আগামী ২০-২৩ জানুয়ারি রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠীত হতে চলেছে ফুল মেলা। কেএমডিএ সূত্রের খবর, সরোবরের তিন নম্বর গেটের কাছে ২০ জানুয়ারি এই ফুল মেলার উদ্বোধন হবে। গত বছর প্রথম সেখানে পুষ্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে।

দৃষ্টি নান্দনিকতার এক উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো ফুল। আমরা আনন্দে, সম্মানে, ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় এমন কী শোকেও ফুলকে সঙ্গী করি। অধিকাংশ মানুষের পছন্দের বিষয় নিয়ে সমীক্ষা করলে প্রথম সারিতে অবশ্যই থাকবে পুল। গন্ধ, বর্ণ সব দিয়ে মনকে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারে প্রকৃতির এই সম্পদটি। কলকাতার শীল বরফের দেশের মতো সাদা নয়। উত্তুরে হাওয়া হিমের কুচি উড়িয়ে আনে না এখানে। বরং বলা যায় এখানের শীতের দোতনা বয়ে আনে রং। কমলালেবু-আপেল-টমাটোর রং, ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা-গাঁদার রং, টুপি-মাফলার-সোয়েটারের রং কলকাতাকে জানান দেয় শীত এসেছে। বরফ-সাদা শীত কলকাতা দেখে না। তার পরিবর্তে লাল-নীল-কমলা-সবুজে ঘেরা নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি দেখতে অভ্যস্থ মহানগর।

কলকাতার শীত মানে ফুল। শীতকালে এই শহরের বয়স কমে। চারদিকে মেলা, পিকনিকের চিঠি আসে। আর বাতাসে ভেসে আছে ফুলের গন্ধ। তাই বলাই যায় কলকাতায় শীতের অনুষঙ্গ ফুল। ডিসেম্বর থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যায় পুষ্প প্রদর্শনী। কলকাতা পুরসভার ১৬টি বরোতেও দেখা যায় একই ছবি। কোথা থেকে আসে এত সুন্দর ফুলগুলি? শহরে অনুষ্ঠিত পুষ্প প্রদর্শনীর অধিকাংশ ফুল-এর পরিচর্যার দায়িত্বে থাকে কলকাতা পুরসভা।

পুরসভার মূল কার্যালয়ের (৫ এস এন ব্যানার্জি রোড) সামনে চ্যাপলিন স্কোয়ারে সারা বছর ধরে এক বৃহৎ নার্সারির দেখভাল করা হয়। এই নার্সারির নিচে রয়েছে জলের রিজারর্ভার। শীত ও গ্রীষ্ণকলীন আলাদা আলাদা ফুলের বীজ থেকে গাছ তৈরি করে তাতে ফুল ফোটায় কলকাতা পুরসভার উদ্যান বিভাগ। জুন-জুলাই মাস থেকে শীতের ফুলের পরিচর্যা শুরু হয়ে যায়। প্রায় ২০ থেকে ২২ প্রজাতির ফুলের গাছ তৈরি করা হয় এখানে। গোলাপ, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, পিটুনিয়া, অ্যানটেপিয়াস, জারবেরা, কলিয়াস, পমপম-সহ একাধিক সিজন ফুল, বনসাই, পাতাবাহার গাছ পরম যত্নের সঙ্গে বপন করা হয় চ্যাপলিন স্কোয়ার নার্সারিতে।

এই নার্সারির দায়েত্বে থাকা পুরসভার এক আধিকারিক জানালেন, শীতকাল তো বটেই, সারা বছর ধরে কলকাতা পুরসভার যে কোনো অনুষ্ঠানে মঞ্চ সাজাতে ব্যবহার করা হয় এখানকার ফুলের টব সহ গাছ। অ্যাসেম্বলি ও কলকাতা পুরভবনের সব অনুষ্ঠানে এই ফুল সকলের মনোরঞ্জন করে। প্রতিটি বরোতে পুষ্প প্রদর্শনীতে এখানের ফুল যায়। গ্রীষ্মকালেও প্রায় ১০ প্রজাতির ফুলের পরিচর্চা করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকে গ্রীষ্ণকালীন ফুল যেমন জবা, বেল, জুঁই ইত্যাদির কাজ শুরু হয়। কলকাতা পুরসভার উদ্যান বিভাগের আধিকারিকগণ পরীক্ষা করে কন্ট্র্যাকটারের মাধ্যমে মাটি ও গোবর কেনেন। ফুলের মান ভালো করতে ও পোকার হাত থেকে গাছ রক্ষা করতে অত্যাধুনিক সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। জলের জোগান মেলে চ্যাপলিন স্কোয়ারের ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার থেকে।

শুধু ফুল নয়, চ্যাপলিন স্কোয়ারের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল সবজি-ও চাষ হচ্ছে এখানে। লঙ্কা, বেগুন, ফুলকপি, ব্রোকলি, কুমড়ো, লাউ, টমাটো, বিট, গাজর, পেঁয়াজ, মটরশুঁটি কী নেই এখানে! আছে বিভিন্ন ফলের গাছও। বাগানের মালি জানালেন, পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় যা যা ফুলের গাছ নার্সারিতে করা সম্ভব, এখানে তার সবকটি হয়। বর্তমানে কলকাতা পুরসভা সবুজায়ন বৃদ্ধির জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুষ্প-স্তবকের বদলে টব সমেত গাছ দিয়ে যে কোনো অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সম্বধন করার। ছোট টবে অল্প মাটিতে বাঁচতে পারে এমন একাধিক প্রজাতির গাছ এখন চ্যাপলিন স্কোয়ারে চাষ হচ্ছে। ফুল ও গাছ দিয়ে মানুষের মন আনন্দে ভরিয়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন নার্সারির দায়িত্বে থাকা কর্মীরা।