রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটছে। পাখিরা জাগছে। ফরাসডাঙার লালবাগানে রক্ষিতদের আঁতুড়ঘরে নবজাতক কেঁদে উঠল। গোবিন্দ চন্দ্র ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। রাতে তাঁর বিশেষ ঘুম হয় নি। বাড়ির পুরনো দাঈ ননীবালার গলার তীক্ষ্ণ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে,
— ওগো শাঁখ বাজাও গো। খোকা হয়েচে যে!
গোবিন্দচন্দ্র দুহাত তুলে কুলদেবী মা দুগ্গাকে স্মরণ করলেন। বিয়ের বেশ কিছুদিন পরে কুলদেবীর কৃপায় তাঁর প্রথম সন্তান এল। তিনি আর তাঁর স্ত্রী সন্তান কামনায় দেবীর কাছে মানত করেছিলেন যে! ছেলের নাম রাখবেন দুর্গাচরণ। গোবিন্দ চন্দ্র তখনি ঠিক করে ফেললেন।
দাঈ ননীবালাকে একফাঁকে জিজ্ঞেস করে এলেন,
— হ্যাঁগো পোয়াতি, খোকা সব ভালো আছে তো? জন্মের সময়টা খেয়াল রেখেছ তো দাঈ?
— হ্যাঁগো দাদাবাবু দুজনেই ভালো আচে। সকাল ঠিক সাড়ে পাঁচটায় হয়েচে তোমার খোকা। গীর্জের ঘন্টা রোজ ঐ সময় বাজে যে!
গোবিন্দ চন্দ্র নোট করে নিলেন, সকাল সাড়ে পাঁচটা, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ১৮৪১ দুর্গাচরণের জন্ম। গণক ঠাকুর জন্মছক এঁকে বললেন,
— তোমার এই ছেলে অনেক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে একদিন বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে গো।

গোবিন্দ চন্দ্রের মুখে হাসি ফুটল।
দুর্গাচরণের জন্মের সময়কাল বড় উথালপাথালের। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন বাংলায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। বৃটিশদের আগে পরে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বাণিজ্য তরীও ভিড়েছে ভারতের বিভিন্ন উপকূলে। তাদের সঙ্গে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিত্য সংঘাত। ১৭৩০-এ জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লের নেতৃত্বে চন্দননগরের ফরাসিরা বাংলার বাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেছে। বোড়োকিসানপুর, গোন্দলপাড়া আর খলিসানি এই তিনটি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে ফরাসডাঙা। ফরাসডাঙার মিহি কাপড়ের সুখ্যাতি তখন দেশেবিদেশে।
তন্তুবায় রক্ষিত পরিবারের সঙ্গে চন্দননগরের ফরাসীদের দহরম মহরম, ব্যবসার লেনদেন শুরু হয়ে গেছে সেই কবে। ১৭৪০ থেকে ১৭৫০ দশকে।

রক্ষিত পরিবার বংশানুক্রমে তাঁতের টানাবানার সুতোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও স্বাধীনচেতা গোবিন্দ চন্দ্র পারিবারিক পেশায় গেলেন না। বাড়িতে ঘোষণা করলেন,
— জাত ব্যবসায় আমি ঢুকব না। কোলকেতায় গোরাদের সওদাগরী আপিসে আমার কাজ পাকা হয়ে গেছে। সেখানেই এবার থেকে বাসা ভাড়া করে থাকব। প্রতি হপ্তায় বাড়ি আসব। আমার পরিবার এখানেই থাকবে। দুগ্গা এখানেই বড় হবে।
কোলকাতার ফরাসি এক মার্চেন্ট কোম্পানিতে গোবিন্দ চন্দ্র যোগ দিলেন। ক্যামা সাহেব নামে ফরাসি সাহেবের জাহাজ কোম্পানির জেনারেল অর্ডার সাপ্লায়ার হিসেবে তাঁর কাজ শুরু হল। কাজকর্ম ভালোই চলছিল। একসময় ক্যামা সাহেব পড়লেন আর্থিক সংকটে।
পরোপকারী গোবিন্দ চন্দ্র তাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
— চিন্তা কোরো না সাহেব। আমি তোমায় সাহায্য করব। মাসিক ষাটসত্তর টাকা তোমায় দিতে আমার অসুবিধে হবেনা।

