কিউবা সরকারের প্রতিনিধি হয়ে ১৯৫৯-এর ১০ জুলাই কলকাতার বরানগরের ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটে আসেন চে গুয়েভারা। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে তিনি কলকাতায় কাটিয়েছিলেন কয়েকদিন। কামারহাটির আগরপাড়া জুটমিলেও গিয়েছিলেন।
তখন স্বৈরতন্ত্রী অত্যাচারী শাসক বাতিস্তাকে উৎখাত করে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সদ্য গঠিত হয়েছে কিউবান সরকার। ফিদেল কাস্ত্রোর ঘনিষ্ঠ হলেও চে গুয়েভারা তখন কিন্তু মন্ত্রী ছিলেন না। প্রতিনিধি দলটি দিল্লি বিমানবন্দরে নামে ৩০ জুন রাতে।
পরের কয়েকদিনে প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভিকে কৃষ্ণ মেনন, কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী এ পি জৈন, সামাজিক উন্নয়ন ও সহযোগিতা মন্ত্রী এস কে দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে কয়েক কার্টুন কিউবান সিগার উপহার দেন। বিনিময়ে নেহরু তাঁকে মাদুর্গার ছবি আঁকা একটি কুকরি উপহার দেন।
এই সফরের কথা বহুদিন বিস্মৃতির আড়ালে পড়েছিল। হিন্দি দৈনিক জনসত্তা কাগজের সম্পাদক ওম থানভি প্রথম এই সফরের খবর বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। চে গুয়েভারার সফরে তাঁর আসল নাম ছিল আর্নেস্টো ডে লা সেরনা। তাই তাঁর সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে ওম থানভিকে বেগ পেতে হয়। তাঁর সফরের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করতে ওম থানভিকে কিউবার রাজধানী হাভানাতেও যেতে হয়েছিল।
দিল্লি থেকে কলকাতা আসার কারণ কলকাতাতেই তখন ছিল কিউবান দূতাবাস। দূতাবাস থেকে চে গুয়েভারাকে যে যে জায়গায় যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, তিনি সদলবলে সেই জায়গাগুলোতেই গিয়েছিলেন। আগরপাড়া জুটমিল, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউট ছাড়া আরও কয়েকটি জায়গায় তিনি যান। কলকাতার বড়বাজারের রাস্তার ছবি তোলেন কিছু। সেখানে পথচলতি মানুষ ও ষাঁড়ের সহাবস্থান দেখা যাচ্ছে।
কলকাতায় ‘কৃষ্ণ’ নামে এক প্রভাবশালী জ্ঞানী লোকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তিনি চে-কে নানা বিষয়ে আলোকিত করেন। নিরস্ত্রীকরণের উপযোগিতা, আণবিক বোমার সমাজে সর্বনাশা প্রভাবের কথা তিনি চে-কে বোঝান। কমিউনিষ্ট চে গুয়েভারার সোস্যালিস্ট হওয়াকে তিনি সমর্থন করেন।
চে গুয়েভারা এই কৃষ্ণ-কে নিয়ে বিরাট উচ্ছ্বসিত। তিনি যে গড়পড়তা নেতামন্ত্রীদের থেকে অন্যস্তরের মানুষ, তা তিনি বারবার লিখে গেছেন তাঁর লেখাপত্রে। এমনকী দেশে ফিরে ফিদেল কাস্ত্রোকে যে রিপোর্ট জমা দেন, তাতেও কলকাতার কৃষ্ণ-র কথা বিশদে উল্লেখ করেছেন।

ওম থানভি লিখেছেন, এই কৃষ্ণের কোনও পরিচয় কেউ দিতে পারেননি। অনেকে কৃষ্ণমূর্তি নামক পণ্ডিতের কথা বলেন। কিন্তু কৃষ্ণমূর্তি দিল্লির বাসিন্দা, আর ১৯৫৯-এর জুন-জুলাইয়ে তিনি কাশ্মীরে ছিলেন।
কলকাতার আজকাল কাগজে প্রকাশিত একটি লেখায় লেখক-সাংবাদিক অর্ক দেব লিখেছেন, ‘কে এই কৃষ্ণ? হরেকৃষ্ণ কোঙার? বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরী? উত্তরটা খুঁজছি।’
ওম থানভি লিখেছেন, চে গুয়েভারা বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করেন, কমিউনিস্টদের সঙ্গে নয়। তাই হরেকৃষ্ণ কোঙার, কৃষ্ণপদ ঘোষদের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার কথাই নয়।
