শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের চাঁদের বুড়ি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, —
এক যে ছিল চাঁদের কোণায়
চরকা — কাটা বুড়ি
পুরাণে তার বয়স লেখে
সাতশো হাজার কুড়ি।
সাদা সুতোয় জাল বোনে সে
হয় না বুনন সারা
পণ ছিল তার ধরবে জালে
লক্ষ কোটি তারা।
চাঁদের কলঙ্ক দেখার জন্যে তো লোকে চাঁদের দিকেই তাকাবে। চন্দ্রযানের বিক্রম ল্যান্ডার চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করল এই তো সেদিন, সফ্ট ল্যান্ডিং। চাঁদের বুকে চরকা কাটা বুড়ির অস্তিত্ব কল্পনায় হলেও, চাঁদের গহ্বর, চাঁদের ক্রেটার, চাঁদের মাটি, চাঁদের নুড়িপাথর, সবই মানুষের আয়ত্তে আসছে ক্রমে ক্রমে।
চাঁদের বুকে হাট বসার কল্পনা কোনও লেখক করেননি। দেবতারা কি কখনও সেখানে হাট বসাবার চিন্তাভাবনা করেছিলেন? কোথাও পড়িনি তো। যদিও একটি কবিতায় আছে এরকম কয়েকটি লাইন,
‘মহাকাশ প্রায়শ ধূসর,
পৃথিবীর অনিঃশেষ ধূমউদ্গিরণ
লেগে আছে গ্রহ আর নক্ষত্রের গায়ে—
কোনও ধূর্ত ধূমকেতু তার তপ্ত নিঃশ্বাসবায়ুতে
ছাড়ে ভণ্ড উল্কার বুদবুদ,
এখানে ওখানে শুধু ছড়িয়ে রয়েছে,
সর্বভুক দেবতার পিকনিক স্পট।’
সে পিকনিক স্পট যে চাঁদেরর বুকেই, তা অবশ্য কবি বলেননি।
চাঁদের হাট বাগধারায়, আমরা তো ধরে নিতে পারতাম চাঁদের বুকের কোনও এক কাল্পনিক হাটের কথা বলা হয়েছে, যেখানে দেবতারা, গান্ধর্বরা কেনাকাটা করতে এসেছেন।
সেটা তো ধরা হয়নি। ধরে নেওয়া হয়েছে সোনার চাঁদ ছেলে ও তার সমতুল্য ইয়ারবান্ধবরা একসঙ্গে মিলিত হয়েছে কোথাও। সেটা কোথায়? না, বাস্তব পৃথিবীর বুকে কোনও এক অভিজাত পল্লিতে। এইখানেই চাঁদের হাট প্রবাদের গোড়ায় গলদ।
সুশীলকুমার দে প্রণীত বাংলা প্রবাদ বইটিতে চাঁদের হাট শব্দবন্ধ নিয়ে দুটি প্রবাদের দেখা পাই।
১. কুঁড়ে ঘরে চাঁদের হাট
২. চাঁদের হাট
উদাহরণ দিয়েছেন, —
‘উজ্জ্বল করেছে বাট, ঠিক যেন চাঁদের হাট’ (দাশু রায়)
‘এমন চাঁদের হাট ছাড়িয়া কোথায় পাত্র অন্বেষণ করিবে? (মদ খাওয়া বড় দায়…, টেকচাঁদ ঠাকুর)
‘এ কি চাঁদের হাট যে — ‘(নব-নাটক)
‘বলি এ চাঁদের হাট নিয়ে রওনা হচ্ছ কোথা’ (গিরিশ ঘোষের মনের মতন)
চাঁদ নিয়ে প্রচলিত বাংলা বাগধারা-প্রবাদ-প্রবচন গুলি হল-
১ : চাঁদের কলঙ্ক
২ : চাঁদে কলঙ্ক আছে, গোলাপে কণ্টক।
৩ : কাঁটা বিনা কমল নাই, কলঙ্ক বিনা চাঁদ নাই।
৪ : চাঁদের কাছে জোনাকি পোকা, ঢাকের কাছে টেমটেমি।
৫ : এক চাঁদে জগৎ আলো।
৬ : বামন হয়ে চাঁদে হাত।
৭ : আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া।
৮ : আকাশে ফাঁদ পেতে চাঁদ ধরা।
৯ : ঈদের চাঁদ।
১০ : অমাবস্যার চাঁদ
১১ : এই যদি গোরাচাঁদ তবে কালাচাঁদ কেমন।
১২ : বড়র পিরিতি বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণে চাঁদ।
১৩ : বন্ধ্যা নারীর অন্ধ পুত্র চাঁদ দেখতে পায়।
১৪ : চাঁদ-কপালে দীর্ঘ ফোঁটা, মুখে তার সরষে-বাটা।
১৫ : চাঁদ চাঁদ চাঁদা, মিথ্যে কেনো কাঁদা।
১৬ : চাঁদ দেখে কুকুর চেঁচায়, চাঁদের তাতে কিবা আসে যায়।
১৭ : চাঁদ ধরা ছেলে
১৮ : চাঁদ চাওয়া ছেলে
১৯ : চাঁদ পাওয়া ছেলে
২০ : চাঁদেও গ্রহণ ধরে।
২১ : চাঁদের আশীব্বাদ, ক্ষয় বৃদ্ধি বাঁধা।
২২ : চাঁদের গায়ে ছেপ ফেললে আপন গায়ে লাগে।
২৩ : চাঁদের গায়ে কেউ কি থুথু দিতে পারে?
২৪ : চাঁদে বুধে যারে পায়। তার ধান-ঠেইলো ন যায়।
২৫ : চাঁদের দিন, বুধের দশা।
২৬ : চাঁদের হাট।
২৭ : চাঁদের সভার মধ্যে তারা। বর্ষে পানি মুষল ধারা।
২৮ : চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল, জোনাকি ধরে বাতি; মোগল পাঠান হদ্দ হল, ফারসী পড়ে তাঁতী।
২৯ : চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল, জোনাকি ধরে বাতি; ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ গেল, শল্য হল রথী।
৩০ : চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল, জোনাকির পোঁদে বাতি; বাঘ পালালো, বেড়াল এলো ধরতে এবার হাতী।
৩১ : চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল, জোনাকির পোঁদে বাতি; ময়ূর গেল, ছাতারে এল, ফুলিয়ে বুকের ছাতি।
৩২ : চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল, জোনাকির পোঁদে বাতি; বিস্তর করলে পুত, কি করবে মোর নাতি।
৩৩ : কিসে আর কিসে, তামায় আর সীসে। চাঁদে আর মেনি-বাঁদরের পোঁদে।
৩৪ : চন্দ্র হৈতে বিষ বৃষ্টি।
৩৫ : চন্দ্রের জোৎস্নাদানে উঁচু নীচু বিচার নাই।
৩৬ : চন্দ্রের ভঙ্গিমা দেখে তেঁতুল হ’লেন বাঁকা।
পরে খোঁজাখুঁজি করে আরও বেশ কয়েকটি প্রবাদ মিলল। সেগুলো না দিলে পাঠক চন্দ্রাহত হতে পারেন, তাই এখানে দিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
০১। অভাগীর লগনে চাঁদ নাই গগনে।
০২। অভাগীর লগ্নে, চাঁদ ওঠে দখীণে।
০৩। দুষ্ট লোকের ঘরেও চাঁদের আলো পড়ে।
০৪। খাই না খাই আছি ভালো, ভাঙাঘরে চাঁদের আলো।
০৫। ভাঙ্গাঘরে চাঁদের আলো, যেদিন যায় সেদিন ভালো।
০৬। কুড়ে ঘরে চাঁদের হাট।
০৭। আস্তাকুঁড়েও চাঁদের আলো।
০৮। চার দিনকা চাঁদনী, ফির আঁন্ধেরি রাত।
০৯। চারদিনকা চাঁদনি, ফের আঁধারে রাত।
১০। সব দিন নাহি রয় নবীন যুবতী। সব নিশা নহে কভু, পূর্ণ চন্দ্রবতী।
১১। কলঙ্ক বিনা চাঁদ নাই।
১২। কণ্টকবিনা কমল নাই, কলঙ্কশূন্য চন্দ্র নাই।
১৩। বাতাসে পাতিয়া ফঁদ ধরে দিতে পারি চাঁদ।
১৪। ধান কাঠের মই বেয়ে চাঁদ পেড়ে আনা।
১৫। যদি আকাশ নামে তবে চাঁদে চড়বো।
১৬। লাফিয়ে চাঁদ ধরতে চায়।
১৭। হাথ বাঢ়ায়িলে কি চান্দের লাগ পাই। (হাত বাড়ালেই চাঁদকে স্পর্শ করা যায় না।)
১৮। পিঠে কুজ চাঁদ দেখার সাধ।
১৯। সূর্যের আলোয় চাঁদ লুকায়।
২০। তিনটি জিনিষ বেশিদিন লুকিয়ে থাকে না- চন্দ্র, সূর্য ও সত্য।
২১। কুকুরের চীৎকারের প্রতি চন্দ্র কর্ণপাত করেন না।
২২। সহস্র নক্ষত্র কি চন্দ্রের সমান!
২৩। এক চন্দ্রই যে অন্ধকার দূর করে, সকল তারা মিলেও তা পারে না
২৪। এক চন্দ্র সহায় যার, শতেক তারায় কি করে তার !
২৫। ভীষ্ম, দ্রোণ,কর্ণ গেল শল্য হল রথী, চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল জোনাকির পাছে বাতি।
২৬। বাঘ পালাল, বেড়াল এল ধরতে এবার হাতি চন্দ্র সূর্য তারা গেল, জোনাকি ধরে বাতি।
২৭। নক্ষত্রভূষণং চন্দ্রো নারীণাং ভূষণং পতিঃ।পৃথিবীভূষণং রাজা বিদ্যা সর্বস্য ভূষণম।। (চাণক্য)
অর্থাৎ : চাঁদ তারকাদের অলঙ্কার, স্বামী নারীর অলঙ্কার, রাজা পৃথিবীর অলঙ্কার আর বিদ্যা সকলজনের অলঙ্কার।
২৮। আম শুনতে জাম শুনেছে, চাঁদ লিখতে ফাঁদ লিখেছে।
২৯। মিষ্ট কথা বলে কয়ে, আকাশের চাঁদ হাতে দিয়ে, কুমীরকে কলা দেখায়ে ফাকি দিও না গোপাল।
৩০। দ্বিতীয়ার চাঁদ দেখে, তেঁতুল রইল গাছে বেঁকে।
৩১। পূর্ণিমার চাঁদ দেখে তেঁতুল হল বঙ্ক।
৩২। আকাশের চাঁদে আর বানরের ভালে। শ্বেত চামরে আর ঘোড়ার বালে।
৩৩। ফানুস কখনো চাঁদ হয় না।
৩৪। সোনার চাঁদ।
৩৫। চাঁদ কিন্তু সর্বদা গোলাকার নন।
৩৬ চাঁদেও গেরণ ধরে।
৩৭। গ্রহণের চাঁদ সবাই দেখে।
৩৮। আঁধার পরে চাঁদের কলা। কতক কালা কতক ধলা।
৩৯। জল শুকালে কি করবে বাঁধে, রাত গেলে কি করবে চাঁদে।
৪০। যেমন নদের চাঁদ, তেমন মুখের ছাদ।
৪১। বাপ-দাদার নাম নেই, চাঁদ মোল্লার বেয়াই।
৪২। নাগর-চাঁদের শোয়ার পরিপাটি। দু’পাশে রয়েছে দুই সুপারির আঁটি।
৪৩। চাঁদ বিহনে আকাশ যেমন, লাগে খালি খালি, শশুরবাড়ি ফাকা লাগে। না থাকলে শালি।
৪৪। চাঁদপানা ওই মুখটা দেখে আপাসুস হয় খালি, আগে তোমার দেখা পেলে, দিদিই হত শালি।
৪৫। হোকনা পাঁপড় চাঁদের মতোই গোল, বরের মা তো করবেই শোরগোল।
৪৬। এক পোলা যার, চাঁদের ঠাকুর তার।
৪৭। গগনের চাঁদ ভূতলে উদয়।
৪৮। অর্ধচন্দ্র দেওয়া।
৪৯। চন্দ্রের জ্যোৎস্নাদানে উঁচু নীচু বিচার নাই।
এর মধ্যে অনেক চাঁদবিষয়ক বাগধারাই প্রক্ষিপ্ত। কোনও কোনও প্রবাদ আদতে চাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, চাঁদের কাছাকাছি কোনও শব্দকে চাঁদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে কোনও কোনও ক্ষেত্রে।
যেমন, “নাগর-চাঁদের শোয়ার পরিপাটি, দুপাশে রয়েছে দুই সুপারির আঁটি”। ‘নাগর-চাঁদের’ কি আসলে ‘নগরচাতরে’? মানে নগরের হাটে? তাহলে তো সুপারির আঁটি দুটিও মিলে যায় ঠিকঠাক। চাঁদের হাটও তাই চাতরহাটের অপভ্রংশ মনে হয়।
চৌরঙ্গি বা চৌমাথার পাশেই থাকে চক। কলকাতার চাঁদনি চক সবাই চেনেন। চাঁদনি চক আসলে চাতরচক। চাতরচক > চাতরিচক > চাদরিচক > চাঁদনিচক। দিল্লিতেও আছে চাঁদনিচক।
হাটে হাঁড়ি ভাঙা বা চাতরে হাঁড়ি ভাঙা অবশ্য যারতার কম্মো নয়। তার জন্যে এলেম লাগে। নামডাক লাগে। আমরা তো সেখানে চুনোপুঁটি।