। অন্যান্য সংবাদপত্রেও খবরটি প্রকাশ পেয়েছিল। যাইহোক, মে মাস থেকে বুড়িগঙ্গার সংস্কার শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে ২০২৩-এর ১২ জুন থেকে খননকার্য শুরু হয়। প্রথম ধাপে রানিনগরের কাঠের সাঁকো থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার কাজ হওয়ার কথা। রাজ্য সেচ দফতর এর জন্য ২৪ লক্ষ ৩৬ হাজার ৭৭৮ টাকা মঞ্জুর করেছে। যদিও অর্থের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। প্রথম ধাপে আপস্ট্রিমের কাজ সফল হলে পরে বাকি অংশে ডাউনস্ট্রিমের কাজ হতে পারে বলে খবর। পাশাপাশি শ্মশানঘাটের ইলেকট্রিক চুল্লী পর্যন্ত এই সংস্কার হবে। ফলে নদীর জোয়ার-ভাঁটা খেলা সম্ভব হবে। আন্দোলনকারীরা ইতিমধ্যে চাকদহ শহরের চারটি ড্রেনকে চিহ্নিত করেছেন, যেগুলি দিয়ে বুড়িগঙ্গায় আবর্জনা ফেলা হত। এগুলি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা। বর্তমানে বুড়িগঙ্গা সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে। সংস্কারের কাজ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই বুড়িগঙ্গায় জোয়ার-ভাটা খেলাও শুরু হয়েছে। এখন মাটি ফেলে বুড়িগঙ্গার পাড় উঁচু করা হচ্ছে, সেখানে হাজার গাছ লাগিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নারকেল, সুপুরি, আম, জামের পাশাপাশি বজ্রনিরোধক গাছ হিসাবে কদমগাছ রোপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বুড়িগঙ্গা সংস্কার শুরু হওয়ায় চাকদহের মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী-সহ আপামর জনগণ সকলে খুবই আশাবাদী। বুড়িগঙ্গার সংস্কার ঠিকমতো হলে মৎস্যজীবীদের অবস্থা ফিরবে, পূর্বের ন্যায় এই জলধারা থেকে নৌকা ভর্তি মাছ পাওয়া যাবে। এলাকার পাটচাষীদের সমস্যারও সুরাহা হবে। তারা বর্ষার দুই মাস বুড়িগঙ্গার জলে পাট পচাতে পারবেন। সর্বোপরি বুড়িগঙ্গার সংস্কার সম্পূর্ণ হলে চাকদহ শহরের নিকাশি সমস্যার সমাধান হবে, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে শহরবাসীর নাকানিচোবানি খেতে হবে না। রাস্তায় জল জমবে না। বুড়িগঙ্গার উপর নির্ভরশীল প্রায় এক থেকে দেড় লক্ষ মানুষের সরাসরি কল্যাণ হবে। তাদের জীবনজীবিকা রক্ষা পাবে। আর্থিক দিক থেকে তারা কিছুটা স্বস্থি পাবে। শ্মশানঘাটে অস্থি বিসর্জন দেওয়া যাবে। প্রবল বৃষ্টি বা জোয়ারের ফলে ভাঙন ও বন্যা রোধ করা যাবে। বলাগড়ের নৌকাশিল্পেরও উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।

