লম্বা, কালো, ছিপছিপে মানুষগুলো দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে চলেছে। সঙ্গে বড় দলবল, লটবহর। তাদের সে পথ বড় বন্ধুর, বিপদসঙ্কুল। যে কোনো মুহূর্তে অতর্কিতে আক্রমণ করতে পারে বন্য জন্তু। সোনালি ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ক্ষুধার্ত সিংহ, হায়না। গাছের ওপর চিতাবাঘ। নিজেদের রক্ষা করতে হাতে তাদের বর্শা, লাঠিসোঁটা। মুখে অদ্ভুত হুম হুম আওয়াজ। দলের মধ্যে কেউ কেউ আছে বাজনদার। তারা জানোয়ার ভাগাতে ড্রাম পিটেই যাচ্ছে। মহিলা, কোলেকাঁখে বাচ্চা আর একপাল গবাদি পশুকে তারা দলের মাঝখানে সুরক্ষিত রেখে চলেছে সুশৃঙ্খল, সারিবদ্ধভাবে।
গোরু, ছাগল, ভেড়াই এই পশুপালকদের প্রাণ। অবোলা পশুরা চরে বেড়াবে উন্মুক্ত প্রান্তরে। সবুজ ঘাস খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠবে। বংশবৃদ্ধি করবে। কলসি ভরে দুধ দেবে। ভেড়ার লোম থেকে হবে শীতের পোশাক। পশুধনে ধনী হয়ে উঠবে তারা। বিবাহযোগ্য যে পাত্রের যত গাইবাছুর, তাদের তত কদর। সুন্দরী, আইবুড়ো মেয়ের বাবা তাদের হাতছাড়া করতে চায় না। এসবের জন্যেই তো এই দীর্ঘ পথশ্রম। যাযাবরবৃত্তি।

অনেকটা পথ পেরিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে সবাই গাছের তলায় একটু জিরোবার কথা ভাবছে। বিশেষ করে বাচ্চারা আর মহিলারা। দলের সবথেকে লম্বা ছেলেটা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে বলল, “পেয়েছি, দেখতে পেয়েছি। ঐ ছোটো পাহাড়টা টপকাতে পারলেই সবুজ ঘাসের জমি। চলো ওর কাছাকাছি ডেরা বাঁধি আমরা।”
গোটা দল দলপতির মুখের দিকে তাকাল। তিনি সম্মতি দিলেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে সবাই গিয়ে থিতু হল সেখানে। রাতে আগুন জ্বালাল অলিভ আর শিরীষ কাঠের ডাল ঘষে। ছাগল আর ভেড়া কেটে মাংস ঝলসানো হল। সদ্য দোয়া টাটকা দুধ খেয়ে ছেলেপিলেরা মায়ের কোলের কাছটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠেই তাদের অনেক কাজ। মেয়েরা গোবর আর মাটি লেপে বানাতে লাগল তাদের নিজের ঘর। একটি পুরুষের অনেকগুলো করে স্ত্রী। শান্তি বজায় রাখতে সবার পৃথক অন্ন, নিজের ঘরসংসার। পুরুষেরা ঘরগুলিকে গোল করে ঘিরে কাঁটাগাছের বেড়া দিল। গোটামহল্লার মাঝখানে গবাদিপশুদের জন্যে খোঁয়াড় বানাল। সেখানেই সবার চোখের সামনে সুরক্ষিত থাকবে তাদের প্রিয় পশুধন।
অনেকদিন পর আবার তাদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়। দুধ উথলে উঠলো মাটির উনুনে। সন্ধ্যেবেলা মেয়ে পুরুষ সাজল লাল, হলুদ উজ্জ্বল কাপড়ে। গলায়, হাতে, কোমরে পরল রঙিন পুঁতির গয়না। বাজল বাদ্যি। গান গাইল, তালে তালে পা মিলিয়ে কোমর জড়িয়ে নাচল সবাই। অল্প বয়সী ছেলেরা লম্ফঝম্ফ করে তরুণীদের মন জয় করে নিল।

পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে মাসাই উপজাতিরা যুগ যুগ ধরে তাদের পোষ্যপ্রাণীর চারণভূমির খোঁজে এভাবেই যাযাবর জীবন বয়ে নিয়ে চলেছে। সঙ্গে নিয়ে চলেছে তাদের নিজস্ব, আদিম সংস্কৃতি।
নীলনদের নিম্ন অববাহিকার তুর্কানা (Turkana) হ্রদের উত্তরাংশ (কেনিয়ার উত্তর-পশ্চিম দিক)। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময় মাসাইদের পূর্বপুরুষরা উর্বর জমির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে উত্তর কেনিয়ায় এসে হাজির হয়। সপ্তদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকে মাসাইরা আবার স্থানান্তরিত হয়ে, বর্তমানে পূর্ব আফ্রিকার শুষ্ক ও শুদ্ধপ্রায় জলবায়ুতে ১° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৬° দক্ষিণ অক্ষাংশের গ্রেট রিফট (Great Rift) উপত্যকা বরাবর প্রায় ১,৬০,০০০ বর্গ কিমি স্থান জুড়ে অবস্থান করছে। যাযাবর জীবনের নেশা এখনো তারা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

আফ্রিকার গ্রেট মাইগ্রেশন বা গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থের যেন এ আরেক অন্যতম সংযোজন। মাসাই উপজাতি আর মারা নদীর নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে।
প্রতিবছর জুলাই আগস্ট মাসে কাতারে কাতারে ওয়াইল্ড বীস্ট বা গ্ন্যু, জেব্রা, হরিণ পাড়ি দেয় প্রায় আটশ থেকে হাজার কিলোমিটার। আফ্রিকার তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটির অভয়ারণ্য থেকে কেনিয়ার মাসাইমারায়। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। বর্ষার পরে নতুন ঘাস, জল তাদের হাতছানি দেয়। পায়ে পায়ে থাকে বিপদ। মারা নদী পার করার সময় জলে কুমির আর ডাঙায় সিংহ, চিতা, হায়না, বন্য কুকুর। পাথুরে মারা নদী পার করতে গিয়ে তাদের পা ভেঙে যায়। দুর্বল, বুড়ো, অসুস্থ, বাচ্চাদের বেশিরভাগই তারা বাঁচাতে পারে না। জীবনযুদ্ধে জয়ী হয় ফিটেস্টরাই।

গ্ন্যু নামে পরিচিত, ওয়াইল্ডবিস্ট হরিণ পরিবারের সদস্য। আমাদের চেনা জন্তুর তালিকায় তারা পড়ে না। একটি বড়বাক্সের মতো মাথায় তাদের বাঁকা শিং। শরীরের সামনের দিকটা ভারী। পশ্চাৎভাগটি তীক্ষ্ণ পা বিশিষ্ট। গায়ে ধূসর কোটের মত মোটা চামড়া। অসুন্দর মুখে রামছাগলের থেকেও বড় দাড়ি দেখে একে কিছুতেই হরিণের দলে ফেলতে ইচ্ছে করবে না।
আফ্রিকার গ্রেট মাইগ্রেশনের এরাই পুরোধা। গোটা পৃথিবীতে এদের সংখ্যা প্রায় দেড়লাখ। মাসাইমারাতে দূর থেকে এদের সারিবদ্ধ যাত্রা এক অপরূপ সুন্দর ছবি। সোনালি সাভানা ঘাসে এই কালো ঢেউকে বিজ্ঞানীরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন, প্রকৃতির সপ্তম আশ্চর্য।

সমাজবদ্ধ জীব হলেও এদের সমাজের নিয়মকানুন কৌতুহল জাগাবেই। সদ্যোজাতরা মায়ের সঙ্গেই লেপ্টে থাকে। মানুষের মতোই নবজাত শিশু এবং তার মায়ের শরীরে তখন পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজন। মাসাইমারার সাভানাঘাসেই তারা পেয়ে যায় খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম কার্বনেট ইত্যাদি। এই জ্ঞানলাভ হতেই আমাদের সঙ্গী হায়দ্রাবাদের শিশুবিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিত্যার সঙ্গে রসিকতা, “তুমি তোমার রোগীদের এখানে এসে ঘাস খাওয়া প্রেসক্রাইব কর”। সে বেচারি নিজেই হাবভাবে শিশু, আমাদের ঠাট্টায় কতটা মজা পেল কে জানে?
গ্ন্যুয়ের সমাজে ফিরে যাই। তাদের পুরুষশাবকটি একটু বড় হতেই মায়ের ছত্রছায়া ছেড়ে ব্যাচেলারদের দলে ভিড়ে যায়। যুবক গ্ন্যু তারপর সেই দলও একদিন ছাড়ে। সম্পূর্ণ নিজের জগত তৈরি করে তারপর পাত্রী খোঁজার পালা।
এই দলগড়া, জোড়বাঁধা, ভালোবাসা, ঝগড়া, অপত্যস্নেহের গল্প আমরা মাত্র দু’দিন মাসাইমারা সাফারিতে এত সুস্পষ্টভাবে দেখেছি যে বাংলা সিরিয়ালও এর কাছে অত্যন্ত দুর্বল।

