নিজের আত্মকথা ‘মাই অটোবাইয়োগ্রাফি’-তে সোজাসুজি নিজের কথা বলতে শুরু করেন চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন। তিনি বলছেন, তাঁর জন্ম ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল রাত্রি ৮টার সময়। দক্ষিণ লন্ডনের ওয়ালওর্থ অঞ্চলের ইস্ট লেনে। কিছুদিন পরেই তাঁরা ল্যাম্বেথ-এর ওয়েস্ট স্কোয়ার অঞ্চলে চলে যান। তাঁর মা হ্যানা চ্যাপলিন মঞ্চে অভিনয় করতেন। তাঁর বাবা চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন সিনিয়র, বাড়ির কোনও দায়িত্ব পালন করতেন না। সিডনি নামের চার্লির চার বছরের বড়ো ভাইটিও অভিনয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়েন। চার্লির বেশ মনে পড়ে, রাত্রে মা বাড়ি ফিরে এক প্রস্থ পোশাক খুলতেন বাইরের ঘরের টেবিলের কাছে, বাকিটা শোয়ার ঘরে গিয়ে। দুই ভাই সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতেন, টেবিলে কেক এবং ক্যান্ডি সাজানো থাকতো। দুই ভাই বুঝতে পারতেন, আসলে মা বেলা পর্যন্ত ঘুমোবেন। দুই ভাই যাতে শোরগোল না করে, সেইজন্য টেবিলে সাজিয়ে রেখেছেন নানাবিধ লোভনীয় খাবার। হানা ছিলেন সুবরেট (Soubrette)- একরকম অভিনয় শিল্পী যিনি হাস্যরস, নৃত্যগীতে পটু। কিন্তু কিছুদিন পরেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন হানা। তাঁকে পাঠাতে হলো মানসিক অবসাদ কেন্দ্রে। আর চার্লিকে ভর্তি করতে হলো মধ্য লন্ডনের কপর্দকশূন্যদের জেলা স্কুলে।

ভিক্টোরীয় অভিনয়ে বারলেস্ক (Burlesque) ভ্যারাইটি, এইসব বিনোদনের মাধ্যম ছিল। চার্লি কাজ শুরু করেছেন খুব অল্প বয়সে। ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ার জেলায় অ্যালডারশট-এ এক বারলেস্কের আসরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন হ্যানা। তখন চার্লির মাত্র পাঁচ বছর বয়স। এর পর দাদা সিডনির হাত ধরে মার্কিন দেশের ফ্রেড কার্নো কোম্পানিতে অভিনয়ের জন্য যোগ দেন।
১৯১৪ সালে চার্লির যখন মাত্র ২৫ বছর বয়স, তখন নিউ ইয়র্ক মোশন পিকচার্স-এর সাথে তিনি চুক্তিবদ্ধ হন সপ্তাহে ১৫০ ডলারের বিনিময়ে। নির্বাক যুগ থেকেই ফিল্ম যখন টকি (Talkie) হলো, তখন অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই বুঝি ফিল্ম নাটকীয় হয়ে পড়বে। কিন্তু চার্লি সবসময়ই অত্যাশ্চর্য। ‘দ্য কিড’, ‘গোল্ড রাশ’, ‘মডার্ন টাইমস’, ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’, ‘মোসিয়ে ভেরদো-র চার্লি আর লাইমলাইট-এর চার্লি তো একেবারেই আলাদা। লাভ (Love) শব্দটা কে না ব্যবহার করেছেন। অথচ লাইমলাইট-এ চার্লি যখন বার বার লাভ শব্দটা ব্যবহার করেন, সে যেন এক মায়ামুহূর্ত গড়ে ওঠে। ওই মুহূর্তে চার্লি যেন নিয়ে আসেন তাঁর শিল্পকৃতির সাফল্য-ব্যর্থতা, জয়-পরাজয় এবং জীবনজোড়া হাসি-কান্নার দোলাচলের প্রতিটি কাহিনি। নিজের আত্মকথায় লিখেছেন, ওই মুহূর্তটি পড়ে দেখতে দেখতে নিজেও আবেগ-বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন।

এ বছর ‘ইউনাইটেড আর্টিস্টস কোম্পানি’র শতবর্ষ। এই ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন চার্লি চ্যাপলিন, ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ, ফেয়ারব্যাঙ্কস, মেরি পিকফোর্স প্রমুখ। অসংখ্য ছোটো ছবিও নির্মাণ করেছেন চার্লি। ‘দ্য ট্র্যাম্প’, ‘দ্য ভ্যাগাবন্ড’— এসব তো তাঁর ছবির নাম। চার্লি নিজেই লিখেছেন, ঢোলা প্যান্ট পরলাম (ব্যাগি), আঁটোসাঁটো কোট পরলাম, মাথায় টুপি চাপালাম, পায়ে গাবদা জুতো পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। মনে হলো, কীসের যেন খামতি। নাকের নীচে ছোট্ট ওই গোঁফ বানালাম। কে না জানে, ওই নিয়েই তো বিশ্বজয়। জার্মানির হিটলার চ্যাপলিনের হাতে আজও মার খেয়ে চলেছেন। রাশিয়ায় রেড আর্মির হাতে তাঁর পরাজয় সূচিত হয়েছিল স্তালিংগ্রাদের অবরোধের মধ্যে দিয়ে। ওই যে চ্যাপলিন বলেছেন, যে দিন তুমি মন খুলে হাসোনি, জানবে কিছু করোনি। ওই হাসি অস্ত্রেই হিটলারকে আজও উত্তম মধ্যম দেন চার্লি চ্যাপলিন। হিটলার তামাদি হয়ে গেছেন। কিন্তু ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ আজও নতুন।

চার্লির একটি ফিল্মে একটি দৃশ্য আছে যেখানে এক সীমান্তপ্রহরী ওই ভবঘুরেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে সীমান্ত পার করে দেয়। সীমান্তের এপারে আমেরিকা, অন্য দিকে মেক্সিকো। দুই সীমানার দিকে পা রেখে থপ থপ করে কোলা ব্যাঙের মতো হেঁটে যান চার্লি। আসলে এই ভবঘুরেকে কোন দেশের সীমানা আবদ্ধ করবে! তাঁর দেশ ইংল্যান্ডে তিনি ধিক্কৃত, তাঁর কাজের দেশ আমেরিকা থেকেও বিতাড়িত। চার্লি তো মারা গিয়েছেন সুইৎজারল্যান্ডে, ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। আজও বিশ্ব মানচিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ান সেই ভবঘুরে। আমরা অপলক চোখে চেয়ে থাকি আর ভাবি, তাঁর আবার দেশকালের সীমা হয় নাকি!