রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম এভাবে করোনার দৌলতে পাওয়া গৃহবন্দি জীবন থাকলে মন্দ কী? অফুরন্ত সময়, দেদার আয়েস, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অনন্ত তরিকা। সকলেই দেখছি দূষণমুক্ত পরিবেশে আহ্লাদে আটখানা। ভাবলাম ভালোই তো। সবকিছুর তো ভালো দিক থাকে। করোনা ভাইরাস আমাদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তুলেছ (যদিও সেটা ভয়ে ভক্তির নামান্তর। তাও ভালো। দেবতার জন্মও তো ভয়েই !), বছরদেড়েক হল ঘরে থিতু করেছে, যে ঘরটি মনের অজান্তে পর হয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে পশুপাখিদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে, পথঘাটও নির্জনতায় একটু গল্প করার সুযোগ পেয়েছে। আমাদের জীবনে একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন করে প্রাণিত হওয়ার আনন্দে ঘরবন্দির অবকাশ জীবন নানাভাবেই প্রকাশমুখর। অথচ তারপরেও নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার অভাববোধ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
অবশ্য তা না-হওয়ারই কথা। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই তো আনন্দ। আর সেই আনন্দ মেলে মিলনে, ঘরের সঙ্গে বাইরের সংযোগেই তার বিস্তার। মনে পড়ে যায় সেই কলকাতার মেয়েটির কথা যে গ্রামে বেড়াতে এসে সবুজ প্রকৃতির নির্মল পরিবেশের কথা বলায় বাঁচাল হয়ে উঠেছিল। অথচ তিনদিন পর আর তাকে ধরে রাখা যায়নি। তখন দূষণমুখর কলকাতাই তার প্রিয় বলে ঠোঁট ফুলিয়ে তর্ক জুড়ে দিয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা সেখানেই সে নিজেকে খুঁজে পেয়ে আনন্দ লাভ করে। তাছাড়া ভেজাল খেতে খেতে পেটও একসময় অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন আসলেই পেটের রোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমাদের অভ্যস্ত জীবনে দূষণের তীব্র হাতছানি। তারপরেও সেখানে মনের চলনে আমরা সুহানা সফরে বেরিয়ে পড়ি, কোলাহলের মধ্যেও ফিস সিস করে আপন কথা যাপন করে হেসে উঠি, পূতিগন্ধময় পথে নাকে রুমাল দিয়ে চলতে চলতেই সামনে এগিয়ে হাঁফ ছেড়ে পাকা রাস্তায় ওঠার তৃপ্তিতে শরীরের ভাষাও পড়ে ফেলি।
মনে পড়ে যায় অস্কার ওয়াইল্ডের স্বার্থপর দৈত্যের গল্পের কথা। সেই দৈত্য তার সাজানো ফুলের বাগানে স্কুলফেরত ছেলেদের উৎপাতে বিরক্ত হয়ে তাদের একদিন ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। সেদিনই বাগান নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তার সৌন্দর্য যায় হারিয়ে। তখন দৈত্য তার ভুল বুঝতে পারে এবং ছেলেদের আবার ডেকে নিয়ে আসে। বাগানে আবার সৌন্দর্য ফিরে আসে, তার প্রাণে আসে সজীবতা। আসলে ছেলেরাও তো বাগানের ফুল। এ যেন বাগানের ফুলের সঙ্গে বাইরের ফুলের মহামিলন। সেখানে মানুষের ফুল তো মানুষই। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ফুলেই তার বাগানের বিস্তার যেমন সৌন্দর্য লাভ করে, তেমনই সুরভিত মনে হয়। দূষণের মধ্যেও ফুলের সেই মিলনে মানুষের বাগান সজীবতা ফিরে পায়। করোনার অদৃশ্য দৈত্য সেই মিলন থেকে বঞ্চিত করে আমাদের দূষণমুক্ত করতে চাইলে কী হবে, আমাদের মনের ফুল যে তাতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, মিলনের অভাবে তার আনন্দ আত্মগোপন করে। এজন্য ফিরে চাই সেই দূষিত অথচ প্রাণবন্ত মুক্ত পরিবেশ যেখানে প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি।
বিগত ২০২০-র ১৩ মার্চের ক্লাসে ছেলেমেয়েদের উজ্জ্বল চোখমুখগুলির আয়নায় নিজেকে খুঁজে ফিরেছি। এরপরে কী পড়াব তা নিয়েও কত কথা। অথচ এই বছরদেড়েকেই মনে হচ্ছে সে সবই স্মৃতি। এই সেদিনও কার্তিক, সিদ্ধার্থ, সুপ্রিয়, সন্দীপ, বৈদ্যনাথ ও বিকাশদের সঙ্গে বৈকালিক আড্ডায় কত কথাই না হয়েছে। সেই কথাগুলি যেন এখন দেড় বছরের মধ্যেই ইতিহাসে আশ্রয় নিয়েছে। আসলে আমরা যতই বলি ‘out of sight, out of mind’, অভাবে যে ক্ষিদের কথা বেশি মনে হয়। শুধু তাই নয়, তখন রসনাতৃপ্তির চেয়ে অতৃপ্তির কথাই বেশি উঠে আসে। স্মৃতি তখন ইতিহাসে আশ্রয় নেয়, ইতিহাস স্মৃতি হয়ে ওঠে। করোনার অভূতপূর্ব আবির্ভাবে আমাদের সেই স্বাভাবিকতাকেই স্মরণ করিয়ে দিল। এজন্য আমাদের আরও কিছুদিন ঘরবন্দি জীবন সাধনা হয়ে উঠুক। সেই অমূল্য জীবনের জন্য তা যে অতি সামান্য!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
বেশ ভালো লাগলো।ঘরে বসে বসে পাগল হবার উপক্রম হয়েছে।কবে মুক্তি ঘটবে,কে জানে?
ফিরে যেতে চাই সেই দূষিত স্বর্গে।