দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ায় ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম লা গুয়েরা। ১৯৬৭ সালে ৯ অক্টোবর। দু-কামরার ছোট্ট স্কুল। স্কুলে পড়ুয়ারা নেই। সৈন্যবাহিনী গ্রাম দখল করেছে, সেই সঙ্গে স্কুলও। দীর্ঘদেহী এক যুবককে বেঁধে রাখা হয়েছে। এক মাথা লম্বা লম্বা চুল, গাল-ভর্তি দাড়ি, হাত-পা বাঁধা, এক পায়ে গুলিও লেগেছে। বলিভিয়ার গোটা সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র বাঘা বাঘা অফিসাররা একযোগে খুঁজছিল এই যুবককে। ১৯৬৫ সালে ১৫ মার্চের পর এই যুবক ছেড়ে এসেছেন তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজন এবং বড়ো ভালোবাসায়-বেদনায় তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন তাঁর প্রিয় স্বদেশ। আজ দেশ থেকে দূরে সকলের থেকে দূরে বাম ঊরুতে গুলি বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
কেমন তাঁর স্বদেশ! আসলে কোনটাই বা তাঁর স্বদেশ! আমেরিকার থাবা উপেক্ষা করে পেছনে ফেলে আসা যে দেশ ১০ বছরের মধ্যে সাক্ষরতা, প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দারুণ এগিয়ে গিয়েছে। হাই স্কুলের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। ছাত্রবৃত্তির পরিমাণও ঊর্ধ্বমুখী। শিক্ষকের সংখ্যাও সে দেশে দ্রুত বাড়ানো গেছে। পৃথিবীর সেরা ডাক্তাররা এসেছেন তাঁর ছোট্ট আকৃতির সেই দেশ থেকে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশ কিউবা। সেই কিউবা থেকে বেশ দূরে বলিভিয়ায় তখন লড়াই করছেন আর্নেস্তো চে গেভারা। হ্যাঁ, কমরেড কমান্দান্ত চে গেভারা। বিপ্লবের আরেক নাম তিনি। গোটা পৃথিবী জোড়া ভুখা মানুষের সংগ্রামের প্রতীক তিনি। একসময় মোটরসাইকেলের পিঠে চেপে ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ। নিজের পরিবেশ, প্রতিবেশকে চিনেছেন। তারপর তাঁর সঙ্গে আরেক কিংবদন্তি ফিদেল কাস্ত্রোর যুগলবন্দি। কিউবা স্বাধীন হয়েছে। বলিভিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়ে শত্রুসৈনের হাতে প্রাণ দিলেন চিরজীবী চে গেভারা। কিন্তু পৃথিবী জুড়ে বিস্তার হলো তাঁর মায়াভরা দুটি চোখ। আজকের যে তরুণ, অ্যান্ড্রয়েড ফোনে এফবি-র মাধ্যমে বান্ধবীকে মেসেজ পাঠান, কনফারেন্স কল করে বন্ধুরা ঝগড়া মেটান, তাঁরও টি-শার্ট জুড়ে রয়েছেন আর্নেস্তো চে গেভারা। গিটার বাজিয়ে ব্যান্ডের যুবাবাহিনী যখন মঞ্চ কাঁপান, তাঁদের গেঞ্জির বুকে পিঠে, ফর্সা বাহুর ট্যাটুতে ভেসে ওঠে কমরেড কমান্দান্তের মুখ। চে-র কোনওদিন মৃত্যু হয় না। যতদিন মানুষ পৃথিবীতে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখবে ততদিন জেগে থাকবে চে-র ওই স্বপ্নমাখা দুটি চোখ।
১৯২৮ সালের ১৪ জুন তাঁর প্রথম স্বদেশ আর্জেন্টিনার রোজারিও-তে চে-র জন্ম। তাঁর বাবার নাম আর্নেস্তো গেভারা লিঞ্চ এবং মা সিলিয়া ডে লে সির্না। পারিবারিক সূত্রে তাঁর নাম কিন্তু চে নয়। তাঁর বিপ্লবী বন্ধুরাই তাঁর নাম দিয়েছিলেন চে। সে কথা আলাদা। খুব অল্পবয়স থেকে ভয়ংকর হাঁপানি, স্কুলে যেতে পারতেন না। মা-বাবা দুজনেই ছিলেন দারুণ পড়ুয়া। বাবা ছোটো ছোটো ব্যবসা করে কিছু রোজগার করতে সংসার চালাতেন, আর হই-হই করে বই কিনতেন। অল্পবয়স থেকেই চে বইয়ের পোকা। ১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু। স্পেনে উদ্বাস্তুরা ছড়িয়ে পড়ল দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে। ১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই উত্তাপ নিয়েই চে-র বড়ো হওয়া। ছোটোবেলা থেকেই অসুখ করলে দারুণ নিয়ম মানতেন। অসুখ সারলেই আবার সব নিয়ম শিকেয় উঠত। যা খেতেন প্রচুর পরিমাণে। কালো চা, কফি থেকে শুরু করে নানারকম মাংস, কালো আঙুর দিয়ে তৈরি ওয়াইন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পড়াশোনা। স্কুলের পড়া শেষ করে ডাক্তারি পাস করলেন। কুষ্ঠ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতিও হলো। ১৯৫১ সালে বন্ধুর মোটরবাইকে চেপে ঘুরে বেড়ালেন গোটা লাতিন আমেরিকা।
১৯৫৩ সালে কিউবায় সে দেশের স্বৈরতন্ত্রী বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে মাত্র ১৬৫ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে দুর্ধর্ষ লড়াই করলেন ফিদেল কাস্ত্রো। মেক্সিকোতে তখন বিপ্লবীদের ঘাঁটি। ১৯৫৬ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে চে গেভারার যোগাযোগ। ক্রমশ ফিদেলের ভাই রাউল কাস্ত্রো তাঁদের সঙ্গে জুটে গেলেন। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর গ্রানামা জাহাজ পাড়ি দিলো কিউবার দিকে। কিউবাকে মুক্ত করতেই হবে। একদিকে গেরিলা যুদ্ধ। তাঁর ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন দেশ-বিদেশের কবিতা, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি ইত্যাদি। এইভাবেই সংগ্রাম আর চে গেভারা একটি চলমান কবিতা!