রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতাটা একা থাকলে এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে — তীর্থে যাবেন মোক্ষদা, ‘চঞ্চল’ ছেলে রাখাল বায়না ধরেছে, সঙ্গে যাবে সে-ও। মায়ের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, হঠাৎ রেগে ছেলেকে বলেন, ‘চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে।’ হায়! মুখ ফসকে বলে ফেলা এই কথা কটি যেন মৃত্যুদূত হয়ে ফিরে আসে। রাখালকে ছিনিয়ে নেয় নিষ্ঠুর নিয়তি। এই প্রসঙ্গটা মনে এলেই আমার ঠাকুমার কথা মনে পড়ে যায়। ঠাকুমা গত হয়েছেন ৮৬ সাল। আমি তখন তরুন তুর্কী হাসি-মস্করা ছাড়াও কিছুটা জীবন বোধের স্বাদ বুড়ির কাছে থেকে আদায় করে নিয়েছিলাম।
বুড়ির মৃত্যুটাও ভারি অদ্ভুত। সেদিন ছিল জগদ্ধাত্রী পুজো। এর আগে বুড়ি তিন তিনবার মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে যোমরাজকে বিদায় দিয়েছে। শান্তিস্বস্তায়ন, গীতাপাঠ কত কি হলো — যাতে বুড়ি সুষ্ঠভাবে গত হন, ও মা বুড়ি টং টং করে জেগে উঠলো। তারপরেও সেই নড়বড়ে ভাবটা রয়েই গেল। আজ মরবে কাল মরবে, না বুড়ির মরাটা আর কিছুতেই হয় না। বাড়ির বাইরে বেশি দূর যেতেও পারছি না। যদি বুড়ি টেঁসে যায়। সেদিন আমাকে মেদিনীপুর যেতেই হবে। সকালে বেলা ঘুম থেকে উঠে বেরবার আগে ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছো, বললো ভালো আছি, দেখলাম হরলিক্স খাচ্ছে। সাত সকালে মা চায়ের বদলে করে দিয়েছে। বললাম, তুমি তো দেখছি বেশ চনমন চনমন করছো। আমি একটু কলকাতার বাইরে যাব, কাজ আছে। বুড়ি একগাল হেসে বললো, ‘আমি ভালো আছি, তুই যা ঘুরে আয়’। আমি মেদিনীপুর টাউনে গেলাম কাজ সারতে, ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বেজে গেল, পাড়ায় ঢোকার মুখে অনেকেই আমাকে দেখে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে, বাড়ি ঢুকে দেখি বাবা, কাকা ‘কাছা’ পরে আছে। মাকে জিজ্ঞাসা করতে বললো, তুই বেরবার ঘন্টা খানেক পর মারা গেছে।
এই বুড়ি কাম ঠাকুমা ছিল আমার প্রথম বান্ধবী।
গঙ্গা সাগরে যাওয়ার প্রথম ডাক আসে ৭৬ সাল নাগাদ। তখন আমি এনসিসি করি। তার আগে বেশ কয়েকটা এনসিসি ক্যাম্প করা হয়েগেছে। আমাকে স্কুল থেকে নির্বাচন করা হলো। আমরা সব ভলেন্টিয়ার হয়ে যাব। থাকতে হবে ৭ দিন। ‘গঙ্গা সাগর’ যাব শোনা মাত্রই মা সরাসরি নাকচ করে দিল যেখানে খুশি সেখানে যাও, গঙ্গাসাগর যাওয়া হবে না। কেন? কোনও প্রশ্নের উত্তর নেই।
এরপর আমার বড়ো হওয়ার পালা। কলেজে প্রথম বর্ষ, পৌষ মেলা থেকে জয়দেব সব ঘোরা শেষ। আবার গঙ্গা সাগর মেলার ডাক এলো। বন্ধুরা সব যাব। ভাবলাম বড়ো হয়েছি এবার যাওয়ার অনুমতি মিলবে। না এবারও অনুমতি পাওয়া গেল না। একটু তর্কাতর্কি— রাগের চোটে মা বলে বসলো, তোর ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা কর।
তখন ঠাকুমার বয়স ৮১ পেরিয়ে ৮২-র দিকে দৌড়চ্ছে। বুড়ি তখনও বেশ সতেজ। গল্পের ছলে একদিন বলেই বসলো তোর বয়সে এক টুকরি আম বেমালুম খেয়ে নিতাম। মা যোগ করলো, বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে এসে তোর ঠাকুমাকে আমি একটা গোটা কাঁঠাল খেতে দেখেছি। ফোকলা দাঁতে বুড়ির খিল খিল হাসিটা এখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বুড়ি বেশ রসেবসে থাকতো। নাতি-নাতনির সঙ্গে তার কেমেস্ট্রিটা দারুন। আমার প্রথম বান্ধবী।
একদিন গল্পের ছলে জিজ্ঞাসা করলাম কেশটা কি বলো।
হেসে বললো, কোনটা?
