স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র বড় পর্দার শ্রেষ্ঠতম মূখাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তাঁর মৃতদেহ সমাধিস্থিত হয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভা লেকের তীরে গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু এর ঠিক আড়াই মাস বাদে দুই চোর তাঁর কবর খুঁড়ে মৃতদেহটি গায়েব করে দেয়। তারিখটা ছিল ১৯৭৮ সালের ২রা মার্চ। কবর খুঁড়ে চোরেরা কফিন শুদ্ধ মৃতদেহটাই গায়েব করে দিল অথচ কেউ ঘুনাক্ষরেও টের পেলো না।
সপ্তাহখানেক পর খবরটি জানালো চোরেরা স্বয়ং। তারা চ্যাপলিনের স্ত্রী ওনা চ্যাপলিনকে (Oona Chaplin) ফোন করে জানালো তাদের কীর্তির কথা। এটিও জানালো কফিনটিকে তারা সযত্নে রেখে দিয়েছে। ৬ লক্ষ ডলারের পরিবর্তে তারা সেটিকে ফেরত দিতে প্রস্তুত।
চ্যাপলিনের স্ত্রী সেই টাকা দিতে তো রাজি হলেনই না, বরং পুলিশকে জানিয়ে দিলেন সমস্ত ঘটনাটি। অতঃপর যা হয়! এমন বিখ্যাত মানুষের যদি লাশ চুরি যায় সে খবর কি আর চাপা থাকে! সমস্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো সেই খবর।

এই ঘটনাটিতে অনেকেই মনে করেন এতে আমেরিকার হাত আছে যেহেতু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চ্যাপলিন বরাবরই প্রতিবাদ করেছিলেন। আমেরিকা চ্যাপলিনকে রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল এবং কমিউনিস্ট মনে করতেন। তার সিনেমা ‘লাইমলাইট’ ছবি প্রিমিয়ারে গিয়ে আর আমেরিকায় ফিরতে পারেনি চ্যাপলিন। কারণ রি-এন্ট্রির ভিসা দেয়নি সেই সময় আমেরিকা।
চার্লি চ্যাপলিনের শৈশব কেটেছে চরম অভাব-অনটন ও নিদারুণ কষ্টের মধ্যে।
ঘটনাক্রমে মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তাকে মঞ্চে নামতে হয়েছিল আর সেই অভিনয়সত্তাকে ছুঁয়ে থাকলেন আজীবন। অভিনয় আবহেই তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। মা-বাবা দুজনেই ছিলেন মঞ্চাভিনেতা। একদিন এক অনুষ্ঠানে মঞ্চে হঠাৎই তাঁর মায়ের গলার স্বর বন্ধ হয়ে যায়। দর্শকরা উত্তেজিত অবস্থায় কুমন্তব্যে ভরিয়ে তোলে পরিবেশ। বাবা ঠেলে চ্যাপলিনকে স্টেজে ঢুকিয়ে দেন। ছোট চ্যাপলিনের ভয়ে হাত পা কাঁপতে থাকে। তারই মধ্যে সাহস সঞ্চয় করে মাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে জ্যাক জোনস গানটিকে গেয়ে ওঠেন চার্লি। দর্শকরা মজা পেয়ে হেসে ওঠে। মঞ্চের ওপর পয়সা উড়ে এসে পড়তে থাকে। ছোট বয়স থেকেই জীবনটা খুব একটা মসৃণ ছিলো না। কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে প্রতিষ্ঠা এসেছিলো। মৃত্যুর পরও তাঁকে শান্তি দেয়নি দুষ্কৃতীরা। তাঁর কঙ্কাল বেচে ইনকাম করতে চেয়েছিল।