বুড়িগঙ্গা, গঙ্গা ও জলাভূমি বাঁচাও আন্দোলন কিন্তু থেমে নেই। সম্প্রতি ‘চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা’ ও ‘দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম’-এর উদ্যোগে ১ মে ২০২৩ চাকদহে বুড়িগঙ্গা ও জলাভূমি বাঁচানোর দাবিতে এক ঐতিহাসিক সাইকেল মিছিল হয়। ঐতিহাসিক বলছি তার কারণ হলো চাকদহ তথা নদিয়া জেলায় মৎস্যজীবীদের নিয়ে পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ের এহেন মিছিল আগে হয়েছে কিনা সন্দেহ। মিছিলে তাদের স্লোগানে ও মৎস্যজীবীদের হাতের প্ল্যাকার্ডে ছিল— ‘চাকদহের প্রাণ বুড়িগঙ্গা বাঁচলে আমরা বাঁচব’, ‘বুড়িগঙ্গা সংস্কার করতে হবে’, ‘জলাভূমি সংস্কার করতে হবে’, ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও জলাভূমি বাঁচাও’, ‘মাছ বাঁচাও মৎস্যজীবী বাঁচাও’, ‘অবিলম্বে বুড়িগঙ্গা থেকে কচুরিপানা অপসারণ করতে হবে’, ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচলে ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে জলস্তর বৃদ্ধি পাবে’, ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচলে বাঁচবে কৃষক, বাঁচবে মৎস্যজীবী ও চাকদহের আপামর মানুষ’ প্রভৃতি। এর পাশাপাশি এদিন চাকদহের সকল জলাভূমির তালিকা বিডিও অফিস ও পৌরসভার সামনে টাঙানোর দাবি তোলা হয়।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক নদীর ভগ্নস্বাস্থ্য পরিবেশের ভারসাম্যের পক্ষে দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে, যেমন— যমুনা, জলঙ্গি, ভৈরব, চূর্ণি, মাথাভাঙা, ইছামতী ইত্যাদি। আর আমাদের রাজ্যের বিলুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় নদীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এর মধ্যে রয়েছে— অলকানন্দা, অঞ্জনা, আদিগঙ্গা, কলিঙ্গ, মরালী, কুশকর্ণী, সুরধুনী, সরস্বতী, বিদ্যাধরী, সূতী, গাঙুড়, বেহুলা, বাঁকা ইত্যাদি। তালিকাটি বেশ বড়। এই তালিকাতে বুড়িগঙ্গাও থাকবে। তবে বুড়িগঙ্গা সংস্কার বিষয়ে সাম্প্রতিক যে সরকারি নির্দেশ কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে, তাতে বুড়িগঙ্গার চরিত্র আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। যদিও কাজ অনেক বাকি— সবেমাত্র প্রথম ধাপের সংস্কারকার্য চলছে। আর দুর্গাপুজোর সময় দ্বিতীয় ধাপের সংস্কারকার্য হতে পারে বলেও অনুমান। আবার এরই মধ্যে বুড়িগঙ্গার সংস্কারকার্যে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টাও করা হয়েছে বলে জানতে পারি। এমন ঘটনা মোটেই অভিপ্রেত নয়। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষের বুড়িগঙ্গা বাঁচানোর এই লড়াইয়কে সমর্থন জানানো উচিত— এগিয়ে আসা উচিত। আর এই সংস্কারকার্য ঠিকমতো হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করাও বিশেষ জরুরী।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বিবর্তন ভট্টাচার্য, চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, সেচ দফতর, পরিবেশ পত্রিকা ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’।

লেখক: আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।

আপনার মতামত লিখুন :

6 responses to “বুড়িগঙ্গা সংস্কার আন্দোলন : দীপাঞ্জন দে”

  1. রতন কুমার নাথ says:

    এক দীর্ঘ আন্দোলন ও তার সাফল্যের ইতিকথার এক সুন্দর উপস্থাপনা। অনুপ্রাণিত করে।

  2. বিবর্তন ভট্টাচার্য says:

    একটি মরে যাওয়া ও হেজে যাওয়া নদীর সামগ্রিক বর্ননা খুব ভালো। শব্দ চয়ন ও লেখাটি শুখ পাঠ্য।তাই ভালো লাগল।

  3. শর্মিষ্ঠা আচার্য্য says:

    তথ্যনিষ্ঠ সুন্দর সুচিন্তিত সুখপাঠ্য এই প্রতিবেদন সমাজবিজ্ঞান আন্দোলন ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে।
    সমাজসেবা আর সাহিত্যর পূজা সব্যসাচী হয়ে চালিয়ে যাও,ভাই।

  4. দীপাঞ্জন দে says:

    অনেক ধন্যবাদ দিদি।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev