নাইরোবির চমকধমক মিলিয়ে যেতে ছোটোশহর, গাঁগঞ্জ, মাংসের দোকান, তেলের ডিপো, ছোটো ক্যাফে, গাড়ি সারানোর দোকান। টম্যাটো আর পিঁয়াজের রঙে রঙিন বাজার। তরমুজ, আলু, গরবিনী টম্যাটোর মাঝে আনারসের উঁকিঝুঁকি। চালক পিটার জানাল টম্যাটোর দাম এখানে ভারতীয় মুদ্রায় আশি টাকা কিলো। এ’কথা শুনে গাড়িতে নানা বিস্ময়সূচক শব্দ। এ শব্দরা ক্রমশঃ বেড়েছে অন্য বিস্ময়ে!
আমরা চলেছি অ্যাম্বোসেলির (Amboseli) দিকে। পথের দু-পাশে দিগন্ত বিস্তৃত ঘাসের জমি। মাঝখানে লাল মাটির আলপথ। দিগন্তরেখায় শঙ্করের চাঁদের পাহাড়ের সীমানা। মাঝে মাঝে হৃষ্টপুষ্ট ক্যাকটাস আর ছাতার আকার ধরা বাবলা গাছে কেনিয়ান বাবুইপাখির ঘরবাড়ি।

গোরু, ভেড়া, ছাগলের পাল চরাচ্ছে কিশোর বা কিশোরী রাখাল, পূর্ণবয়স্ক দীর্ঘদেহী মানুষ। দূরদেশী সেই রাখাল বাঁশি বাজায় কিনা সেকথা আমাদের আর জানা হল না।
রাস্তা পার করল একপাল উট। তারা অভয়ারণ্যের স্বাধীন প্রাণীও নয়, জমকালো রাজস্থানী গোরবন্ধে সাজার সৌভাগ্য তাদের জোটেনি।
তবু তারা ভালো আছে তাই মনে হয়,
পৃথিবীর আশি ভাগ উট এখানে জন্মায়!
অ্যাম্বোসেলির আস্তানায় আমাদের ওয়েলকাম পানীয়র সঙ্গে কারিবু জানাল কিচিরমিচির করা একঝাঁক পাখি। তাদের নাম জানি না। সুর চিনি না। কেউ পুচ্ছটি উচ্চে তুলে নাচায়। কারোর ঝোঁটন দোলে হাওয়ায়। তাদের উজ্জ্বল রঙ উজ্জ্বলতর রোদের আভায়। ডানায় তাদের মুক্তির আনন্দ।

অভয়ারণ্যে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎকার z for zebra-র সঙ্গে। ছোটোবেলার আনন্দ সিগন্যাল টুথপেস্টের মত নিঁখুত আঁকা ডোরাকাটা শরীরে জেব্রারা গোরুর মত এখানে চরে বেড়ায়। হাজারে হাজারে। তারা সবাই গ্রেট মাইগ্রেশনের অংশীদার নয়। এই শান্ত, সামাজিক প্রাণীদের বেশ কিছু অংশ কেনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা। তারা হরিণ, জিরাফ, হাতি, ন্যুয়ের সঙ্গে মিলেমিশে ঘাস খায়। শান্তভাবে রাস্তা পার করে শিখিয়ে দেয় জেব্রা ক্রশিংয়ের নিয়ম। সিংহের খাদ্য হয়ে প্রকৃতির শৃঙ্খলে সমতা আনে।
সোনালি সাভানা ঘাসে ভীরু হরিণের দল দেখে মনে পড়ে, —
“বাতাস ঝাড়িছে ডানা, হীরা ঝরে হরিণের চোখে —
হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর হীরার আলোকে”।

