প্রায় ১৬৫/৬৬ বছর আগেকার ঘটন। সে সময়ে শান্তিপুর গো-ভাগাড় মোড়ে ছিল ‘ইন্দ্র ময়রার’ বাড়ি। কানে খাটো ইন্দ্র ময়রার সঙ্গে একটু গলা চড়িয়ে কথা বলতে হতো খরিদ্দারদের। এই পরিবারের এক রূপবতী মেয়ের নিখুঁত রূপের জন্য নাম দেওয়া হয়েছিল নিখুঁতি। নিখুঁতি চনমনে। এক জায়গায় তাকে বসিয়ে রাখা মুস্কিল। তবু কাজের চাপে মেয়েকে দোকানে বসিয়ে ইন্দ্র ময়রা গেছেন মহাজনের কাছে চিনির খোঁজে। নিখুঁতি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো উনুনে কড়াই চাপানো রয়েছে। পাশে বেশ কিছুটা মাখা ছানা কাঠের বারকোষে পরে রয়েছে। নিখুঁতি মাখা ছানা কিছুটা নিয়ে ছোট ছোট লেচির মতো গোল গোল করে উনুনে চাপানো গরম কড়াইয়ের তেলে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই ছানা ভাজা হয়ে টকটকে লাল। নিখুঁতি একটু ভড়কে গেল হলোটা কি! ভয়ে তাড়াতাড়ি কড়াই থেকে তুলে গামলায় রাখা রসের মধ্যে ডুবিয়েই বাড়ি পালাল নিখুঁতি। ইন্দ্র ময়রা ফিরে এসে দেখে মেয়ে ফুরুত। তারপরেই মেয়ের কীর্তি চোখে পরলো। কি আর করা। ব্যবসায়ী বাবা মেয়ের খেলারছলে তৈরি করা সেই মিষ্টি ফেলে না দিয়ে পরিচিতদের কাছে বিক্রি করলেন। পর দিন সাত সকালে দোকানে হাজির আগের দিনের এক খরিদ্দার। সে জানতে চায় ওই মিষ্টির নাম কি। কানে খাটো বাবা প্রশ্ন বুঝতে ভুল করলেন। ভাবলেন জানতে চাইছে কে তৈরী করেছে। উত্তর দিলেন নিখুঁতি। বঙ্গবাসী পেয়ে গেল নতুন স্বাদের মিষ্টি। সময়টা ১৮৫৬’র আশপাশে। নিখুঁতি গড়ার কারিগর সেই ইন্দ্র পরিবারের দোকান বহুকাল উঠে গিয়েছে। কিন্তু শান্তিপুরের নিখুঁতি এখনও সমান জনপ্রিয়।

১৮৫৩ সালে এক মন সন্দেশ ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হত বলে রসরাজ অমৃতলাল বসু তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেগেছেন। সন্দেশ কিন্তু তখন আমজনতার পাতে ওঠেনি। সন্দেশ ছিল ধনীর একচেটিয়া জিম্মায়। সাধারণ গরিব-গুর্ব ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ছিল নাড়ু, মালপোয়া, রসবড়া, নারকেল ছাপা, চন্দ্রপুলি এসব। এই ধরনের মিষ্টি গরিব, মধ্যবিত্তের রসনায় তৃপ্তি দিলেও সন্দেশ বস্তুটি ছিল বরং স্পেশাল। যা বনেদি বাড়ির অন্দরমহলে গিন্নিবান্নিদের হাতে তৈরি হতো স্পেশাল ভাবে।
দুর্গা কন্যারূপে ফি-বছর পিত্রালয়ে আসেন তিন দিনের ছুটিতে। দশমীতে ঘরের মেয়ের কৈলাসে ফেরার পালা। চার দিনের আনন্দের শেষে দশমীর দিন বিষাদের সুর আমবাঙালির মনে। তবে এই বিষাদের আবহেই সমানতালে চলে মিষ্টিমুখের আয়োজন। তাই দশমীর সকাল থেকেই উত্তর থেকে দক্ষিণ, পাহাড় থেকে সমতল বাড়ির কর্তাদের লাইন পড়ে পাড়ার মিষ্টির দোকানে। বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপোতভাবে জড়িত ঐতিহ্যের টান। কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজো শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে, অনেক বাড়িতে মহালয়ার দিন থেকেই মিষ্টির ভিয়েনে বসিয়ে তৈরি হতো পুজোর নানারকম মিষ্টি সবশেষে বিজয়ার মিষ্টি। ঢাকের বোলে বিদায়ের ছন্দ বাজলেই ময়রাদের কড়ায় পাক হতো সন্দেশ, জিবেগজা, রসবড়া, মনোহরা, মিহিদানা, সীতাভোগ, নিখুঁতি…।