যাইহোক, পুলিশও ঝাঁপিয়ে পড়ল দুনিয়া কাঁপানো মানুষটির মৃতদেহের খোঁজে। শুরু হলো চোর পুলিশের ইদুর-বিড়াল খেলা। আশেপাশে এলাকার মোট ২০০টি টেলিফোন বুথের ওপর কড়া নজরদারি শুরু করল তারা কিন্তু তাতে দমানো গেলো না রহস্যময় সেই ফোনকল আসা। শুধু মুক্তিপণ নয়, চ্যাপলিনের দুই সন্তানকেও এবার অপহরণের হুমকি দেওয়া হলো।
অবশেষে মাস তিনেকের মাথায় ধরা পড়লো দুই চোর। একটির নাম রোমান ওয়ারডাস (Roman Wardas), পেশায় গাড়ির মেকানিক পোল্যান্ডের অধিবাসী। অপরজন বুলগেরিয়ার গ্যানসো জ্যানিব (Gantscho Ganev)। কবর থেকে লাশ চুরি করাটাই তাদের পেশা। মূলতঃ ভালো পয়সা হাতানোর জন্যই তারা চ্যাপলিনের মৃতদেহ চুরি করে।
ধরা পড়ার পর তারা জানালো, গোরস্থান থেকে বারো চোদ্দো কিলোমিটার দূরে কফিনটিকে নিয়ে গিয়ে তারা একটি ভুট্টার ক্ষেতে পুঁতে রেখেছে। পুলিশ গেল, খুঁজে পাওয়া গেল কফিন এবং তার মধ্যে থাকা চ্যাপলিনকে। কফিন সমেত দেহ তুলে এনে আবার আগের জায়গায় সমাধিস্ত করা হলো তাকে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো পুলিশ। এবার যাতে আর চুরি না হয় তার জন্য কবরের চারপাশে এবং ওপরের নিচে কংক্রিটের ঘেরাটোপ করে দেওয়া হলো।

চোর দুজন টাকা আদায় করতে পারেনি এবং কয়েক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড জুটলো তাদের কপালে। মূল পরিকল্পনার জন্য ওয়ারডাসকে সাড়ে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গ্যানসো জ্যানিবের সাজা হয় আঠারো মাস। তবু এই ঘটনায় বিখ্যাত হয়ে গেল তারা। সবাই জানল তাদের নাম। মৃতদেহ আটকে রেখে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে নিজেদের কীর্তির বিবরণ দিয়ে খুব একটা খারাপ অঙ্কের অর্থ উপার্জন করে নেয়নি।
কবর খুঁড়ে মৃতদেহ চুরির ব্যবসা আমাদের বাংলায় যে রীতিমতো জাঁকিয়ে চলে, তা আপনি প্রায় খবরের কাগজের পাতায় দেখতে পাবেন। মৃতদেহ চুরি হয় নানা কারণে। ডাক্তারি ছাত্রদের শারীরবিদ্যা-অস্থিবিদ্যা শেখানোর জন্য কঙ্কালের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের জন্য সবসময় সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কঙ্কালের চাহিদা পূরণ হয় না। এরজন্য একমাত্র পেশাদার কবরচোরেদের নিয়োগ করা হয়। তবে বর্তমানে আমদানি করা আর্টিফিশিয়াল কঙ্কালগুলি পড়াশোনার জন্য অনেক সুবিধা করে দিয়েছে।

শোনা যায় ইংরেজ আমলে সাহেব ডাক্তাররা নিজেরাই চোর নিয়োগ করতেন গোরস্থান থেকে মৃতদেহ সরাবার কাজে। তবে সাহেবদের কবরস্থানে হাত না দেওয়ার বিশেষ অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা থাকতো। নজর থাকতো মুসলমানদের কবরস্থানগুলোতে। এসব জায়গাগুলো তুলনামূলকভাবে অনেকটাই অরক্ষিত থাকতো আর সাহেবদের গোরস্থানের তুলনায় সংখ্যাও এদের অনেকটাই বেশি। যাই হোক সে যুগে শুরু হওয়াই ব্যবসা এখনো রমরমরমিয়ে চলে আসছে আজকের দিনেও।
মানব কঙ্কালের প্রয়োজন যে শুধু ডাক্তারি ছাত্রের জন্য হয় তা নয়, নানা বিচিত্র কাজে লাগে মানুষের কঙ্কাল। তিব্বতী বৌদ্ধদের যাঁরা তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত, এইসব খুলি আর হাড়ের চাহিদা সেখানে খুব বেশি। বৌদ্ধদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি রীতি চালু আছে। মানুষের উড়ুর হার বেশ ফাঁপা তা দিয়ে তৈরি হয় শিঙ্গা আর এই শিঙ্গা বাজানো বৌদ্ধদের ধর্মাচারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আর মাথার খুলি কে ব্যবহার করা হয় পানপাত্র হিসেবে।
১৯৮৬ সালে মানব শরীরে অবশিষ্টাংশ নিয়ে এই ব্যবসা, আইন করে বন্ধ করে দিয়েছে ভারত সরকার। তবে আইন বন্ধ হলেও একবারে যে বন্ধ হয়নি তার প্রমাণ মেলে মাঝেমধ্যেই।
খুব ভালো প্রতিবেদন
ধন্যবাদ।
দারুণ চমকপ্রদ ঘটনা। জানা ছিল না।