গোটা পৃথিবীতে কত ভীত, সন্ত্রস্ত হরিণ খাদ্যশৃঙ্খলের চক্রব্যুহে শয়ে শয়ে প্রাণ দিচ্ছে প্রতিদিন। অ্যাম্বোসেলির ইম্পালা, টোপি, গ্যাজেল, এল্যান্ডের জীবনেও প্রতি পদক্ষেপে বিপদের হাতছানি।
জিরাফের উচ্চতা দেখে বোধহয় এটিই তাদের সবথেকে বড় ঢাল। তন্বী, দীর্ঘদেহী উটের ছন্দময় চলা যে কোনো সুন্দরীর র্যাম্পওয়াককে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
বাবলা গাছের মগডালের পাতা তাদের নিশ্চিন্তে চেবাতে দেখে লালমোহনবাবুর মত মনে প্রশ্ন জাগে, “এরা কি কাঁটা বেছে খায়?”।
জিরাফের বাবা আবার অন্য কথা বলে।
সে বলে, “খোকা তোর দেহ,
দেখে দেখে মনে মোর ক’মে যায় স্নেহ।
সামনে বিষম উঁচু, পিছনেতে খাটো
এমন দেহটা নিয়ে কি করে যে হাঁটো?
খোকা বলে, “আপনার পানে তুমি চেহো
মাযে কেন ভালোবাসে বোঝে না তা কেহ।’

দীর্ঘদেহ দেখার পর অ্যাম্বোসেলির বৃহৎ পরিবারের বুশহাতিদের সঙ্গে মোলাকাত। এ অভয়ারণ্য তাদের স্বর্গরাজ্য। দলনেতার আদেশ মেনে মস্ত পরিবার সেখানে একসঙ্গে চলাফেরা করে। অতবড় চেহারা, শুঁড়, লম্বা দাঁত আর দলবল নিয়ে তারা অনেকটা নিশ্চিন্ত নির্ভয়। রাতে তৃষ্ণার্ত একলা দাঁতাল মানুষের আস্তানায় জল খেতে এল। চাঁদের আলোয় সে অপূর্ব দৃ্শ্য মনের মধ্যে চিরকালের ছবি হয়ে রইল। রাতচরা পাখিদের গান শুনতে শুনতে, দূর থেকে দেখা বরফের মুকুট পরা চাঁদের পাহাড়ের কথা ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ ঘুম এলো না সে রাতে।
দ্বিতীয় দিন অ্যাম্বোসেলি থেকে নাইভাসা (Naivasha) পৌঁছবার ঠিক আগে মনে হল যেন হিমাচল বা উত্তরাখন্ডের ছোটো গ্রাম বা উপত্যকাকে পেরিয়ে চলেছি। কেনিয়ার এই গ্রেট রিফট ভ্যালির (Great rift valley) সবুজ ঘাসে চরে বেড়াচ্ছে কোনো রঞ্জনার পালন করা ভেড়া। পাহাড়ের ধাপে ছোট ছোট বাড়ি, বেড়ে উঠেছে ভুট্টার গাছ। চারিদিকে মনভোলানো সবুজের সমারোহ।

আমার মত যারা আফ্রিকার ভূগোলটা ভালো করে পড়েনি তারা ভাবতেই পারে এই এত বড় মহাদেশটা শুধুমাত্র বনস্পতির নিবিড় ছায়ায় ঘেরা। সেখানে ভয়ঙ্কর শ্বাপদ যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা তো একেবারেই সেরকম নয়! নাইরোবি থেকে মাসাইমারার আমাদের গোটা যাত্রাপথে পরিবর্তিত হচ্ছে দৃশ্যপট। বদলে যাচ্ছে মাটির রঙ, গাছপালা, মানুষের ভাষা। পাহাড় কখনো কাছে আসছে কখনো বা দূরে চলে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে গুগল অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে যে রিফট ভ্যালির মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি, সেটি পৃথিবীর বৃহত্তম পার্বত্য উপত্যকা। বেশ কয়েকটি দেশ জুড়ে তার বিস্তার। যারা পাখির প্রেমে প্রহর ভোলে, এ তাদের পরানভূমি।

সূর্যাস্তের রাঙা আলোয় নাইভাসা লেকের সঙ্গে আমাদের পরিচয়। তখন, —
“সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে
ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল
সব পাখি ঘরে ফেরে-
সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন
থাকে শুধু অন্ধকার
মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” (ক্রমশ)
????????, চলুক…….
????সঙ্গে থাকবেন।