কলকাতায় নীলমণি মিত্র স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়িতে দুর্গোৎসব-এর মিষ্ট নিয়ে নানা গল্প রয়েছ। তবে — ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে এই পুজোয় এক মন খাসা সন্দেশ কিনতে খরচ হয়েছিল ১৫ টাকা। যা সেই সময়ে বেশ দামিই বটে। সেকালে মা দুর্গাকে বরণ করা হতো ছানার সন্দেশ দিয়ে। মনে করা হতো মায়ের মুখে ছানার সন্দেশ দেখেই নাকি নীলকন্ঠ পাখি কৈলাসে উড়ে যেত উমার পতিগৃহে ফেরার সন্দেশ নিয়ে। অনেক পরে সাধারণের বিজয়াপর্বে যোগ হয় সন্দেশ।
বাঙালি অবশ্য মিষ্টির ক্ষেত্রে নতুন পুরনো সব স্বাদেই ভরসা রাখে। তাই বিজয়ায় যেমন পুরনো জমানার মিষ্টি জলভরা তালশাঁস সন্দেশ, শাঁখ সন্দেশ বা কালাকাঁদ থাকে তেমনই গোলাপ সন্দেশ, কাজু বরফি, আইসক্রিম সন্দেশ বা স্যান্ডউইচ সন্দেশও পছন্দ বঙ্গবাসীর। আবার নতুন প্রজন্ম ফিউশনে বিশ্বাসী। তাই তারা অনেকেই খোঁজেন চকোলেট মিষ্টি। চকোলেট সন্দেশ, চকোলেট ক্ষীরকদম, চকো রোল, চকোলেট রসগোল্লার মতো মিষ্টিও এখন রাখতে হয় ক্রেতা টানার জন্য।

শুধু বনেদি বাড়ি নয় বিজয়ার মিষ্টিমুখের রেওয়াজ ছিল গরিব গুর্বোদের ঘরেও। সেখানে এত আড়ম্বর না থাকলেও নারকেল নাড়ুর উপস্থিতি জানান দিত পুজো শেষ। কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোতে কোথাও কোথাও এখনও তৈরি হয় বিজয়ার মিষ্টি। কিন্তু বেশিরভাগ বনেদি বাড়িতেই বাজার থেকে কেনা মিষ্টি দিয়েই সারা হয় বিজয়াপর্ব। এখনও বাঙালির বিজয়া দশমীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘরোয়া সংস্কৃতি। যদিও কালের নিয়মে বদলে গেছে বহু রীতি। তবে অন্তরের টান এখনও টিকে আছে। এককালে ঠাকুমা কিংবা দিদিমার হাতের তৈরি মালপোয়া, নারকেল নাড়ু, চন্দ্রপুলি, গজা, মিহিদানা, নিখুঁতি, মনোহরা, নিমকি, ঘুগনির স্বাদ ছিল বিজয়ার পরম প্রাপ্তি।

তবে সেকালে কলকাতায় বিজয়ার অ্যাপায়ন ছানার ‘সন্দেশ’ দিয়ে হত না— ‘নারকেল ছাবা’ দিয়ে হত। মহেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়েছেন, ‘বিজয়ার দিন নারিকেল ছাবা দেওয়া হইত। বিজয়ার কোলাকুলিতে সন্দেশ বা অন্য কোন খাবার চলিত না।’
দুই
জনাইয়ে কালিকাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িটি জনাই রাজবাড়ি নামে খ্যাত। এই বাড়ির স্থপয়িতা কালিকাপ্রসাদের বাবা রামজয় মুখোপাধ্যায়। রামজয়ের পিতা ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে মুৎসুদ্দির কাজ করতেন। পরিবারে দুর্গাপুজোর প্রচলন কালিকাপ্রসাদের আমল থেকে। কালিকাপ্রসাদ যেখানে বাড়ি করেছিলেন সেখানে ছিল শ্মশান। কালিকাপ্রসাদ স্বপ্নাদেশ পান মা পুজো নেবেন এই শ্মশান মাটিতে। তাই আজও ঠাকুরদালান পাকা হলেও দালানের মেঝে পাকা হয় নি।

সেই সময়ে জনাইয়ে বেশ কয়েকঘর মিষ্টির কারিগর বা ময়রা থাকতেন। দেশীয় মিষ্টির পাশাপাশি তখন তাঁরা একটু একটু করে ছানার মিষ্টিও করতে চেষ্টা করছেন। ছানা দিয়ে সন্দেশই তৈরি হতো বেশি। তা রাজামশাই মাঝে মাঝেই মিষ্টি কিনতেন এই সব কারিগরদের কাছ থেকে। একদিন সকালে কলকাতায় আসার পথে সন্দেশের কথা বললেন ময়রাকে। এও বললেন, কলকাতা থেকে ফেরার পথে মিষ্টি নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেদিন রাজা আর ফিরলেন না। ময়রা পরলেন মহা ফ্যাসাদে। সন্ধ্যে হয়ে যাবার পর ময়রা কি করবে ভেবে না পেয়ে কাঁচা সন্দেশকে চিনির রসে ডুবিয়ে দিলেন, যেন কাঁচা ছানাটা নষ্ট না হয়ে যায়। পরেরদিন ময়রা দেখলেন কাঁচা ছানার গায়ে চিনির রসের একটা আস্তরন পরে গেছে। ময়রা পরলেন বিপদে। এখন রাজা মশাই মিষ্টি চাইলে কোথা থেকে দেবেন? বললেই তো আর এই মুহূর্তে ছানা পাওয়া যাবে না। হলও তাই রাজা মশাই মিষ্টি চেয়ে পাঠালেন। ময়রা সেই মিষ্টিই নিয়ে গিয়ে রাজাকে দিলেন। মিষ্টি দেখে রাজা হাসতে হাসতেই বললেন, এ কি মিষ্টি তৈরি করেছো গো নাগের পো। না বাবু একটা নতুন ধরনের মিষ্টি বানালাম। রাজামশাই মিষ্টি মুখে দিয়ে বললেন, নাগের পো তুমি তো আমার মনটা হরন করে নিলে গো। শোনো এই মিষ্টিটা আরও বানাও। বিজয়াতে সকলের হাতে দেব। মিষ্টির নাম দিলুম মনোহরা। মিষ্টির কারিগর ছিলেন ভীম নাগের পিতা প্রাণ চন্দ্র নাগ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টায় রীতি। নারকেল ছাবা দিয়ে এখন বিজয়া কথা ভাবতেও পারেন না আমবাঙালি। তিথি মতে দেবী দুর্গার বিসর্জন হলেই শুরু হয় বিজয়া দশমীর পালা। কিন্তু একটা সময়ে মহালয়ার পর থেকেই বাড়ির মহিলা মহলে শুরু হয়ে যেত বিজয়া দশমীর প্রস্তুতি। গাছ থেকে নারকেল পাড়িয়ে ঘরে জমা করা, ঘষেমেজে সন্দেশের ছাঁচগুলিকে প্রস্তুত করে রাখা, মিষ্টির জন্য গুড়-চিনি এবং নিমকি, গজার জন্য ময়দা, ডালডার টিন মজুত রাখা আরও কত কি?

কাটোয়াতে হাতে লেখা মহাভারতের তালপাতার পুঁথিতে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের দু্র্গাপুজোর খরচের একটি ফর্দ পাওয়া যায়। সেই দুর্গাপুজোয় মোট খরচ হয়েছিল ৮০ টাকা ১৪ আনা ২ পাই পয়সা। এর মধ্যে প্রতিমার দাম ৫ টাকা, এক মন ঘি কেনা হয়েছিল ৫ টাকা, ৪ মন ময়দা ২ টাকা ৬ আনা। ক্ষীর কেনা হয় ৫ টাকার, সন্দেশ ৭ টাকার — তবে মিষ্টির ওজনটা লেখা ছিল না।
উত্তর থেকে দক্ষিণ, সর্বত্র একই ছবি৷ দশমীর সকাল থেকে ভিড় মিষ্টির দোকানে। সরপুরিয়া, কাঁচাগোল্লা, জলভরার মত ট্র্যাডিশনাল মিষ্টির পাশাপাশি বাজার মাতাচ্ছে বাটার স্কচ, পাইন অ্যাপেল, চকোলেট সন্দেশের মত ফিউশন মিষ্টি। তবে সবকিছুকে টেক্কা দিয়েছে ঐতিহ্যের টান। আবার একটি বছরের অপেক্ষা।
বহুদিন পর বাঙলার পুরনো মিষ্টি নিয়ে লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো।
জ্যোতি’দা লেখাটার জন্যে অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
বহুদিন পর বাঙলার পুরনো মিষ্টি নিয়ে লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো।
দারুণ মিঠে লেখা , যার সুবাসটুকু মনের পাকশালের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়লো ।
সাধারণ মিষ্টি,অসাধারন লেখা ।