আমাদের চড়কডাঙা কলোনি গ্রামটি মালদা জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত বামনগোলা ব্লকের মালদা-নালাগোলা রোডের দুই পাশে পূর্ব-পশ্চিমজুড়ে বেড়ে উঠেছে। ১৯৭৯-তে এখানে কলোনি গড়ে ওঠে। স্থানটি আসলে চড়কডাঙা। নতুন কলোনির নাম হয় গঙ্গাপ্রসাদ কলোনি। উত্তরের চড়কডাঙার বিস্তৃতির সঙ্গে দক্ষিণের গড়ে ওঠা কলোনি মিলে চড়কডাঙা কলোনির অস্তিত্ব ক্রমশ বাসস্ট্যাণ্ড থেকে হাটবাজার-গ্রামপঞ্চায়েত অফিস, কেজি স্কুল নানাভাবে এলাকার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেই কলোনির স্বপ্নদেখা মহৎপ্রাণ ননীগোপাল বিশ্বাস (১৯৪৫-২০২০) অস্তগামী সূর্যের মতো চিরঘুমের দেশে নীরবে চলে গেলেন (২৭ সেপ্টেম্বর)। এতদিন স্বপ্ন দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কেননা স্বপ্নের চেয়ে সেখানে যে দুঃস্বপ্নের নিবিড় হাতছানি। তার পরেও তিনি স্বপ্ন দেখতেন, আগামীর প্রতি বিশ্বাস রাখতেন, ভেবে কূলকিনারা না পেলেও মানুষের মঙ্গলকামনা থেকে বিরত হতেন না।
স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিজেও দুঃস্বপ্নের শিকার হয়েছেন নানাভাবে। অথচ তার পরেও থেমে থাকেনি তাঁর স্বপ্নের পানসি। অবশ্য ক্লান্ত মনেরও তো বিরতি চাই। বিধাতা বোধ হয় এজন্য তাঁকে চিরনিদ্রার দেশে বিরতিযাপনে নিয়ে গিয়েছেন। যখনই গ্রামে ফিরে গিয়েছি, তখনই ছুটে এসে এলাকার সমস্যা থেকে দেশ ও রাজ্যের রাজনীতি নিয়ে তাঁর তীব্র কৌতূহলে অবাক হয়ে যেতাম। নিয়মিত খবর শুনতেন, টিভি দেখতেন। চোখ-কান খোলা রাখতেন। নিজের ভাবনাগুলো আমার কাছে এসে ঝালিয়ে নিতেন। তাঁর মতো এরকম ক্ষুদ্র জনপদে থেকে এভাবে দশ ও দেশের খবর রাখতে গিয়ে মানুষের মঙ্গল কামনায় স্বপ্নে বিভোর হওয়ার বিষয়টিই আমাকে ভাবিয়ে তুলত। ক্ষুদ্রের বৃহৎ হওয়ার স্বপ্ন যখন সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুঁজে পায় না, তখন তা আর প্রাণিত করে না।
একসময় ক্ষুদ্রের ক্ষুদ্রত্ব মেনে নিয়েই বেঁচে থাকার প্রয়াস আপনাতেই অভ্যাসে পরিণত হয়। ননীগোপাল বিশ্বাস সেখানেই ব্যতিক্রম। দারিদ্রে ক্ষতবিক্ষত জীবনেও তাঁর স্বপ্ন দেখায় বিরতি ছিল না, চোখ না বুঝেই তিনি স্বপ্ন দেখে যেতেন, অক্ষমতার মধ্যেও স্বপ্নকে আগলে রাখতেন। তাঁর একদিকে দারিদ্রের ছোবল, অন্যদিকে ছাপোষা বাঙালির দীনহীন জীবন। অথচ তার মধ্যেই তাঁর স্বপ্নদেখার প্রয়াস। বয়সের ভারও তাঁকে নতজানু করতে পারেনি। বার্ধক্যের দিকে যতই এগিয়েছেন, ততই তাঁর মধ্যে তারুণ্যের বেগ এসেছিল। মানুষের জন্য কিছু করার তীব্র আর্তি তাঁকে জীবনের উপান্তেও সক্রিয় করে তুলেছিল। জীবনের উত্তরণে তাঁর সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিল না। ‘আমার এখন কী করা উচিত’ এই ছিল জীবনজিজ্ঞাসা। ত্যাগ ও সেবার আদর্শে মানুষের পাশে থাকার কথা শুনেও তাঁর কৌতূহল যেত না। কী ভাবে সে পথে নিজেকে চালিত করা যায়, সে নিয়েও বিশদে জেনে নেওয়ার প্রয়াস ছিল তাঁর। এজন্য ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস রেখেও মানুষের মধ্যে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন আজীবন। তাঁর জীবনই তাঁর জীবনদর্শন গড়ে তুলেছিল।
দেশভাগের বলি হয়ে ননীগোপালের এদেশে আসা। তারপর ছিন্নমূল জীবনে ভেসে চলা। পরিবারবিচ্ছন্ন হয়ে নতুন বৌকে নিয়ে দীনহীন অবস্থায় আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নিতে নিতে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে কোনোরকমে বেঁচেবর্তে ছিলেন। অবশেষে কলোনিতে নিজের আশ্রয় খুঁজে পাওয়ায় সেখানেই তাঁর স্থায়ী বসতি। শুধু তাই নয়, স্থায়ী আবাসের পাশাপাশি জুটে গেল প্রত্যাশিত মান এবং খুঁজে পেলেন নিজের মন। মেহনতি মানুষের দল সিপিএম-এ ভিড়ে গেলেন। গরীব মানুষের প্রতি সম্মানের জন্য আজীবন তিনি সেই দলের কর্মী ছিলেন। অথচ কোনোদিন ভোটে দাঁড়ানি, মেলেনি সরকারি মহার্ঘ প্রাপ্তি। উল্টে সেই দল করায় জুটেছে নানা লাঞ্ছনাগঞ্জনা, পারিবারিক অশান্তি। আবার যখন ক্ষমতা হারিয়ে দলের লোকজন অন্য দলে ভিড়েছে, তখনও তিনি সেই দলে অবিচল ছিলেন। কিছু বললেই বলতেন, সেই দল যে তাঁকে ‘মান’ দিয়েছে। যেভাবে তিনি আদর্শে আমৃত্যু অবিচল ছিলেন, তাতে যে ‘মান’ পেয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি মূল্য দিয়েছেন। যে-মুখে বিজাতীয় ‘কমরেড’ শব্দটিকে আত্মীয়বোধে আপন করে নিয়েছিলেন তিনি, সেই মুখেই আবার অবিরত ঠাকুরের নাম-গুণগান করে চলতেন। বাড়ির মন্দিরে নিয়মিত পূজার্চনা করেছেন, ধর্মশাস্ত্র পাঠেও তার ক্লান্তি নেই। শুধু তাই নয়, নিয়মিত কীর্তন করে বেড়াতেন।
কলোনিতে কীর্তন মানেই গোপাল বিশ্বাস। মতুয়া ধর্মের প্রতি তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। অথচ কোথাও তাঁর গোঁড়ামি ছিল না। সর্বত্র তাঁর অবাধ বিচরণ। কলোনির সূচনাপর্বে চড়কডাঙায় রোডের ধারে আমার বাবা হীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল মাইল তিনেক পশ্চিমদিকের ধামোর গ্রাম থেকে এসে বসবাস শুরু করেন। বাবা ছিলেন এলোপ্যাথিক চিকিৎসক। ভালো পসার হতে পারে বলে সেখানে আসা। এমনিতে সে এলাকাটি ছিল ভয়ঙ্কর। দিনেদুপুরেই দু-পা ফাঁক করে ছিঁড়ে ফেলার ভয় জেগে থাকত সর্বদা। চারিদিকে দূরান্তে পাড়াগাঁ, মাঝখানে ছিন্নমূল দারিদ্রপীড়িত অসহায় নানা সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি। সেখানে এসে মস্তানি, দাদাগিরি করার হাতছানি। সেই ভয়ার্ত পরিসরে গড়ে ওঠা চড়কডাঙা কলোনিকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন আমার বাবা। সেই সময়ে কলোনির যে-কয়েকজন নেতৃত্ব দিতে বাবার পাশে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে গোপাল বিশ্বাস ছিলেন অন্যতম। লোকের কাছে গোপাল নামেই সুপরিচিত ছিলেন। বাবার সঙ্গে তাঁর পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একজন ডাক্তারদা, অন্যজন গোপালদা। সেই সূত্রে তিনি ছিলেন আমার কাকা। বাবা যখন বারে মাসে তেরো পার্বণ থেকে মেলা, যাত্রাগান, কবিগান প্রভৃতি আয়োজনের মাধ্যমে জনসংযোগে কলোনির আলো ছড়াতে সক্রিয় হয়েছিলেন, সহযোদ্ধা হিসাবে তিনি তাঁর পাশে থাকতেন। কলোনি জেগে উঠল, বাবা বছরদুয়েক রোগে ভুগে চৌত্রিশ বছর বয়সে অকালে (১৯৮৪-এর ১৬ মে) চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়লেন। গোপালকাকু মুষড়ে পড়লেও তাঁর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। যে-কারণে তাঁর মধ্যে নতুন করে বেঁচে ওঠার তাগিদের অভাব কোনো দিন ছিল না।
অভাবের সংসার তাঁর মুখে হাসি কেড়ে নিতে পারেনি। সংসারের অভাব মেটাতে চাষবাসের পাশাপাশি ডিমের ঝুড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফিরেছেন, সব্জি বিক্রির জন্য হাটে বসেছেন, একসময় কিছুদিনের জন্য ঘুঘনির দোকানও করেছেন। ডিমওয়ালা বলে তাঁর পরিচিতি তাঁকে কখনও হীনমন্যতায় ভুগতে দেখিনি। বরং কারও দুঃখের কথা শুনলে তার পাশে গিয়ে বসতেন, সান্ত্বনা দিতেন, স্বপ্নও দেখাতেন। আবার কারও সাফল্যের কথা শুনলে তার শুধু প্রশংসা করতেন না, সেই প্রশংসা বয়েও বেড়াতেন। পাড়াগাঁ ঘুরে তাঁর ডিমের ঝুড়িটিতে শুধু ডিমে ভরে উঠত না, কত লোকের সুখদুঃখও জায়গা করে নিত, তার ইয়ত্তা নেই। পারিবারিক জীবনে নানাভাবে জর্জরিত হয়েও কখনও হতাশ হয়ে অবসাদে ভুগতেন না। বলতেন, ‘ঠাকুর একভাবে রাখবেন, সবই ঠাকুর ভরসা’। তাঁর বিশ্বাসে ফাঁক ছিল না। এতো শুধু ঈশ্বর বিশ্বাস নয়, নিজের প্রতিও গভীর আস্থা।
সেই আস্থা থেকেই তাঁর বৈষম্যপীড়িত সমাজের মধ্যে থেকেও সুদিনের স্বপ্নদেখা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বাতিক তাঁকে পেয়ে বসেছিল। এজন্য সত্তরের উপরে বয়সেও গোপালকাকুর মানুষের জন্য কিছু করার সদিচ্ছায় কোনোরকম ভণ্ডামি ছিল না। সাংসারিক দায় নির্বাহে যে মানুষটি অনেকটাই শিথিল, সেই মানুষটিই আবার মানুষের সেবায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মনিবেদন করেছেন। বাবার অবর্তমানে আমার শ্রীবৃদ্ধিতে তাঁর সন্তানের সাফল্যের চেয়েও বেশি আনন্দ, বেশি উচ্ছ্বাস। আমার কাছে এলেই তাঁর মানুষের সুখদুঃখ নিয়ে কত কথা, রাজনীতি-ধর্ম নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। আর সবার চেয়ে বড় হয়ে উঠত, ‘আমার এখন কী করা উচিত?’ জীবনের অপরাহ্নবেলায় এরূপ প্রশ্নেই বুঝিয়ে দেয়, তাঁর জীবনীশক্তি কত অফুরান ছিল। যে প্রশ্ন যৌবনকে আলোকিত করে (যৌবনে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘এ জীবন লইয়া আমি কী করিব ?’ সকল আত্মসচেতন মানুষেরই প্রশ্ন।), সেই অনির্বাণ প্রশ্ন নিয়ে বৃদ্ধ গোপালকাকুর স্বপ্নযাত্রায় বিস্মিত না-হয়ে পারিনি। বাড়িতে পূজার্চনা করে, বাইরে নিয়মিত কীর্তনে নেতৃত্ব দিয়ে বা পার্টির কাজে সামিল হয়েও তাঁর মনে স্বস্তি ছিল না। মানুষের হিতের জন্য কিছু করার তাগিদ তাঁকে কুরে কুরে খেত। এজন্য তাঁকে আমি মানুষের সেবায় সরাসরি আত্মনিয়োগ করার কথা বলতাম। আজও দীনহীন অসহায় মানুষ সমাজের উচ্চস্তরের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। মানুষের মর্যাদাটা টুকু পায় না। এজন্য বছর সাতেক (২০১০-২০১৭) প্রতিবছর স্বামীজির জন্মদিনে তাঁর আদর্শকে পাথেয় করে ‘স্বামী বিবেকানন্দ সাংস্কৃতিক মঞ্চ’ তৈরি করে ‘মানুষ পূজা’য় ব্রতী হয়েছিলাম।
গোপালকাকু সেই মঞ্চের সভাপতি। তাঁর সে কি উৎসাহ, যেন অনেকদিন পরে একটি মনের মতো কাজ পেয়েছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাঁদাসংগ্রহ, লোককে আমন্ত্রণ, হতদরিদ্র ভিক্ষাজীবী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ, দুঃস্থ ছাত্রছাত্রী, সমাজবন্ধুদের আতিথ্য সহকারে আনার ব্যবস্থা থেকে রান্নার ব্যবস্থার সঙ্গে মঞ্চের চৌকি মাথায় করে আনায় তাঁর ক্লান্তিহীন নিরভিমান কর্মতৎপরতাই তাঁকে সে-পূজার পুরোহিত করে তুলেছে। আবার সভাপতি হিসাবে বক্তব্য রেখেছেন, তখনও তাঁর মধ্যে কোনোরকম জড়তা নেই, আগামী বার আরও ভালো করে করার প্রতিশ্রুতি প্রাণোচ্ছ্বাসে বেরিয়ে এসেছে। যেখানে আধুনিক ভোগবাদী সমাজে মানুষের স্বার্থপরতা জাঁকিয়ে বসেছে, সেখানে দারিদ্রের আস্ফালনে বা সুখের হাতছানির মধ্যে নিজের পরিবারের দিকে মন না দিয়ে অন্যের সেবায় স্বপ্নদেখা হয় বাতুলতা, নয় বিলাস। সেখানে গোপালকাকুর জীবনের স্বাদ সেই স্বপ্নে মিলিয়ে গিয়েছিল, তাঁর ঈশ্বর ঠাকুরঘর ছেড়ে ব্রাত্য মানুষে একাত্ম হয়েছিল। সেজন্য স্বপ্নদেখাই ছিল তাঁর জীবনের পরশ। আর তা পূরণেই তাঁর অন্তহীন জীবনজিজ্ঞাসা, ক্লান্তিহীন পথচলা আমাকে বিস্মিত করেছে। এমন স্বপ্নদেখা মানুষটি চিরঘুমে গেলেও তাঁর প্রশ্নগুলো আমার কাছে যে জেগে থাকবে চিরকাল।
কৃতজ্ঞতা : গৌরাঙ্গ বিশ্বাস।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
খুব ভালো মনের মানুষ। শ্রদ্ধা এবং প্রণাম।