মন্ডপ সজ্জায় সত্যজিৎ রায়। মন্ডপ শিল্প নির্দেশকের ভাবনায় চলচ্চিত্র শিল্প নির্দেশক। এবারের আসন্ন শারদ উৎসবে এমনই অভিনব ও আকর্ষণীয় মন্ডপ সজ্জায় উঠে আসতে চলেছে প্রবাদ প্রতীম চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন চলচ্চিত্রের চরিত্রেরা। সম্প্রতি জন্মশতবর্ষ পার হওয়া সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রকে নিয়েই এবার পূর্ব মেদিনীপুরের মহকুমা শহর কাঁথির এক বিগ বাজেটের পুজো মণ্ডপের মন্ডপ শৈলির দায়িত্ব নিয়েছেন কাঁথির মন্ডপ শিল্প নির্দেশক সুতনু মাইতি। মন্ডপ সজ্জায় সুতনুর শৈলিতে উঠে আসতে চলেছে বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’, ‘গুপী গায়েন, বাঘা বায়েন’ থেকে ‘সোনার কেল্লা’, ‘হীরক রাজার দেশের নানান দৃশ্যপট। ‘পথের পাঁচালি’র অপু-দূর্গা থেকে ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’-এর গুপী বাঘা থেকে স্বয়ং হীরক রাজা, হীরক রাজার গুপ্ত মন্ত্রণালয় ‘যন্তর মন্তর’ থেকে ‘সোনার কেল্লা’ সত্যজিৎ সৃষ্ট বিভিন্ন চলচ্চিত্রের চরিত্রদের।
অভিনব এই মন্ডপ সজ্জায় থাকবে অপু-দূর্গার আম পেড়ে খাওয়া, রেল গাড়ি দেখতে যাওয়া,গুপী গায়েন বাঘা বায়েনের রাজ দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন,সোনার কেল্লার মুকুল ও দুষ্টুলোকেরা, হীরক রাজার গুপ্ত মন্ত্রণালয় কুড়ি ফুট দীর্ঘ উচ্চতার স্বয়ং হীরক রাজা। এর বেশি আর কিছুই বলতে রাজি নন সুতনুবাবু। বাকিটা মন্ডপ গিয়েই দর্শকরা উপভোগ করবেন বলে মন্তব্য শিল্প নির্দেশক সুতনু মাইতির। এবারের শারদ উৎসবে সুতনু কাঁথির এই বিগ বাজেটের পুজো মন্ডপ সহ মোট আটটি মন্ডপ শৈলির কাজ করছেন। এর মধ্যে ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতেই পাঁচটি। বাকি দুটি এরাজ্যের দুর্গাপুর ও আসানসোলে।

স্রেফ বালি আঠা আর ঝিনুকের উপকরণ দিয়ে ১৯৯৬ সালে কলকাতার আহিরীটোলা সর্বজনীন শারদ উৎসবে অপূর্ব কারুকার্যময় মন্ডপ তৈরি করে সকলকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। ক’খানা বাঁশের কাঠামো, গোটা কয়েক খাঁকি ত্রিপল আর লাল,সবুজ,নীল,সাদা আর মেরুন হলুদের ছোপ লাগানো ডেকোরেটারের রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি চিরাচরিত আদলের মন্ডপ সজ্জার বদলে বালি, আঠা আর ঝিনুক দিয়ে অপূর্ব কারুকার্যময় পুজো মন্ডপ তৈরি করে কলকাতার শিল্প রসিক মানুষদের শুধু চমকে দেওয়াই নয়, ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মানের স্বীকৃতি। পরের বছর আবারও চমক। এবার আহিরীটোলা সর্বজনীন আর রাজা রামমোহন সরণির চালতাবাগান লোহাপট্টির মন্ডপ সজ্জা করে আবার জিতে নিলেন জোড়া শারদ সম্মানের স্বীকৃতি। তিনি আর কেউ নন, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথির তরুণ শিল্পী নির্দেশক সুতনু মাইতি।

সদ্য চল্লিশ পেরোনো, উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ সুতনুর মহানগর কলকাতায় চলার সেই যে শুরু তা আজও অব্যাহত। গত তিরিশ বছর ধরে শারদ উৎসবে কলকাতার বিভিন্ন বিগ বাজেটের মন্ডপ গুলিতে আইসক্রিম চামচ, হোগলাপাতা, পাট, পাটকাঠি, ঝিনুক, বালি, বিভিন্ন ফলের বীজ থেকে কুশ, রুদ্রাক্ষ, সুপুরি থেকে হরিতকী বিচিত্র উপকরণ দিয়ে একের পর এক মন্ডপ তৈরি করে সুতনু শিল্প রসিকদের নজরকাড়া-র পাশাপাশি জিতে নিয়েছেন একের পর এক শারদ সম্মান। পেয়েছেন ২০০১ সালে পুজো পারফেক্ট পুরস্কার ২০০২ সালে শালিমার সমাজ কল্যাণ পুরস্কার। ২০০৭ সালে দুর্গাপুর মার্কিনি দক্ষিণ পল্লীর দূর্গাপুজো মন্ডপ অজন্তা ইলোরার আদলে তৈরি করে আনন্দবাজার ও এসিসি শারদ অর্ঘ্য পুরস্কার , ২০১৭ সালে চালতাবাগান লোহাপট্টির মন্ডপসজ্জার জন্য এম পি বিড়লা ফাউন্ডেশনের সেরা মন্ডপের স্বীকৃতি ও পুরস্কার আদায় করে নেন সুতনু মাইতি। পেয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর হাত থেকে পুরস্কার।
গত তিরিশ বছরে শতাধিক মন্ডপ সজ্জার পাশাপাশি কলকাতা ছাড়াও মন্ডপ তৈরির কাজে ছুটে গিয়েছেন ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই। আগরতলা, রাঁচি, জামশেদপুর, ছত্তিশগড়, ভুবনেশ্বর, মধ্যপ্রদেশ, মুম্বইতে। সব জায়গা থেকেই পেয়েছেন স্বীকৃতি, সম্মান আর খ্যাতি।

‘জীবনের যা কিছু ধন, কোন কিছুই যাবে না ফেলা’-তাঁর শিল্পের এটাই মূলমন্ত্র। তাই খেজুর ও নারকেল পাতা, নারকেলের মালা, শাঁস, পাট, হোগলাপাতা, পাটকাঠি, ঝিনুক, বালি, বিভিন্ন ফলের বীজ থেকে কুশ, রুদ্রাক্ষ, সুপুরি থেকে হরিতকী এমনকী ঘুঁটের ছাই বিচিত্র সব বনজ উপকরণ দিয়ে একের পর এক মন্ডপ তৈরি করে সুতনু শিল্প রসিকদের নজর কাড়া-র পাশাপাশি জিতে নিয়েছেন একের পর এক শারদ সম্মান। সুতনু মাইতির শিল্প নিয়ে কোন পুঁথি বিদ্যা নেই, দাদা সুদীপ মাইতি, জ্যাঠা প্রকৃতি মাইতি বা কাকা প্রনবেশ মাইতির মতো আর্ট কলেজেও পড়েননি কোনও দিন। তবুও মনের ভাবনায় একের পর এক শিল্পশৈলি সমৃদ্ধ মন্ডপ সজ্জায় আজ রাজ্যের প্রথম সারির একজন মন্ডপ শিল্প নির্দেশক কাঁথির সুতনু মাইতি। কাঁথি থেকে কলকাতা, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে, দৌড় শেষ করতে রাজি নন সুতনু। মনের গোপনে লালন করেন আরও একটি স্বপ্ন। দূর বিদেশের কোনও প্রবাসী ভারতীয় অধ্যুষিত শারদোৎসবে একদিন তাঁর তৈরি স্বপ্নের মন্ডপ টেনে আনবে দর্শকদের, এমন স্বপ্নই এখন দেখতে ভালোবাসেন বাংলার মন্ডপ শিল্প নির্দেশক সুতনু মাইতি।
সুব্রত বাবু আপনি খুব সুন্দর ভাবে সূতনু মাইতি বাবুর শিল্পকলা তুলে ধরেছেন। সত্যি উনার ভাবনার কোনো ব্যাখ্যা নেই শুধু বলবো আপনি কিছু গুনি মানুষকে সবার সামনে তুলে ধরেন। অনেক শুভেচ্ছা। উনার জন্যে রইলো শুভামনা।????