— মেরসি রাকুইটবাবু। তোমার এই উপকার আমি কখনো ভুলবনা। আজ থেকে তুমি আমার ভাই হলে।
ক্যামা সাহেবের বদান্যতায় পরে গোবিন্দ চন্দ্র কোম্পানির মুৎসুদ্দি বা বেনিয়ানের পদ পেলেন। ওদিকে ফরাসডাঙায় তাঁর পরিবার বড় হচ্ছে। আর একটি পুত্রসন্তান প্রাপ্তি হয়েছে। দুর্গাচরণ পড়াশোনা করছে ফরাসডাঙার স্থানীয় পাঠশালায়।
সময় নানাভাবে ছলনা করে মানুষ কে। একদিন ঘটল বিনা মেঘে বজ্রপাত। গোটা বাংলা তখন কলেরা, ওলাওঠা, ম্যালেরিয়ার আঁতুরঘর। কলেরার মহামারীতে গোবিন্দচন্দ্র নিজেকে আর বাঁচাতে পারলেননা। স্ত্রী-পুত্রপরিবারকে রেখে অকালে চোখ চোখ বুঁজলেন। নাবালক দুর্গাচরণ আর তার ছোটো ভাইকে নিয়ে গোবিন্দ চন্দ্রের বিধবা স্ত্রী তখন কপালে করাঘাত করছেন। চোখের সামনে কোনো পথ নেই। দিশা নেই। পুরোটাই অন্ধকার!
ক্যামা সাহেব রক্ষিত পরিবারের বিপদে কান্ডারী হয়ে এগিয়ে এলেন। অন্তরালে থাকা দুর্গাচরণের মাকে বললেন,
— চিন্তা করবেন না মাতা। আমি আছি আপনাদের পাশে। রাকুইটবাবু আমার বড় ভাইয়ের মত ছিল। আমি আপনার বড় ছেলে দৌরগাচরণকে কোলকাতা নিয়ে যাব। লেখাপড়া শেখাব। তারপর ওকে কাজ দেব। ততদিন আপনার পরিবারের পুরো দায়িত্ব আমার।

থানকাপড়ে চোখ মুছে ছেলে দুর্গাচরণের মাথায় হাত রেখে গোবিন্দচন্দ্রের বিধবা বললেন,
— যা বাছা, এছাড়া যে আমি আর অন্য উপায় দেখছি নে।
সাহসে বুক বেঁধে দশ বছরের ছেলেকে তিনি ছেড়ে দিলেন গোরা সাহেবদের হাতে। বালক দুর্গাচরণ চলল ভাগ্যান্বেষণে কোলকাতায়।
দুর্গাচরণের সামনে কোলকাতা তখন নতুন নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। তিনি ফরাসি শিখলেন। ইংরিজি ভাষায় রপ্ত হলেন। ক্যামাসাহেব হাতে ধরে হিসাবকিতাব শিখিয়ে চোদ্দ বছরের দুর্গাচরণকে বললেন,
— মাই সন এবার থেকে তুমি কোম্পানির হিসেবের খাতাপত্র দেখবে। তোমার সিনিয়র থাকবে আরেক বাঙ্গালী বাবু।
বুদ্ধিমান দুর্গাচরণের কোনো কাজই শিখে নিতে দেরী হয় না। গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি তার। হিসেবনিকেশ ছাড়াও সে শিখে ফেলে ব্যবসার নানা কলাকৌশল। জেনে নেয় আমদানি রপ্তানি, বাজার দর, যোগানচাহিদার সব খুঁটিনাটি। সব কিছু চলতে চলতে ভাগ্যের পাশা আবার উল্টে যায়। প্রধান হিসাব রক্ষক তহবিল তছরূপের দায়ে অভিযুক্ত হয়। দুর্গাচরণ সে দায় থেকে মুক্ত হতে পারে না। তার মাথায় তখন জরিমানার ভার। সে ছুটে যায় ফরাসডাঙায় মায়ের কাছে।
— মা বড় বিপদে পড়েছি। বড্ড ফেঁসে গেছি মা। আমার পাঁচ হাজার টাকার বড় দরকার।
— সেকি রে ! অত টাকা কোথায় পাবি রে দুগ্গা! কি করে ফাঁসলি বাপ?
— আমাদের বাড়ি বেচতে হবে মা গো। আমাদের আপিসের বড় বাবু তহবিল তছরূপ করেছে। তার দায় আমার ঘাড়েও পড়েছে। আমি নির্দোষ মা। আমি কিচ্ছু করিনি।

— ভগমান আমাদের আর কত পরীক্ষে নেবে রে! আমাদের জাতব্যবসা গেল। অকালে তোর বাপ মরল। গোরা সাহেবরা দয়া করে তোর বাপের চাকরিতে তোকে বসাল। তারপরেও একি হ্যাঙ্গাম। এবার কি ভিটেমাটি ছেড়ে আমাদের পথে নামতে হবে?
হাউ হাউ করে কাঁদছেন দুর্গাচরণের মা।
— মা আমার ওপর ভরসা রাখো। একটু সময় দাও। আমি সব আবার সামলে নিতে পারব।
ভরসা না করে উপায় কি মায়ের! দশ বছর বয়সে তার বাপ যখন মোলো, তখন ঐটুকু ছেলে দুগ্গাইতো সংসারের হাল ধরেছিল, মা মনে মনে ভাবেন। কুলদেবী মা দুর্গার দোর ধরা বড় ছেলে দুর্গাচরণ। যা করার তিনিই করবেন। তিনিই জানেন, আরো কি কি কপালে লেখা আছে! দুহাত জড়ো করে কপালে ছোঁয়ায় দুর্গাচরণের মা।
কথা রেখেছিলেন মায়ের ছেলে দুর্গাচরণ। জীবনের বহু ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে তিনি মায়ের ভরসা তো বটেই, একসময় সমাজের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন।
ফরাসিরাও দুর্গাচরণের হাত ছাড়েনি। ক্যামা সাহেব ডেকে পাঠালেন তাকে।
— আমি জানি মাই সন তুমি নির্দোষ। কিন্তু আমি সবার মুখ বন্ধ করতে পারি না। আমি নিরূপায়। তুমি স্বাধীন ব্যবসা শুরু কর। আমার এক বন্ধু গ্রেদি তোমাকে সাহায্য করবে। আমি তোমাকে পাঁচশ টাকা দিচ্ছি।
দুর্গাচরণ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। যোগাড় করলেন আরো কিছু টাকা।
ফরাসডাঙার লালবাগানের আড়ংয়ে আবার বেজে উঠল মাকুর খটখট শব্দ। গোবিন্দচন্দ্রের বিধবা স্ত্রী অনেকদিন পরে নিজের হাতে তাঁতে টানার সুতো লাগালেন। ছেলেকে বললেন,
— হ্যাঁরে দুগ্গা, পারবি তো! তোর বাপের তো জাতব্যবসায় মন ছিল না।
— পারব মা, ঠিক পারব। আমি গোরাদের কাছ থেকে ব্যবসার হিসেবকিতেব, ঘাঁতঘোঁত অনেকটা শিখে ফেলেছি। এবার আমরা তাঁতে গলাবন্ধ রুমাল, চৌতার শাড়ি, নয়নসুখ মসলিন আর লাল-কালো গিলে পাড়ের ধুতি বুনব মা। কোলকেতার বাবুদের ঐ কুঁচি পাড়ের ধুতি খুব পছন্দ।
একদিন ফরাসডাঙার লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারের ঘাটে এলেন দুর্গাচরণ। দুহাতে তাঁর ঘরের তাঁতে বোনা কাপড়ের গাঁঠরি। চোখে স্বপ্ন।

