চাঁদনি চক আর চাঁদের হাটের সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ছে। অভিধানকাররা আবার অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কেঁচো খুঁড়তে সাপ না বেরিয়ে পড়ে!
কোথায় না আছে চাঁদনি চক! এক এক করে নামগুলি বলে ফেলা যাক —
১. দিল্লি, ২. কলকাতা, ৩.পাটনা, ৪.পুনে, ৫. আগ্রা, ৬. বারাণসী, ৭. বেঙ্গালুরু, ৮. অমৃতসর
এর বাইরেও থাকতে পারে। দিল্লির চাঁদনি চকের নামের ব্যুৎপত্তির পেছনে সেখানে নির্মিত জলাশয়ে চাঁদের জ্যোৎস্নার প্রতিফলনের কথা বলা হয়। চাঁদনি রাতে তার শোভা অসাধারণ বলেই নাকি এই নাম।
কলকাতার চাঁদনি চকের নাম কোথা থেকে এল? এখানে তো সুরম্য জলাধার নেই!
মোটামুটি ঠিকানা যা জোগাড় করতে পেরেছি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের চাঁদনিচকগুলির, তা এখানে সাজিয়ো দিচ্ছি।
১. চাঁদনি চক — পুরান দিল্লি (নতুন/পুরাতন দিল্লি)
ঠিকানা/এলাকা: লালকেল্লার লাহোরি গেট থেকে ফতেপুরি মসজিদ পর্যন্ত পুরানো দিল্লির প্রধান বাণিজ্যিক রাস্তা।
বিশেষত্ব: মুঘল আমলের ঐতিহাসিক বাজার — পরিচিত অংশগুলোর মধ্যে পরাঁঠেওয়ালি গলি, দরিবাকলান, খারিবাওলি ইত্যাদি।
২. চাঁদনি চক — কলকাতা (এস্প্ল্যানেড/বৌবাজার)
ঠিকানা/এলাকা: চাঁদনি চক স্ট্রিট, এস্প্ল্যানেড–বৌবাজার অঞ্চল, কলকাতা – ৭০০০৭২।
বৈশিষ্ট্য : কলকাতার বিখ্যাত ইলেকট্রনিক্স ও হার্ডওয়্যার মার্কেট।
৩. চাঁদনি চক বাজার — পাটনা (ফ্রেজার রোড/স্টেশন রোড)
ঠিকানা / এলাকা: ফ্রেজার রোড ও স্টেশন রোড সংলগ্ন এলাকা, পাটনা — ৮০০০০১।
বিশেষত্ব : ঘরোয়া প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও বৈদ্যুতিক পণ্যের বড় বাজার — স্থানীয়ভাবে “চাঁদনি চক বাজার” নামে পরিচিত।
৪. চাঁদনি/চাঁদানি চক (স্থানীয় এলাকা) — পুনে (বাবধান/গাভথান)
ঠিকানা/এলাকা/পুনের বাবধান–চাঁদনি চক অঞ্চল।
বৈশিষ্ট্য : পুনের একটি সুপরিচিত মোড়/স্থানীয় বাজার এলাকা।
৫. চাঁদনি চক — লখনউ (আমিনাবাদ/চৌক এলাকা)
ঠিকানা/এলাকা: লখনউয়ের ঐতিহাসিক আমিনাবাদ ও চৌক অঞ্চলে বিভিন্ন দোকান ও বাজার “চাঁদনি চক” নামে পরিচিত।
বৈশিষ্ট্য: ব্যবসায়িক নামে বেশি ব্যবহৃত — আমিনাবাদের পুরোনো বাজার অংশে লোকমুখে প্রচলিত।
৬. চাঁদনি চক — আগ্রা (কমলা নগর / পিনাহাট অঞ্চল)
ঠিকানা / এলাকা: আগ্রার কমলা নগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছোট বাজার বা দোকানপট্টি “চাঁদনি চক” নামে পাওয়া যায়।
বৈশিষ্ট্য: এটি একটি ঐতিহাসিক রাস্তা নয়— স্থানীয় দোকানপট্টির নাম।
৭. চাঁদনি চক (নাম ব্যবহার) — বারাণসি
ঠিকানা/এলাকা: বারাণসিতে “চাঁদনি চক” নামে বহু খাদ্যদোকান/ব্যবসা পাওয়া যায়, যেমন: “টেস্ট অব চাঁদনি চক”, জয়প্রকাশ নগর, মানদৌদিহ/সিগরা অঞ্চল।
বৈশিষ্ট্য: নামটি মূলত বাণিজ্যিক ব্যবহার, কোনো একক ঐতিহাসিক বাজার নয়।
৮. চাঁদনি চক (নাম ব্যবহার) — অমৃতসর (টাউনহল/রণজিৎ অ্যাভিনিউ)
ঠিকানা/এলাকা: আমৃতসরের টাউনহল, রণজিৎ অ্যাভিনিউ, স্বর্ণমন্দির সংলগ্ন এলাকায় “চাঁদনি চক” নাম ব্যবহারকারী রেস্তোরাঁ/দোকান পাওয়া যায়।
বৈশিষ্ট্য: এগুলোও মূলত ব্যবসার জায়গার নাম— দিল্লির মতো একটি বড় ঐতিহাসিক বাজার নয়।
৯. বেঙ্গালুরুর চাঁদনি চকও অনেকের পরিচিত।
প্রশ্ন এটাই, চতুর্দিকে এত চাঁদনি চক কেন?