গঙ্গা সাগর—
তোকে শুনতে হবে না যা। তাহলে আমার যাওয়াটায় ঘুটি বসালে কেন?
শুনতে হবে না।
অনেকক্ষণ কসরৎ করার পর মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়েগেল চোখটা কেমন ছলছল করে উঠলো।
বুঝলাম কেশ গড়বড়।
জড়িয়ে ধরে বললাম, কি গো তোমায় কি আঘাত দিলাম?
না।
তাহলে!
মানত করেছিলাম, সেটা আর দেওয়া হয় নি।
তারমানে!
তোর বড়ো পিসি জম্মাবার আগে তিনটে সন্তান মরে গেল।
দাঁড়াও দাঁড়াও —
বিয়ে তো হয়েছিল বারো বছর বয়সে। প্রথম ছেলেটা হয় ১৪ বছরে। মরে গেল। দ্বিতীয় আর তৃতীয়টাও মেয়ে হল। সে দুটোও মরে গেল।
তখন তোমার বয়স?
১৬/১৭ হবে। (মনে মনে দাদুকে গালি দিলাম শালা কখনও খালি…)
তারপর।
তখন তোর দাদু বাগবাজারের রাজবল্লভ পাড়া থেকে মলঙ্গা লেনে উঠে এল। সেটা পৌষমাস, এই সংক্রন্তির আশেপাশে হবে। এক সাধু ভরদুপুরে হাজির। বাড়ির অন্য মেয়েদের সঙ্গে আমিও গেলাম সাধুবাবার কাছে। তা সাধুবাবা সব শুনে গঙ্গা সাগরে মানত করতে বললো, তা সাধুবাবার কথায় একদিন বাবুঘাটে স্নান করতে গিয়ে মানত করলুম। এবার সন্তান হলে তোমার কোলে দিয়ে আসবো। তারপর তোর বড়ো পিসি হলো—
ব্যাশ আর যাও নি।
না।
কেন!
ঠাকুমার চোখটা ছল ছল করে উঠলো। দেওয়া যায় —
জীবনে কোনও দিন গঙ্গাসাগর গেছ?
মাথা দোলাল, যায় নি।
দাদু?
না।
তোমার আর সন্তানরা।
কাউকে যেতে দিই নি।
সেই জন্য মা বারন করেছিল?
ঠাকুমা মাথা দোলাল।
আমি যাব।
যাস নি।
কেন?
না গেলে কি হবে?
ঠাকুমার চোখটা ছলছল করে উঠলো।
ঠাকুমা গত হয়েছে ৮৬ সালে। ৯০ সাল নাগাদ যাকে গঙ্গায় ভাসাবার জন্য ঠাকুমা মানত করেছিল, সেই বড়ো পিসি তার জামাইয়ের হাত ধরে গঙ্গা সাগর ঘুরে এলো ড্যাং ড্যাং করে।
মা-কে বললাম, কি গো বড়ো পিসি যে ঘুরে এলো —
তবু মায়ের ছাড়পত্র মিললো না।
আমার বাবা গত হলেন ২০১৬ সাল। তিনি হিল্লিদিল্লি অনেক জায়গায় ঘুরলেও কোনও দিন গঙ্গা সাগর-এর দিকে পা বাড়ান নি— সেই অদৃশ্য নিষেধের হাতছানি। মা ২০১৮ সালে প্রথমে যেতে না চাইলেও তার নাতি-নাতনি, মেয়ে-জামাইরা জোর করে গঙ্গাসাগরে স্নান করিয়ে নিয়ে এলো।
একদিন কথায় কথায় মা-কে বললাম, কি গো এবার কি গঙ্গা সাগরের অনুমতি মিলবে। মা মুচকি হেসেছিল, —যা ঘুরে আয়, এই কথাটা একবারও মন থেকে উচ্চারন করেনি।
কাউকে কিছু না জানিয়ে ২০২০ সালে আমিও চুপিচুপি গঙ্গা সাগরে কপিলমুনির আশ্রম ঘুরে এলাম।
সাগরে ডুব দেওয়া হয় নি।
সুন্দর লেখা। খুব ভালো লাগলো।
স্যার।
আপনার লেখা মানেই অন্য রকমের স্বাদ।
আপনার ❝কাজলদিঘী❞ উপন্যাস যে আমি কত বার পড়েছি তা হিসাব ছাড়া।