— ও মাঝি ঘাটে নৌকা লাগাও।
গঙ্গার স্রোতে যেন তাঁর স্বপ্নের তরণী বাওয়া শুরু হল। প্রতিদিন ফরাসডাঙা থেকে দুর্গাচরণ কোলকাতা যেতেন। কাপড়ের ব্যবসায় ঘরে লক্ষ্মী এল। দুর্গাচরণ এরপর চাল, ডাল, চা, তিল, সরষে, পোস্তদানা, তিসি ও আফিম, তসরের থান ও কাটা কাপড় নিয়ে নৌকা বোঝাই করেন।
একদিন কোলকাতার সাত নং সোয়ালো স্ট্রিটে ঝুলল একটি সাইনবোর্ড, রক্ষিত এন্ড কোম্পানী। দুর্গাচরণের নিজের পাইকারি ব্যবসা শুরু হল। দুর্গাচরণ প্রভূত লাভের মুখ দেখলেন।
এই লাভের টাকাকে পুঁজি করে তাঁর পরবর্তী ব্যবসা। সাফল্যের সোপানে তিনি তরতর করে চড়ছেন। ১৮৮০ সালে ১ নং ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিটে ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট সংস্থা ‘Doorga Chorone Roquitte & Co.’ স্থাপিত হয়। তাঁর প্রথম কোম্পানির কাজ ছিল মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য এদেশে বিক্রি করা। এই নতুন কোম্পানি এদেশীয় পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা শুরু করল।
ইউরোপের নানা দেশ-সহ কলোম্বো, সাইগন, হংকং, মরিশাস, মিশর হয়ে এমনকি অ্যাটলান্টিক পেরিয়ে ত্রিনিদাদ, বারবাডোস, জ্যামাইকা ইত্যাদি দেশেও তিনি পণ্য রপ্তানি করতেন। এক এক সময় পণ্যের পরিমাণ এত বেড়ে যেত যে তাঁকে এক একটা গোটা জাহাজ ভাড়া করতে হত।
তাঁর কোম্পানিতে চন্দননগরের বহু বাঙালির কর্মসংস্থান হল। ফরাসীরাও উচ্চ বেতনে তাঁর সংস্থায় চাকরি করতেন।
গণক ঠাকুরের ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হল। দুর্গাচরণ সমাজকল্যাণে মন দিলেন। কোলকাতার শৌখিন বাবুদের মত পয়সা ওড়ানোর বিলাসিতা তাঁর ছিল না। কাজের সূত্রে কোলকাতায় থাকতে হলেও জন্মস্থান কে ভোলেন নি।

চন্দননগরের গণ্যমান্য মানুষদের ডেকে তিনি স্কুল আর দাতব্য চিকিৎসালয় খোলার প্রস্তাব রাখলেন। তাঁরা ‘সাধু সাধু’ বলে উচ্চস্বরে দুর্গাচরণের প্রস্তাব সমর্থন করলেন। বিদ্যালয় আর চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত হল।
জনদরদী মানুষটির কল্যাণহাতের স্পর্শ পেয়েছেন মেধাবী ছাত্র, অনাথাতুর জন। চন্দননগরের শহরের উন্নয়নের কথা তিনি ভেবেছেন আজীবন। চন্দননগরের বাঙালিদের উচ্চপদে বসিয়েছেন তখনকার ফরাসডাঙার পৌরসভায়।
ফরাসীরা এই মানুষটিকে চিনতে পেরেছিলেন। ফরাসডাঙার ছোট্ট পরিসর থেকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে গেছিল ফ্রান্সে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একদা ফরাসি কলোনি কম্বোজ (আজকের কাম্বোডিয়া) থেকে তাঁকে প্রদান করা হল। ‘শেভালিয়ে দে ল’র্দ্র রয়্যাল দ্যু কামবোজ’ (Chevalier de L’ordre royal du Cambodge)
ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ন অফ্ অনারে ভূষিত হলেন প্রথম ভারতীয়, ‘মঁসিয়ে দৌরগা চরণ রাকুইট।’
আত্মবিস্মৃত বাঙালিজাতি হয়ত মনে রাখেনি তাঁর কথা। চন্দননগরের স্ট্রান্ডের নান্দনিকতায় জুড়ে আছে একটি অপূর্ব সৌধ। উৎসাহী মানুষ দুদন্ড দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করেন, সেখানে জ্বলজ্বল করছে মঁসিয়ে দুর্গাচরণ রক্ষিতের নাম। চন্দননগরের আভিজাত্যের উজ্জ্বলতম এক নক্ষত্র।
তথ্যসূত্র : আন্তর্জাল