চার্বাক মুনি বিশ্বাস করতেন, পরকাল বলে কোনও বস্তু নেই। ইহকালই সব। তাই পরকালের জন্যে কিছু করে যাওয়া সম্ভব নয়। সব সঞ্চয় ইহকালে ভোগের নিমিত্ত। বিদ্যাসাগর জীবনের সমস্ত সঞ্চিত অর্থ জনহিতে দান করেন। শেষ জীবনে নিজের ছাপাখানা পর্যন্ত তাঁকে বন্ধক দিতে হয়। সরকারি গ্র্যান্ট বন্ধ হওয়ায় নিজের গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে তাঁকে বালিকা বিদ্যালয়গুলি চালাতে হত। সম্পূর্ণ কপর্দকহীন অবস্থায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্যে টাকার বন্দোবস্ত করতে হয় তাঁকে।
ফ্রান্সের ভার্সেই নগরে মাইকেল তখন জেলে যাওয়ার অবস্থা। বিদ্যাসাগরের পাঠানো অর্থ শেষ মুহূর্তে হাতে পেয়ে তিনি বাঁচেন। বলা যায় বিদ্যাসাগরই মাইকেলের কাছে ত্রাতা মধুসূদন হয়ে দেখা দেন।
এই যে নিজস্ব সঞ্চিত অর্থ তিনি জনহিতে বাস্তবের মাটিতে খরচ করে ফেললেন, কোনও মন্দিরটন্দির না গড়ে, তাতে তাঁর একদা বলা কথাটিরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ‘ভগবানকে দেখার জো নাই’!
তাই তিনি চার্বাকপন্থায় বিশ্বাস করতেন বলেই মনে হয়। তাঁর তৈরি করা উইলে এতজনের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা তিনি করে গিয়েছিলেন, তা বিস্মিত করে আমাদের। উইলটি একটু খুঁটিয়ে দেখলে অনেক কিছুই আমাদের হতবাক করবে।
উইলের অংশবিশেষ —
প্রথম শ্রেণী
পিতৃদেব শ্রীযুত ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ৫০ (পঞ্চাশ) টাকা।
মধ্যম সহোদর শ্রীযুত দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন ত্রিশ টাকা। তৃতীয় শ্রীযুত শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন চল্লিশ টাকা।
কনিষ্ঠ সহোদর ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিশ টাকা।
জ্যেষ্ঠা ভগিনী শ্রীমতী মনোমোহিনী দেবী দশ টাকা
মধ্যমা ভগিনী শ্রীমতী দিগম্বরী দেবী দশ টাকা
কনিষ্ঠা ভগিনী শ্রীমতী মন্দাকিনী দেবী দশ টাকা
বনিতা শ্রীমতী দীনময়ী দেবী ত্রিশ টাকা
জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীমতী হেমলতা দেবী ১৫ টাকা।
মধ্যমা কন্যা শ্রীমতী কুমুদিনী দেবী ১৫ পনর টাকা।
তৃতীয়া কন্যা শ্রীমতী বিনোদিনী দেবী ১৫ টাকা।
কনিষ্ঠা কন্যা শ্রীমতী শরৎকুমারী দেবী পনর টাকা।
পুত্রবধূ শ্রীমতী ভবসুন্দরী দেবী ১৫ পনর টাকা।
পৌত্রী শ্রীমতী মৃণালিনী দেবী পনর টাকা।
জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র শ্রীমান সুরেশচন্দ্র সমাজপতি পনর টাকা।
কনিষ্ঠ দৌহিত্র শ্রীমান যতীন্দ্রনাথ সমাজপতি পনর টাকা।
দৌহিত্রী শ্রীমতী রাজরাণী দেবী পনর টাকা।
কনিষ্ঠ ভ্রাতৃবধূ শ্রীমতী এলোকেশী দেবী দশ টাকা।
শাশুড়ী শ্রীমতী তারাসুন্দরী দেবী দশ টাকা।
জ্যেষ্ঠা কন্যার শাশুড়ী স্বর্ণময়ী দেবী দশ টাকা।
জ্যেষ্ঠ কন্যার ননদ শ্রীমতী ক্ষেত্রমণি দেবী ১০ টাকা।
মাতৃদেবীর মাতুলকন্যা উমাসুন্দরী দেবী ৩ তিন টাকা।
মাতৃদেবীর মাতুলদৌহিত্র গোপাল চন্দ্র চট্টোর বনিতা ৩ তিন টাকা।
পিতৃব্যপুত্র ত্রিলোক মুখোপাধ্যায়ের বনিতা ৩ টাকা।
পিতৃদেবের পিতৃস্বসৃকন্যা শ্রীমতী নিস্তারিণী দেবী তিন টাকা।
বৈবাহিকী শ্রীমতী সারদা দেবী ৫ পাঁচ টাকা।
মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মাতা ৮ আট টাকা।
শ্রীযুক্ত মদনমোহন বসুর বনিতা শ্রীমতী নৃত্যকালী দাসী ১০ দশ টাকা।
শ্রীযুক্ত মধুসূদন ঘোষের বনিতা শ্রীমতী থাকমণি দাসী দশ টাকা।
বারাশতনিবাসী শ্রীযুক্ত কালীকৃষ্ণ মিত্র ত্রিশ টাকা।
কালীকৃষ্ণ মরিয়া গেলে তাহার বনিতা শ্রীমতী উমেশমোহিনী দাসী ১০ দশ টাকা।
শ্রীরাম প্রামাণিকের বনিতা শ্রীমতী ভগবতী দাসী ২ দুই টাকা।
দ্বিতীয় শ্রেণী
… মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কন্যা কুন্দবালা দেবী দশ টাকা। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ভগিনী বামাসুন্দরী দেবী তিন টাকা।
বর্দ্ধমানের প্যারীচাঁদ মিত্রের বনিতা শ্রীমতী কামিনী দাসী দশ টাকা।”
দেখা যাচ্ছে বিদ্যাসাগর উইলে অবলা নারীজাতির জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন। নির্যাতিতা, নিপীড়িতা নারীদের জন্যে তিনি বেশি ব্যবস্থা রেখেছেন। কেউ যদি একে পক্ষপাতিত্ব বলেন, তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে একটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে সম্পর্ক যত দূরতর হয়েছে আর্থিক অনুদান ততই কমে গেছে। এখানে বিদ্যাসাগর কিন্তু পরিবাররপ্রথাকে প্রায়োরিটি দিয়েছেন। বসুধৈব কুটুম্বম বলে সকলের জন্যে সমান মাসোহারার বন্দোবস্ত করেননি। কার্ল মার্কস সাহেব বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক হলেও বাংলার মাটিতে তখনও তাঁর প্রচার ও প্রসার হয়নি! যদিও মার্ক্সের নজরে কলকাতা থেকে পাঠানো চিঠিটি অবশ্যই এসেছিল, যদিও সে চিঠির প্রেরকের নাম সঠিকভাবে জানা যায়নি।দয়ার সাগর হলেও ঈশ্বরচন্দ্র একটি সিস্টেমে বিশ্বাসী। তবে তিন ভাইয়ের মধ্যে শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নকে অন্য দুই ভাইয়ের থেকে মাসিক দশ টাকা বেশি দিলেন কেন, অন্যরা ৩০ টাকা পেলে শম্ভুচন্দ্র ৪০ পেলেন কেন, তা বোঝা শক্ত। মনে হয় বিদ্যাসাগরচরিত ও ভ্রমনিরাস বইটি লেখার জন্যে শম্ভুর শ্রম ও মেধাচর্চার পুরস্কার হিসেবেই তিনি অন্য ভাইদের তুলনায় মাসিক দশটাকা বেশি দেন সেজ ভাই শম্ভুচন্দ্রকে।
বিদ্যাসাগর কঠোরভাষী তথা ঠোঁটকাটা ছিলেন। বহুবিবাহকে যারা পেশা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন,তাঁদের প্রতি তিনি ছিলেন নির্দয়। তাই চারুবাক ছিলেন না কুলীন ব্রাহ্মণদের প্রতি। কিন্তু সত্যিকারের অভাবীদের জন্যেই তিনি চার্বাকদর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন।