নদিয়া জেলা তথা বাংলার সুসন্তান বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় একজন চারণকবি, স্বাধীনতা সংগ্রামী, সম্পাদক, সাংবাদিক, সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করা থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিজয়লালের মতো চারণকবি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানের অভাব প্রত্যক্ষ করা যায়। বিজয়লাল সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্যের অপ্রতুলতার কথাও এ প্রসঙ্গে স্বীকার করে নিতে হয়। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় বহুবিধ বিষয়ে একাধিক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। সেগুলি সমকালীন ছোটো বড়ো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছিল। এছাড়া বিজয়লাল রচিত প্রায় চল্লিশটি পুস্তকও রয়েছে, যেগুলির বেশিরভাগই বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য।
উনিশ শতকের একেবারে শেষপাদে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন— ৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৯। ২০২২ সালে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় ১২৫তম জন্মবর্ষে পদার্পণ করেন। কিন্তু যুগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অনেকটাই বিস্মৃত হওয়ায়, তাঁকে স্মরণের ক্ষেত্রেও সার্বিক অনীহা চাক্ষুষ করা যায়। এমতাবস্থায় নদিয়া জেলার চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয় বিজয়লালকে স্মরণ করার মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও সেই অভাব পূর্ণ করল বলা যায়। কলেজের অধ্যাপক অধ্যাপিকা, শিক্ষাকর্মী, এলাকাবাসী এবং শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা স্মরণ করা হয়।

ইতিপূর্বে বিজয়লালের ১২৫তম জন্মবর্ষ সূচনার ঠিক আগে আগে কেবলমাত্র কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা মুক্তধারা বিজয়লালকে নিয়ে একটি আলোচনাসত্রের আয়োজন করেছিল। ৬ আগস্ট, ২০২২ (শনিবার) সেই আলোচনাসত্র বসেছিল কৃষ্ণনগর পুরসভার দ্বিজেন্দ্র মঞ্চে। ‘এখন সব অলীক : কবি বিজয়লাল এবং…’ শীর্ষক আলোচনাসত্রের মধ্যে দিয়ে আয়োজন সংস্থা কবির ১২৫তম জন্মবর্ষের প্রাক্-কালে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন। আর বিজয়লালের ১২৫তম জন্মবর্ষের ঠিক সূচনায় নদিয়া জেলার অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয় আয়োজন করল ‘শ্রদ্ধা-স্মরণ : কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়’ শীর্ষক সেমিনারের। ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ (শনিবার) একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কবি বিজয়লালের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। সেই উপলক্ষে কলেজের পক্ষ থেকে একটি স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছিল। এ দিনের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল সেটিই। প্রধান আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিজয়লাল অনুরাগী ও তাঁর একান্ত স্নেহধন্য কবি রামকৃষ্ণ দে-কে। বিজয়লালের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে এসেছিলেন, তাঁর কর্মকাণ্ড সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল— এমন মানুষ বর্তমানে প্রায় নেই বললেই চলে। কবি রামকৃষ্ণ দে হলেন এমনই একজন, যিনি বিজয়লালের শেষ জীবনে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তাঁকে। এ দিনের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট কৃষ্ণনাগরিক সম্পদনারায়ণ ধর।

চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়ের নদিয়া কক্ষে ইতিহাস বিভাগ ও বাংলা বিভাগের যৌথ আয়োজনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। কলেজের পক্ষ থেকে এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংস্থাকে এই আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আলোচক রামকৃষ্ণ দে ও বিশেষ অতিথি সম্পদনারায়ণ ধর মহাবিদ্যালয় কর্তৃক বিজয়লালকে স্মরণের এই উদ্যোগকে কুর্ণিশ জানান। মহাবিদ্যালয়ের নদিয়া কক্ষে স্থাপিত কবি বিজয়লালের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে এবং চারা গাছে জল সিঞ্চনের মধ্যে দিয়ে এদিনের অনুষ্ঠানের শুভসূচনা হয়। এরপর স্বাগত ভাষণ রাখেন চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. নিরঞ্জন গুহ। উদ্বোধন সংগীতের জন্য চারণকবি বিজয়লালেরই লেখা একটি চারণগান নির্বাচন করা হয়েছিল। সেই গানের কথাগুলি ছিল এইরূপ—
“নতুন করিয়া আমরা ধরায়
রচিব প্রেমের বৃন্দাবন
সবার উপরে মানুষ সত্য
গাহিব আমরা চারণগণ।”
চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক চিরঞ্জিত প্রামাণিক সুদক্ষতার সাথে গানটি পরিবেশন করেন। এরপর স্মারক বক্তৃতা শুরু হয়। আলোচক রামকৃষ্ণ দে কবি বিজয়লালের ব্যক্তিত্বের বহুবিধ দিক নিয়ে এদিন আলোচনা করেন। তাঁর সম্পর্কে বহু অজানা কথা, পারিপার্শ্বিক বহু অজানা ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন এবং বিজয়লালের সমসাময়িক আরও কয়েকজন গুণী ব্যক্তির কথাও প্রসঙ্গক্রমে আলোচনায় উঠে আসে। আলোচনা শেষে মহাবিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক দীপাঞ্জন দে। এই পর্বে কবি বিজয়লালের লেখা এবং তাঁর সম্পর্কিত কিছু দুষ্প্রাপ্য পুস্তিকা সকলকে দেখানো সম্ভব হয়।