চাঁদনি শব্দের উৎস কী? একি চাঁদ বা চন্দ্রের কিরণ থেকে চাঁদনি? জ্যোৎস্নায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? সব বড় রাস্তার চৌমাথার পাশেই কেন একটি চাঁদনি চক গজিয়ে উঠেছিল, সেটাই ভাবাচ্ছে। দিল্লির চাঁদনি চক নামটি না হয় সুদৃশ্য জলাধারে চাঁদের আলো ঠিকরে মোহময় পরিবেশ তৈরি করত বলে দেওয়া হয়েছিল, সব জায়গার চাঁদনি চকে তো আর জলাধার নেই! তার বেলায়?
বামন শিবরাম আপ্তের সংস্কৃত অভিধানে চত্বর মানে চারটি রাস্তার মিলনস্থল। বা, চৌমাথা বা চৌরাস্তা বা চতুষ্পথ।
নগেন্দ্রনাথ বসু প্রণীত বিশ্বকোষ-এ চত্বর শব্দের প্রধান একটি অর্থ, চারিরথ্যার মিলনস্থান, চৌমাথা পথ।
প্রয়োগ, ‘অনুরথ্যাসু সর্ব্বাসু চত্বরেষু চ কৌরব’।
স্কন্দপুরাণে পাচ্ছি,
রাজমার্গোপরথ্যাশ্চ চত্বরাণি ত্রিকাণি চ।
এখানে চত্বরাণি বহুবচন। অনেক চৌমাথার কথা বলা হয়েছে।
গাথাসপ্তসতীতে আছে,
রথ্যামুখ-দেবকুল-চত্বরাণি অস্মাকং চ হৃদয়ানি।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিরচিত বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে চাতর শব্দের প্রধান অর্থ দেওয়া হয়েছে, চতুষ্পথ, চৌরাস্তা বা চৌমাথা। সংস্কৃত চত্বর থেকে জাত এই চাতর। চাতর-এর গুরুত্ব বোঝাতে প্রয়োগ দেখানো হয়েছে বেশ কয়েকটি। কৃত্তিবাসী রামায়ণ (উত্তরখণ্ড) থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে, ‘বুলে চাতরে চাতরে’। বুলে মানে ভ্রমণ করে। ‘গাইল গীত চাতরে চাতরে’। ‘লইয়া বেড়াও চাতরে চাতর’।
কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখেছেন — ‘নগরচাতরে’ কথাটি। কাশীদাসী মহাভারতেও আছে ‘নগরচাতর’ শব্দটি। আছে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলেও। বিজয় পণ্ডিত রচিত মহাভারতেও আছে ‘নগরচাতর’ শব্দটি। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত বঙ্গসাহিত্য-পরিচয়েও আছে নগরচাতর শব্দ।
অর্থাৎ চাতর বা চৌরাস্তা বা চৌমাথা ভারতীয় গ্রামীণ ও নগরসভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
চাতর থেকেই এসেছে স্থাননাম চাতরা। চাতরা আছে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে, আছে ও বঙ্গের রংপুরের পীরগঞ্জেও।
জামিল চৌধুরী সম্পাদিত ঢাকার বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘চাতর’ শব্দের অর্থ হাট-বাজার।’চাতরে হাঁড়ি ভাঙা’-র কথা আছে শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে। অর্থাৎ চাতর মানে রাস্তার চৌমাথা বা হাট। চাতরে হাঁড়ি ভাঙা অনেকটা হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো। এখন যাকে হাট বলে, আগে তাকে বলত চাতর। রামপ্রসাদের গানেও আছে ‘শেষে চাতরে কি ভাঙবো হাঁড়ি?’
অনুমান করাই যায়, এই চৌরাস্তা বা চৌমাথায় বিভিন্ন দিক থেকে আনা মহার্ঘ জিনিসের হাট বসত। সেই হাটকে বলা হত ‘চাতরহাট’। সাধারণ হাটে যেসব জিনিস পাওয়া যেত না, সেগুলি পাওয়া যেত চাতরহাটে। অর্থাৎ চাতরহাট ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় হাট। নামীদামী জিনিসের দেখা মিলত চাতরহাটে। কলকাতার চৌরঙ্গি যে একটি নামী চাতরহাট, তা বলাই বাহুল্য। উর্দুতে চৌরঙ্গী মানে চৌমাথা বা চৌরাস্তা।
মনে হয়, চত্বরাণি শব্দটিই অপভ্রংশে চাত্রাণি হয়ে চাদ্রানি হয়ে গিয়েছিল। তা থেকেই লোকমুখ চাঁদনি হয়ে গেছে। চাঁদনি চক আসলে চৌমাথা বা চৌরাস্তার গায়ে গজিয়ে ওঠা হাট। এর সঙ্গে চাঁদের আলো বা জ্যোৎস্নার কোনও সম্পর্ক নেই।
চত্বরাণি > চাত্রাণি > চাদ্রানি > চাদনি > চাঁদনি।
চাঁদনি চক হল রাস্তার চৌমাথার বাজার। রাস্তার চৌমাথায় অবস্থিত হওয়ার জন্যে পণ্যসমাগম ও ক্রেতাবিক্রেতার সমারোহ লেগেই থাকে।
চাঁদনি চকের কথা অমৃতসমান।