প্রায়ই টিভি সিরিয়াল বা সিনেমাতে অভিশপ্ত মন্দিরের কথা বলা হয়। উত্তরাখণ্ডের চম্পাবত জেলায় হাতিয়া নৌলায় ‘এক হাতিয়া দেবল’ নামের একটি মন্দির রয়েছে যেখানে শিবলিঙ্গের কেউ পুজা করে না। এখানে মানুষ মন্দিরটিকে অভিশপ্ত আখ্যা দিয়ে দেবতাকে পর করে রেখেছে।
বলা হয়, মহাদেব অতি অল্পে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর ভক্তদের মনোবাঞ্ছা খুবই দ্রুত পূর্ন করেন। ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভক্তরা মন্দিরে আসেন শিবের পুজো করতে। অথচ এই মন্দিরে কেউই শিবের পুজো করেন না। মন্দিরের আশ্চর্য্য স্থাপত্যশিল্প দেখে ফিরে যান। কিন্তু কেন? এই নিয়ে দুটি কাহিনী প্রচলিত আছে। প্রথমটি …

এই গ্রামে এক দক্ষ ভাস্কর থাকতেন, যিনি ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথর কেটে মূর্তি, প্রাসাদ, দেবালয় তৈরি করতেন। শক্ত-সামর্থ্য চেহারার শিল্পীর মুগুরের মতো হাত দুটি ছিলো তাঁর প্রাণ। কারণ এই দুটি হাতের জন্য ছিলো তাঁর নাম-যশ। এক দুর্ঘটনায় পাথরের চাঁই পড়ে একটি হাত থেঁতলে যায়। হাতের পচন শুরু হয়। শরীর রক্ষা করতে হাতটি কেটে বাদ দিতে হয়। সাময়িকভাবে মুষড়ে পড়েন শিল্পী। হাতের শোকে আহার-নিদ্রা ত্যাগ করেন। পরে ভাবলেন, একটা হাত নষ্ট হয়েছে বলে শিল্পকলা ছেড়ে দেবেন! আর একটি হাত তো রয়েছে। শিল্পী সিদ্ধান্ত নিলেন এক হাতে তিনি ছেনি-হাতুড়ি ধরবেন এবং প্রয়োজনে পা দুটির সাহায্য নেবেন। শুরু হলো মূর্তি তৈরির কাজ।
শিল্পীর জেদের কাছে ধীরে ধীরে সমস্ত প্রতিকূলতা পরাস্ত হতে লাগলো। কিন্তু সৃষ্টির উদযাপনে বাধা এলো প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। শুরু হলো তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা। শিল্পীকে থামাতে গ্রামবাসীরা দলবদ্ধভাবে তাঁর কাজে অবরোধ সৃষ্টি করলো। ক্রমে শিল্পীর ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙ্গে গেল। সেই রাতেই শিল্পী ঘর ছেড়ে ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে গ্রামের দক্ষিণ দিক দিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন।
শিল্পী শেষবারের মতো গ্রাম ছেড়ে যেদিক দিয়ে যান সেখানে পাথরের একটি ছোট্ট খাদান ছিলো। পরের দিন সকালে গ্রামবাসীরা সেই খাদানের স্থানে আবিষ্কার করলো এক দেবালয়। অথচ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান মিললো না শিল্পীর। সবাই বুঝলো, শিল্পীর দুঃখ মানুষে বোঝেনি, বুঝেছেন দেবতা। দেবালয় নির্মাণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন দেবতা।
কিন্তু স্থানীয় পণ্ডিতরা ওই মন্দিরের ভিতরে খোদাই করা শিবলিঙ্গ ও মূর্তি দেখে ভীত হলেন। বুঝতে পারলেন, যে রাতে তাড়াহুড়ো করার কারণে শিবলিঙ্গের আরঘা উল্টো দিকে তৈরি করা হয়েছে, যার পুজো ফলপ্রসূ হবে না, বরং পুজো হবে ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, শাস্ত্রে বলা আছে বিপরীত দিশার শিবলিঙ্গ ক্ষুৎ প্রকারের। এই শিবলিঙ্গের পুজায় মহাঅনিষ্ঠ হয়। পন্ডিতেরা মত দিলেন যে শিবলিঙ্গ পুজো করা যাবে না। তাই দেবলয়টিকেও অচ্ছুৎ ঘোষণা করলেন। সেই কারণেই আজো সেই নিষেধাজ্ঞা জারি আছে।

এ ব্যাপারে অন্য একটি কাহিনী হলো—
কথিত আছে, এখানে এক সময় কাত্যুরি রাজার শাসন ছিল। সেই সময়ের শাসকরা স্থাপত্যের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। এমনকি এ ব্যাপারে অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতেন। কাত্যুরি রাজা নিজের রাজ্য সীমার মধ্যে অনেক স্থাপত্য মন্দির গড়ে তুলেছিলেন। রাজা এক দক্ষ কারিগর দিয়ে এক সুন্দর স্থাপত্য নির্মাণ করেন। নির্মাণের পর, ওই কারিগরের একটি হাত কেটে নেওয়া হয় যাতে আর দ্বিতীয় এইধরনের কোন স্থাপত্য নির্মাণ না হয়। রাজার এই চরম অন্যায়কে মেনে নিতে পারেননি কারিগর। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন রাজাকে শিক্ষা দেবার।
একরাতের মধ্যেই এই দক্ষ কারিগর নির্মাণ করেন এক দেবালয়। এবং চিরকালের জন্য বিদায় নেন এই গ্রাম থেকে। বলা হয়, সেই রাতে গ্রামের বাসিন্দারা সারারাত ঘর থেকে শুনেছিল ছেনি-হাতুড়ির ঠকঠক আওয়াজ। কারিগরের অন্তরালের কথা জানতে পেরে গ্রামবাসীরা দুঃখে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঠিক করে, ঈশ্বরের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা-আস্থা বজায় থাকবে কিন্তু অশ্রদ্ধা, অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রদর্শনের জন্য এই দেবালয়ে কোনোদিন পুজো করবে না। সেই রীতি আজো চলে আসছে।
এই কারণেই এই মন্দিরের নাম ‘এক হাতিয়া দেবল’। বাংলায় যার অর্থ এক হাত দিয়ে নির্মাণ দেবালয়। বহু গ্রন্থেই এর উল্লেখ রয়েছে। মন্দিরটি আকারে ছোট। এক হাতিয়া মন্দিরের গর্ভগৃহ এবং অন্তরালের অভ্যন্তরীণ দেওয়ালগুলি সরল, সেগুলিতে কোন অলঙ্করন খোদাই করা হয়নি। আদি দেবতার রূপে এখানে একটি শিলা কাটা শিবলিঙ্গ রয়েছে। এর স্থাপত্য নাগর ও লাতিন শৈলীর।
এই মন্দির দেখতে দূরদূরান্ত থেকে বহুমানুষ আসেন। পুজা-অর্চনা নিষেধের কারণে কেবল মন্দির দেখেই সন্তুষ্ট হন। মন্দিরে মণ্ডপের সামনে অভিষেকের জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মন্দিরের পাশে একটি সরোবর আছে। স্থানীয়রা এটিকে নালা বলেন। মুন্ডন সংস্কারাদির সময়ে এই নালার জলে বাচ্চাদের স্নান করানো হয়।