বিজয়লাল সম্পর্কে আরও কিছু কথা এই প্রেক্ষাপটে বলে নেওয়া যাক। নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধিজির ডাকে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। গান্ধিজির ভাবাদর্শে বিজয়লাল তাঁর পল্লীভাবনা রূপায়ণের জন্য বেছে নিয়েছিলেন নদিয়ার বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামকে। সেখানে তিনি লোকসেবা শিবির প্রতিষ্ঠা করে সমাজসংস্কার ও গ্রাম গঠনের কাজে লিপ্ত হন। সেখানেই তাঁর শেষ জীবন অতিবাহিত হয়েছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় বড় আন্দুলিয়া গ্রামে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। অসম্ভবকে সম্ভব করে তিনি সেই পল্লীগ্রামে একটি গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার। জেলা সদর কৃষ্ণনগরের অন্যতম প্রতিষ্ঠান শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারের প্রাণপুরুষও কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়। বিজয়লালের অনুগত এবং ‘মাস্টারমশাই’ নামে সুপরিচিত প্রয়াত দেবপ্রসাদ চক্রবর্তীর নিরলস প্রচেষ্টা ও শ্রমে এই প্রতিষ্ঠান আজ অত্যন্ত সুনামের অধিকারী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিজয়লালের বিশেষ নৈকট্য ছিল। কবিগুরুর আহ্বানে বিজয়লাল শান্তিনিকেতনে কিছুকাল শিক্ষকতাও করেন। রবীন্দ্রসাহিত্য সম্পর্কিত বিজয়লালের রচনাগুলি খুবই মূল্যবান। বিজয়লালের লেখা ‘বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ’ (প্রথম সংস্করণ ১৯৩১ খ্রি.) বইটি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। বইটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এর একাধিক সংস্করণ প্রকাশ পায়। উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে যাদবপুরের কুমুদশংকর রায় টি বি হাসপাতালে রোগশয্যায় শুয়ে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় ‘বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা লিখেছিলেন। তবে ব্রিটিশ সরকার প্রথমে কেন বইটি বাজেয়াপ্ত করেছিলেন, সেটি বিজয়লালের কাছেও স্পষ্ট ছিল না। আর কবিগুরু স্বয়ং বিজয়লালের এই বইটি পড়ে নাকি খুশিই হয়েছিলেন। আসলে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারা এবং তাঁর কর্মধারা বিজয়লাল সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। বিজয়লালকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। বিজয়লালের মতে, ইবসেন, বার্নার্ড শ, বাট্রান্ড রাসেল, হুইটম্যান প্রমুখের রচনার মতো রবীন্দ্রনাথের রচনাও মানব চিত্তকে নবতর বৈপ্লবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। আসলে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য তো নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনে, আমাদের নতুন পথে ধাবিত করে। সমাজ, সভ্যতা পুরাতন খাত থেকে নতুন খাতে বহমানতার সূত্র পায়, কখনও কখনও যা বিপ্লবের সমতুল। তাঁর রচনায় তাই বিদ্রোহের অগ্নিশিখা পরিস্ফুট হয়। ‘বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ’ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিজয়লালের ‘রিয়ালিস্টি রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে পল্লীচিত্র’, ‘রবিতীর্থে’ বইগুলি খুবই মূল্যবান।

বস্তুত, তাঁর সম্পর্কে আরও অনেক কথা বলাই বাকি রইল। ১৯৭৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কল্যাণীর গান্ধি মেমোরিয়াল হাসপাতালে বিজয়লাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর পঁচাত্তর বছরের জীবনকালে বহুবিধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন, বহু বিচিত্র বিষয়ে লিখেছিলেন। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবর্ষকে স্মরণ করে চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়ের এহেন উদ্যোগ অবশ্যই অনুকরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই জনপদের কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো সেভাবে তাঁকে স্মরণ করেছে বলে জানা যায় নি। শুধু চাপড়া জনপদ নয়, সমগ্র নদিয়া জেলার ক্ষেত্রেই বিষয়টি বলতে হচ্ছে। অনালোচিত হওয়ার কারণে জনমনে বিজয়লাল আজ অনেকটাই বিস্মৃত— বলতে দ্বিধা নেই।
লেখক: আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
কবিকে প্রণাম জানাই।
কবিকে প্রণাম।