এখানেই আমার আলোকপাতের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটে তিনি কর্ণধার প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে দেখা করেন। তখন ভারতের একমাত্র কম্পিউটার সেখানেই ছিল। চে গুয়েভারা কম্পিউটারের উপকারিতার কথা জানতে চাইলে তিনি নাকি বলেন, ‘We feel still easy with pen and paper’।
চে-কে তিনি কল্যাণশ্রীতেও পাঠান। চে গুয়েভারা সেখানে গিয়ে সেখানকার শরণার্থী মহিলাদের তৈরি হাতের কাজের নমুনা দেখেন। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের স্ত্রী নির্মলকুমারী মহলানবিশ ছিলেন কল্যাণশ্রী নামক কুটিরশিল্পভবনটির পরিচালিকা।
কলকাতার কৃষ্ণ তাহলে কে?
তাঁকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হতে হয়। প্রথমে মনে হল তিনি কি কৃ্ষ্ণ কৃপালনী? মূলত বিশ্বভারতীর অধ্যাপক হলেও তিনি ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক, নেহরু ও গান্ধীর ঘনিষ্ঠ। সাহিত্য আকাদেমির সেক্রেটারিও ছিলেন ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত। কলকাতার সাহিত্য আকাদেমি অফিসের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৬-য়। ১৯৫৯-এ তিনি চোখের বালির ইংরেজি অনুবাদ করেন Binodini নামে। তাঁকে ধরেই ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ স্থাপন করেন সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্তরা। কিন্তু কৃষ্ণ কৃপালনী মূলত শান্তিনিকেতন ও দিল্লিতে থাকতেন। তাই কলকাতায় চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
তাহলে কি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের কাছের লোকজনের মধ্যেই ‘কৃষ্ণ’-র খোঁজ মিলতে পারে?
খুঁজতে খুঁজতে সোসিওলজির আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক রামকৃষ্ণ মুখার্জির কথা জানতে পারলাম। ১৯৪৪ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত তিনি আই এস আই-য়ের সোসিওলজির অধ্যাপক ছিলেন। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। সুদানে আবিষ্কৃত মানুষের মাথার খুলির নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্যে প্রশান্তচন্দ্র তাঁকে সেখানে পাঠান। যেহেতু তিনি Anthropology-তে এমএসসি করেছিলেন। জিনগত বিশ্লেষণের সেই গবেষণার ফল থেকেই তিনি ১৯৪৮-এ লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ থেকে পি এইচ ডি করেন। ১৯৫৩-৫৭ পর্যন্ত বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। অধ্যাপনা করেন আমেরিকার বিংহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয়েও।
অনেকগুলি বইও লিখেছেন সমাজতত্ত্বের উপর।
১. Ancient Inhabitants of Jabel Moya Sudan
২.The Sociologist and Social Change in India Today
৩. Six Villages of Bengal
৪. The Rise and Fall of East India Company
৫. Sociology of Indian Sociology
ইত্যাদি।
অধ্যাপক রামকৃষ্ণ মুখার্জিই যে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের কাছের মানুষ হিসেবে চে গুয়েভারার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন, চে গুয়েভারাকে নানা বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে ঋদ্ধ করেছিলেন, সেটা দিনের আলোর মত পরিষ্কার। চে গুয়েভারার স্মৃতিতে তিনি ‘কৃষ্ণ’ হিসেবে থেকে গেছেন।
লেখক অসিত দাস গবেষক, পেশায় চিকিৎসক