একটি বিষয়ে তেমন কোনও লেখালেখি চোখে পড়ে না। দুর্গাপূজার সঙ্গে রথযাত্রার সম্পর্কটি আসলে কী? কেন এই বিশেষ দিনটিতে বনেদি বাড়ির পূজায় মৃৎশিল্পীরা দুর্গাপ্রতিমার কাঠামো পূজা করেন ও বারোয়ারি পুজোর খুঁটিপূজায় অংশ নেন সেলিব্রিটিকুল, তা বেশ রহস্যাচ্ছন্ন। দুর্গাপূজার মাঠে বলটি যে গড়ানো হলো, তার জন্যে আস্ত একটি রথযাত্রার দরকার কেন হল? অন্য কোনও পার্বণে কেন হল না? বাঙালির পাব্বনের তো অভাব নেই। কথায় আছে, বারো মাসে তেরো পার্বণ।
রথের রশিতে টান দেওয়া নাকি খুবই পুণ্যের কাজ। পাড়ার রথের রশিতে এবারেও হাত ঠেকিয়েছি, তবে বাড়ির কাছেই মাহেশের রথ বা পুরীর রথের রশিতে হাত ঠেকানো এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। হুতোম প্যাঁচার নকশায় স্নানযাত্রা পর্বে গুরুদাসবাবু ইয়ারবন্ধু সমভিব্যাহারে বাগবাজারের ঘাট থেকে নৌকা করে রিষড়ার ঘাটে নেমেছিলেন মাহেশে জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবেন বলে। তিনিও কি সবান্ধব রথের রশিতে হাত ঠেকাতে পেরেছিলেন আষাঢ়ের শেষ লগ্নের রথযাত্রায়? তবে শ্রাবণে গঙ্গায় ইলিশ মাছ ওঠার আগে ঢেলাফেলা পার্বণে তিনি দু-মাসের মাইনেই খরচা করে ফেলেছিলেন। মনসার পুজোয় এত খরচ কীসে হল, তা অবশ্য জানা যায়নি।
রথের রশি ধরার আগ্রহ কোনও বয়সের হিসেবে মেলে না। আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষই জীবনে একবার অন্তত রথের রশি ছোঁয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। রশি একবার ছোঁয়ামাত্রই ভক্তদের অপার আনন্দের ভাব ফুটে ওঠে চোখে-মুখে। তা সে পাড়ার রথ, পুরীর রথ বা মাহেশের রথ, যাই হোক না কেন! পাড়ার ছোটছোট ছেলেমেয়েদের রথ হোক বা ইসকনের রথের রশি ছোঁয়ার জন্যই হোক, বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে জনতা অসম্ভব কৌতূহলের সঙ্গে অপেক্ষা করে থাকেন একবার রথের রশি স্পর্শ করার জন্য। কথিত আছে, রথে বসেই ভক্তদের দর্শন দেন মহাপ্রভু জগন্নাথ। তাই জগন্নাথ দেবকে একবার দর্শন পাওয়ার জন্য, আশীর্বাদ পেতে চোখের দেখাই নয়, ছুঁয়ে দেখতে চান ভক্তরা। তাই রথ উপলক্ষ্যে জীবনে একবার অনন্ত শ্রীক্ষেত্রে রথযাত্রায় সামিল হতে হাজারে হাজারে মানুষ ভিড় করেন।
মহাপ্রভু জগন্নাথের রথ টানা ভাগ্যের ব্যাপার। তাই রথের রশি ছোঁয়ার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। পুরীর রথযাত্রা বিশ্ববিখ্যাত। আমরা যাকে রশি বলি, ওড়িশায় ওড়িয়া ভাষায় ‘দৌড়ি’ বলা হয়। দড়িকে সর্পের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। জগন্নাথদেবের রথের প্রতিটি অংশই অত্যন্ত পবিত্র। তাই রথ ও রশি ছোঁয়ার আকুল চেষ্টা দেখা যায় ভক্তদের মধ্যে। শুধু তাই নয়, ভক্তদের বিশ্বাস, জগন্নাথদেবের রথের রশি টানা বা ছোঁয়া অত্যন্ত শুভ। রশি ছুঁলেই সব ধরনের পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাই তেত্রিশ কোটি ভগবান ওই রথে বিরাজ করেন। সঙ্গে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরামের অবস্থানও থাকে। তাই রথের পাশাপাশি রথের রশি ছোঁয়া তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীকে স্পর্শ করার সামিল। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রবল আগ্রহের সঙ্গে রথ টানা ও রশিকে অন্তত একবার স্পর্শ করতে চেষ্টা করেন।
জগন্নাথদেবের সেবায়ত গোপীনাথ মহাপাত্র বংশপরম্পরায় বহু বছর ধরে পুরীর মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। রথের রশি ছুঁলে ভক্তরা কী কী লাভ করেন, এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি সহজভাবে বলেছেন, রথের রশি স্পর্শ করলে সব পাপ যেমন ধুয়েমুছে যায়, তেমনি এর থেকে পুণ্যের আর কিছু হয় না। সকলেরই একবার করে রশি বা রথ স্পর্শ করা উচিত। তাতে ভক্তদের পুণ্যলাভ হয়, সব পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়, মনপ্রাণ পবিত্র হয়ে যায়। রথের রশি স্পর্শ করার সময় ভক্তিভরে জগন্নাথদেবকে প্রণাম করলেই পুণ্যার্জন হয়। শ্রীপ্রভুর আশীর্বাদ পাওয়া যায় এতেই। সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে মানুষের ভক্তি। ফলত জগন্নাথদেব আশীর্বাদ বর্ষণ করেন।
অনেকেরই মতে, পুরাণ অনুযায়ী, জগন্নাথের রথে দড়ি স্পর্শ করলে পুনর্জন্মের কষ্ট ভোগ করতে হয় না। তাই রথ দর্শন করার পরই দড়ি ধরে টান দিতে পারলে পুণ্যলাভ করেন ভক্তরা। আসলে জগন্নাথদেব রথে বামন অবতার হিসেবে অধিষ্ঠান করেন। তাই রথের রশি ধরে টান দেওয়ার মত পবিত্র কাজ আর দ্বিতীয় নেই। অনেকের মতে, রশি স্পর্শ করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। শুধু পুরীর বা মাহেশের রথ নয়, পাড়ার ছোটছোট ছেলেমেয়েরা যখন ছোট-বড় রথ নিয়ে বের হয়, তখন বড়রা পাশ দিয়ে গেলে দড়ি ধরে টানার লোভ সংবরণ করতে পারেন না।
আসলে এখানেই কোটিপূজা শব্দটির মাহাত্ম্য। তেত্রিশকোটি দেবদেবী এখানে সংখ্যা নয়, তেত্রিশজন অগ্রগণ্য দেবতা। রথের রশি হাত দিয়ে স্পর্শ করলে কোটিদেবতা বা শীর্ষ দেবতাদের চরণ স্পর্শ করা যায়, কোটি অর্থ এখানে সংখ্যা নয়, কোটি মানে অগ্র বা শীর্ষ। রথে রশির সঙ্গে যেন বাঙালির আবহমানের সম্পর্ক। পাপ ধুয়ে সাফ হয়, পুণ্যের ঝুলি পূর্ণ হয়। তাই রথযাত্রার দিনই দুর্গা প্রতিমার কাঠামোপূজা, খুঁটিপূজা ইত্যাকার অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। লোকসংস্কৃতির নাড়ির খবর পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না, অনুমান করে নিতে হয়। কোটিপূজাই যে কালের ফেরে কাঠামোপূজা বা খুঁটিপূজা হয়ে গেছে, সেটাও আমার ধারণা বা অনুমানমাত্র।
শাস্ত্রে আছে —
‘কোটিপূজা ফলম লভেৎ তৎভালোৎপন্ন কৈবল্যম্’৷
শিবপুরাণেও কোটিপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, —
“সামন্তানাং জয়ে চৈব কোটিপূজা প্রশস্যতে
রাজামযুতসংখ্যং চ বশীকরণকর্মণি।”
উড়িষ্যাবাসী কবি সারলা দাস লিখেছেন, —
‘কলিকাল ধ্বংসন ভোগেণ কোটিপূজা’।
প্রণমিতে খটই দেবাদিদেব কপিলেশ্বর মহারাজা।
উড়িষ্যার কবি ‘কোটিপূজা’ শব্দটি ব্যবহার করে প্রমাণ রেখে গেছেন জগন্নাথের রথযাত্রা ও রথের রশির মাহাত্ম্যের। খুটিপুজোর নিশানা ঠিকই আছে বলে মনে হচ্ছে এখনও পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন লেখায় খুঁটি পোতা না লিখে ‘খুঁটি গাড়া’ লিখেছেন। বাঙালি ‘গেড়ে বসা’ জানলেও, ‘খুঁটি গাড়া’ শুনে চমকে ওঠে। বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ খুঁটিগাড়ি বলে প্রাচীন কলকাতার একটি প্রথার কথাও পাওয়া যায়। কোটিপূজা থেকে কাঠামোপূজা আসতেই পারে। খুঁটিপূজার নেপথ্যেও কোটিপূজা আছে কিনা তা দেবা ন জানন্তি কুত মনুষ্যা!