“শিবানী তোমার কান কোথায়? ভাস্বতী তোমার লেজ? বাণী তুমি খরগোসের চোখ কালো কেন করেছ? কতবার তোমাদের বলেছি চোখের জন্যে লাল বোতাম কিনবে। আর একি পর্ণা, আবার তুমি সুতোয় মুখ দিলে! জল আনো নি নিশ্চয়ই?”
“এনেছি দিদিমণি। ব্যাগে আছে”, পর্ণা ভয়ে ভয়ে বলে।
“ব্যাগে রাখার জন্যে তোমাদের প্রত্যেককে ছোটো শিশিতে করে জল আনতে বলিনি? যাও ঐ সুতো কেটে ফেলে নতুন সুতো ছুঁচে পরাও।”
তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ের সেভেনের সেলাইয়ের ক্লাস চলছে। সেলাই দিদিমণি সুপ্রীতি বড্ড কড়া। তেমনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি তাঁর নজর। এমব্রয়ডারি করা রুমাল সামনে দেখার আগে উল্টে দেখবেন। সেখানে অজস্র গিঁট, সুতো ঝুললে তাঁর গম্ভীর মুখ আরো গম্ভীর হয়ে যায়। তাঁর সেলাই ক্লাসের আগে কলঘরে লাইন। সুপ্রীতি দিদিমণির নির্দেশমত বাড়ি থেকে আনা টুকরো সাবানে সব্বাই হাত ধুয়ে তবে সেলাইয়ের কাজ।
অবিবাহিতা মধ্যবয়স্কা সুপ্রীতি দিদিমণির কড়া মাড় দেওয়া নিদাগ, নিভাঁজ সাদা শাড়ি পাটপাট করে পিন দিয়ে কাঁধে আঁটকানো। কাঁচাপাকা চুল চরম শাসনে খোঁপায় বাঁধা। ক্লাস সেভেন, এইট, নাইন টেনের বয়ঃসন্ধির ছাত্রীদের কুড়ুশে, উল বোনার কাঁটায়, ছুঁচসুতোয়, এমব্রয়ডারির ফ্রেমে সপ্তাহের পাঁচটি ক্লাসে আটকে রাখতে রাশভারি হওয়া ছাড়া তাঁর উপায় নেই। তবে এই চার ক্লাসে কয়েকটি সূচিশিল্পনিপুণা মেয়ে আছে বৈকি!
ক্লাস এইটের শ্বেতার ফ্রেঞ্চনটের গোলাপ নিখুঁত। তার রান সেলাইয়ের প্রত্যেকটা ফোঁড় সমান। স্যাটিন স্টিচ স্যাটিনের মতই মসৃণ।
নাইনের অপর্ণার আবার উলকাঁটায় ঝোঁক। ক্লাস সেভেনে চারকাঠির মোজা অন্যদের মত তাকে বারবার খুলতে হয়নি। এবছর সোয়েটারের গলা বানানোর কায়দাটা একবার বোঝাতেই শিখে গেছে।
ক্লাস টেনের মঞ্জুলার হাতের আঁকা খুব সুন্দর। মাধ্যমিকের পড়ার চাপের মধ্যেও সে শাড়িতে খুব সুন্দর ফেব্রিক পেন্টিং করেছে। বড়দিদিমণি নিজে ডেকে তাকে বললেন, “তুমি এটা সরস্বতী পুজোর এক্সজিবিশনে দিও মঞ্জুলা”।
তবে ঐ হাতেগোনা কয়েকটি মেয়েরই সেলাইয়ে উৎসাহ। বাকি সবাই তথৈবচ। কেউ পয়সা দিয়ে বাইরে থেকে করায়। অন্যদের মা-মাসি-কাকিমারা ভরসা।
একথা সত্যি তারাসুন্দরী ইস্কুলে সেলাইয়ের চাপ বড্ড বেশি। হাতে সেলাই করে কাপড়ের হ্যান্ডব্যাগ, ছ-কাটের পেটিকোট, ব্লাউজ, বেবিফ্রক বানানো ছাত্রীদের রাতের দুঃস্বপ্ন। এরপরেও আছে উলের টুপি, মোজা, সোয়েটার। রুমালে হরেক রকমের স্টীচের ফোঁড় শেখা। কুড়ুশকাঠি দিয়ে লেস তৈরি। এছাড়া বড় সেলাইয়ের একটি ছোটো স্যাম্পেল তৈরি করে সেলাইয়ের খাতায় আটকানো। সুপ্রীতি বসু মানেন সেকথা। অনেকবার বড়দিদিমণির সঙ্গে সে বিষয়ে কথাও বলেছেন। উনি ইস্কুলের এই সেলাইয়ের ঐতিহ্য ভঙ্গ করতে নারাজ। মাথা নেড়ে বলেছেন, “না সুপ্রীতিদি। সেলাইয়ে আমাদের স্কুলের এত নামডাক! সরস্বতী পুজোর এক্সজিবিশনে কত লোক মেয়েদের হাতের কাজের প্রশংসা করে বলুন তো!” তাই সেই আদ্যিকাল থেকেই তারাসুন্দরী বিদ্যালয়ের বালিকাদের সূচীশিল্পনিপুণা করার প্রয়াস চলেই আসছে।
অন্য অনেকেরই মত ক্লাস নাইনের ফার্স্ট গার্ল জয়শ্রীরও সেলাইয়ের নামে জ্বর আসে। পড়াশোনায় তুখোড় মেয়েটি অন্য দিদিমণিদের চোখের মণি। কিন্তু সুপ্রীতিদি খানিকটা তাকে সমঝে চলেন। তাঁর ক্লাসের আগে হাত ধোওয়ার নাম করে সে গোটা ইস্কুলে একবার চক্কর মেরে আসে। আধঘন্টা কাটিয়ে সে যখন সেলাই ক্লাসে ঢোকে, তখন সুপ্রীতিদি এক একদিন চোখ পাকিয়ে বলেন, “এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি?” জয়শ্রীর নির্বিকার উত্তর, কলঘরে লাইন পড়েছিল দিদি বা লাইব্রেরিতে ছিলাম। সেলাই দিদিমণি এই মিথ্যে আর সূক্ষ্ম অপমানটুকু ঢোঁক গিলে হজম করেন।
শিখা, জয়ন্তী, মণিকারা জ্বলতে থাকে। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, “দেখেছিস, পড়াশোনায় ভালো বলে জয়শ্রীর সাতখুন মাফ।”
সারাবছর এসব নিয়ে ভাবতে জয়শ্রীর বয়ে গেছে। সেলাই ফোঁড়াই নিয়ে ভাবনার জন্যে তো মা আছে। সারারাত জেগে মা উলের ঘর বোনে। কুড়ুশের লং আর চেন দিয়ে পেটিকোটের লেস তৈরি করে। মুশকিলটা হয়, সেলাই পরীক্ষার সময়। তখন ঐ তিনঘন্টা সময়ের মধ্যে বানিয়ে ফেলতে হয় একটা কাপড়ের ছোটো ব্যাগ, উলের মোজা, টুপি অথবা চার পাঁচটা কঠিন স্টীচ দিয়ে রুমালের নক্সা। মা অবশ্য ঘেঁটি ধরে সবটা শিখিয়ে দেয়, “এই এদিকে আয় ঝিমলি। গুজরাটি স্টিচটা শিখে নে। তোর ফ্রেঞ্চনটের গোলাপটাও কেমন ছেতড়ে যায়! দেখিস, এবারে তোদের পরীক্ষায় চারকাঁটার মোজা করতে দেবেই।”
সেলাইয়ের নম্বর টোটাল নম্বরের সঙ্গে যোগ হয় বলে জয়শ্রীকে ঘাড় গুঁজে এসব শিখে নিতেই হয়। তবুও সেলাই পরীক্ষার দিন সে ম্যানেজ করতে পারে না। পরীক্ষার শেষ সময়টুকুতে কেঁদেকেটে একসা হয়। তিনঘন্টা সময় যে কিভাবে উল-কাঁটা, ছুঁচ-সুতোয় জড়িয়ে মরিয়ে কেটে যায়, জয়শ্রী তা ধরতেই পারেনা।
ক্লাস টেনের ফাইনাল পরীক্ষার আগে ফেব্রিকের আঁকা শাড়িটা কোনোরকমে অর্ধেকটা করে টেঁকেটুকে জমা দিয়েছিল। আবার তলব ইস্কুলে। সুপ্রীতিদি বকলেন, “একি করেছ জয়শ্রী! শাড়িটা পুরোটা শেষ করনি! জানোনা ফাইনাল পরীক্ষায় এক্সটার্নাল আসেন, তিনি শাড়িটা পুরো দেখতে চাইলে তখন কি করবে? যাও বাড়ি নিয়ে গিয়ে সবটা শেষ কর।”
ব্যাজার মুখে হাতে শাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে জয়শ্রী ভেবেছিল, বাপরে, কোনোরকমে এটা শেষ করতেই হবে! তারপর জীবনে সুপ্রীতিদি আর সেলাইয়ের ধারেকাছে থাকা নেই!
তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী হয়েও সূচিশিল্পনিপুণা হবার ইচ্ছে তো ছিলই না জয়শ্রীর। বিয়ের বিজ্ঞাপনে এমন বিশেষণ যোগ করারও কোনো প্রয়োজন ছিলনা তার। একের পর এক স্কুল-কলেজের পরীক্ষাগুলো সাফল্যের সঙ্গে টপকে গিয়ে সে একটি কলেজের কেমিস্ট্রির অধ্যাপিকা। পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢোকার পর বিয়ে এবং সন্তান ধারণ করতে তার বেশ খানিকটা দেরীই হয়ে গেছে।
একটা সময় সন্তানধারণ করার জন্যে মরীয়া হয়ে গেছিল জয়শ্রী। তখন শহরের বিখ্যাত গাইনোকলোজিস্টের চিকিৎসা এবং পরামর্শমত বেশ কিছুদিন থাকতে হল তাকে। তারপর এক শীতের সকালে ফুটফুটে মেয়ে নিয়ে নার্সিংহোম থেকে যখন বাপের বাড়িতে পৌঁছল, তখন সবার মুখে স্বস্তির হাসি।
ধূমধাম করে মেয়ের ষষ্ঠীপুজো হল। এরপর একদিন জয়শ্রীর মা হানিকোম্ব করা একটি গোলাপি রঙের বেবীফ্রক, দুটি ছোট্ট ছোট্ট বাসন্তী রঙের উলের মোজা আর সাদা রঙের উলের টুপি বার করে জয়শ্রীর সামনে রেখে বললেন, “দ্যাখতো ঝিমলি এগুলো চিনতে পারিস কিনা!”
আনন্দে বিহ্বল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল জয়শ্রী, “কোথায় ছিল মা এতদিন এগুলো? তুমি এসব যত্ন করে রেখে দিয়েছিলে? এইতো আমার ক্লাস সেভেনে করা টুপি! এটা আমি শুরু করে ধৈর্য্য হারালাম আর তুমি শেষ করলে। মনে আছে মা, চারকাঁটার উলের মোজা শিখতে আমার কালঘাম ছুটে গেছিল! ক্লাস টেনে এই বেবিফ্রকটাতো তুমি পুরোটাই করেছিলে। শেষে বকে বকে আমাকে দিয়ে বুকের এই হানিকোম্ব স্টিচটা করালে।
“ওহ, সেলাই নিয়ে একসময় কি নাটকটাই না করেছি। তোমাকে কি জ্বালান জ্বালিয়েছি!”
ঝিমলির মেয়ে এতসব কিছু না বুঝেই মা-দিদিমার হাতে তৈরি গোলাপি বেবিফ্রক পরে একগাল হাসে। হলুদ রঙের ছোট্ট দুটি মোজা পরা পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলা করে। মেয়ের এই উচ্ছ্বাস প্রাণ ভরে দেখতে দেখতে এতদিন পরে ঝিমলির সুপ্রীতিদিদিমণিকে মনে পড়ে গেল। আচ্ছা সেলাইদিদিমণিও কি বাচ্চাদের মোজা, টুপি বানানো শেখাতে শেখাতে কোনো স্বপ্ন বুনতেন….?
চারকাঁটার উলের মোজা মায়ের কাছে আর একবার ঝালিয়ে নিল ঝিমলি।
এখন সে আপনমনে মেয়ের জন্যে আরেক জোড়া উলের মোজা বানাচ্ছে।
আমার স্কুল জীবনের প্রতিটি সেলাইয়ের ক্লাস বাড়িতে প্রতিটি সেলাই করা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সত্যি বলতে কি সেলাই টা করতে আমি খুব ভালোই বাসতাম ।এখনো তাই…
সেলাই দিদিমণির ছবিটা চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে উঠলো… ওনাকে কখনো ভয় পাইনি…. অনেক ভালোবাসা পেয়েছি।
.
♥️????
খুব ভালো লাগলো…শেষটুকুতে দিদিমণির স্বপ্ন বোনার ভাবনাটা গহীনে গিয়ে ছূঁলো…!!!!
এই ছোট্ট অনুভূতিটুকুও তুমি যে ছুঁয়ে যেতে পারলে,সেজন্যে অনেক ভালোবাসা।