মাসাইমারার বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে বলা হয় the land of big five. এরা আফ্রিকার বুশ হাতি, সিংহ, লেপার্ড, গন্ডার এবং কেপ বাফেলো। এরা শুধু ভয়ঙ্করই নয়, অনেকটাই অপ্রতিরোধ্য। তবে অত্যন্ত কাছ থেকে নিরীক্ষণ করা সত্ত্বেও এরা দু-পেয়ে মানুষকে মোটেই গ্রাহ্য করে না।
ঘুমন্ত, তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, প্রেমার্ত সব সিংহকে দেখেই আমরা হতবাক হয়েছি। চিতাকে দেখেছি মধ্যাহ্ন ভোজন সারতে। পাহাড়ে ঘেরা সিংহের ডেরায় দুপুরে ছোটো একাঙ্ক নাটকের স্বাদ পেয়েছি।
সেদিন স্ত্রীপুরুষ বাচ্ছা মিলে গাছের ছায়ায় দিবানিদ্রা দিচ্ছিল সিংহ পরিবারের মোট ছ-জন। একটি তরুণকে ভার দেওয়া হয়েছিল পাথরের গায়ে রাখা শিকার করা অর্ধভুক্ত পশুর মাংসকে পাহারা দিতে। তরুণের চঞ্চলমতি। তার কি আর অত দায়িত্ব নিতে ভালো লাগে? সে যখনি কাজে ফাঁকি দিচ্ছে, তখনি সে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে লোভী শকুনের দল। পাহারায় থাকা সিংহটি ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে গাছতলায় এসে দাদাকে নালিশ জানাতেই দাদা গেল শকুন তাড়াতে। পুরো পরিবার তখনও নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন। আমরাও নাটকের যবনিকা পতন, সিংহের পরাক্রম দেখে মনে মনে হাততালি দিয়ে সরে এলাম।

আমাদের এই বন্যপ্রাণী, সোনালী ঘাস, চাঁদের পাহাড়, ঝকঝকে নীল আকাশের তারাভরা রাত, মাসাই উপজাতি, তাদের হাতের কাজ, তাদের সঙ্গে পা মিলিয়ে নাচ আমাদের সারাজীবনের সম্পদ হয়ে রয়ে রইল। বাড়ি এসে স্যুটকেস খুলতে খুলতে মনে পড়ল, আরো কিছু কথা। সেই কবেকার ইস্কুলের খাতায় ভ্রমণ নিয়ে লেখা রচনা! যা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে উঠেছে।
বেড়ানো মানে রোজকার একঘেয়েমি থেকে এক আকাশ মুক্তি। একাকিত্বের জাল কেটে এক অন্য আমিকে চেনা এবং জানা। সহমর্মিতা, সহনশীলতা এই ভারি ভারি শব্দের অর্থগুলো ঝালিয়ে নিয়ে জীবনে প্রয়োগ করার এক অন্যতম সুযোগের নাম ভ্রমণ।
অসাধারণ একটা লেখা, ধন্যবাদ নন্দিনী, এত ভালো একটা লেখা উপহার দেওয়ার জন্য। আমরা যারা তোমার সঙ্গে কেনিয়ায় ভ্রমণসঙ্গী ছিলাম তারা এই লেখা পড়লে বুঝবেন তুমি কত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছো কেনিয়া ভ্রমণ বৃত্তান্ত।
তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।
লেখার গুনে, মানষচক্ষে পৌঁছে গেলাম মাসাইমারা। খুব সুন্দর।
প্রণাম নেবেন ????