প্রতি বছর কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয় হিন্দুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের ব্রত ছট। ছট পূজা হল মূলত সূর্যদেবের এবং তার স্ত্রী উষা দেবীর পুজো। ২৮ অক্টোবর প্রথম দিন স্নান (নাহায়-খায়), দ্বিতীয় দিন খরনা, তৃতীয় দিন সন্ধ্যা অর্ঘ্য অর্থ্যৎ জলে দাঁড়িয়ে উপাসনা করার পর অস্তিমিত সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া এবং চতুর্থ দিন (৩১ অক্টোবর) ঊষা অর্ঘ্যের মধ্যে দিয়ে পালিত হবে সূর্য উপাসনার এই মহোৎসব। পরিবারের সমৃদ্ধি ও পুত্রকামনার জন্য এই লৌকিক উৎসব। এই উৎসবটি মূলত বিহার, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশে হলেও বর্তমানে আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
প্রচলিত বিশ্বাস যে দেবী ভগবতী এই ব্রত পালন করেছিলেন এবং এর সাক্ষী ছিলেন সূর্যদেব। ষষ্ঠী তিথিতে এই ব্রত পালন করা হয় বলে এই দেবী ষষ্ঠীদেবী রূপে পরিচিত। রামায়ণে আমরা দেখি রাম ও সীতা উভয়েই কুলদেবতা সূর্যের পুজো করেছিলেন। মহাভারতেও দেখতে পাই সূর্যের আরাধনা করে দ্রৌপদী অক্ষয় পাত্র লাভ করেছিলেন। আবার সূর্যের ঔরসে কুন্তীপুত্র কর্ণের বীরত্ব বীরগাথা হয়ে আছে।

ছট ব্রতের মধ্যে পৌরাণিক ও লৌকিক কাহিনীর প্রচলন রয়েছে।
পৌরাণিক কাহিনী: প্রাচীনকালে বিন্দুসার তীর্থে মহীপাল নামে এক বণিক থাকতেন। সে ধর্ম ও ঈশ্বরবিরোধী ছিলেন। একবার সে সূর্যের মূর্তির সামনে মলমূত্র ত্যাগ করায় দৃষ্টিশক্তি হারায়। অন্ধত্বের জ্বালায় আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে পথে যাবার সময় নারদ মুনির সঙ্গে দেখা হয়। নারদের জিজ্ঞাসায় বণিক তার দুঃখ দুর্দশার কথা জানায়। দয়াপরবশ হয়ে নারদ বলেন, “ওরে মূর্খ! প্রাণত্যাগ কোরো না। ভগবান সূর্যের কোপে তোমাকে এই দশায় ভুগতে হচ্ছে। কার্তিক মাসের সূর্য ষষ্ঠীতে ছট ব্রত পালন করো, তোমার দারিদ্র্য দশা ঘুচবে ও দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে।”
বণিক নারদের কথামতো এই ব্রত পালন করে ও তার ফলস্বরূপ সে দৃষ্টিশক্তি ফেরৎ পায় এবং তার সঙ্গে দৈন্য দশাও ঘোচে।
লৌকিক কাহিনী :
এক বুড়ির কোনও পুত্র সন্তান ছিল না তাই সে কার্তিক মাসের শুক্লা সপ্তমীর দিন সংকল্প করল যে, তার পুত্র হলে সেই ছট মাতার ব্রত পালন করবে। যথাসময়ে ভগবান সূর্যের কৃপায় সে পুত্র সন্তান লাভ করল পুত্রকে পেয়ে সে কিন্তু নিজের সংকল্পের কথা ভুলে গেল। কোন ব্রত পালন করল না। বহমান সময়ে পুত্র বিবাহযোগ্য হলে পুত্রের বিয়ে দেওয়া হলো। একদিন এক জঙ্গলে পুত্র নতুন বউ নিয়ে ঘরে ফেরার পথে হঠাৎ করেই মারা যায়। নতুন বউ পালকিতে মরা বরকে দেখে অঝোরে কাঁদতে লাগলো তার কান্না শুনে এক বৃদ্ধা এসে বৌমাকে বললো, “আমি ছট মাতা। তোমার শাশুড়ি সব সময় আমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমায় পুজো করবে বলে সংকল্প করেও আমার পুজো করেনি। আমি এখন তোমার বর কে বাঁচিয়ে দিচ্ছি ঘরে ফিরে এসব কথা শাশুড়ি কে বলবে।”

বৌমা ঘরে ফিরে এসে শাশুড়িমাতাকে সব কথা বলল শাশুড়ি এবার নিজের ভুল বুঝতে পারলো এবং সূর্য ষষ্ঠীর ব্রত পালন করল। সেই থেকেই সর্বপ্রথম প্রচলন হলো এই ষষ্ঠী পুজো বা ছটব্রত।
ব্রতের দিন ব্রতিনী সারাদিন নির্জলা উপবাস রেখে সন্ধ্যায় ব্রত পালন করে। ব্রত পালনের আগের দিন ব্রতিনীদের ছোট ছেলেরা গঙ্গার পাড়ে বা কোন জলাশয়ের ধারে মাটির চাতাল বা বেদী নির্মাণ করে। প্রচলিত বিশ্বাস যে সুর্যদেব ঐ বেদীতে বসে রাজ্যপাট চালাবেন। তাই সেই চাতালেই ব্রতিণী পুজোর আয়োজন করে। একটি ডালায় শশা, কলা, আপেল, বাতাবিলেবু, নারকেল ইত্যাদি সাধ্যমতো সাত রকমের ফল-সহ ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালে। এছাড়া আটা বা ময়দা, ঘি, দুধ, ক্ষীর, মৌরি, গোলমরিচ, গুড় দিয়ে বানানো ঠেকুয়া ডালায় রাখে। এই ডালায় সূর্যের প্রতিকৃতি আঁকা থাকে। একে ‘ডালাছট’ ও বলা হয়।

এই ডালাটি ব্রতিনি জলাশয়ে ডুবিয়ে স্নান করেন এবং সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য দেন। ডালা স্নান করানোর পর ব্রতিনী ঘরে এসে ডালার সামগ্রী প্রসাদ হিসেবে সকলের মধ্যে বিতরণ করেন। পরের দিন ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সময় ডালা সাজিয়ে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্যদান করে পুজো করা হয়। ছট ব্রততে পরম শক্তিধর সূর্যদেবের আরাধনা করা হয়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় সূর্যকেই পরম আরাধ্য দেবতার আসনে বসানো হয়েছে।এই ব্রত পালনের পালনীয় বিধি হলো সূর্যাস্ত ও সুর্যোদয়। ব্রতিনীরা হলুদ রঙের বস্ত্র পরিধান করেন যা সুর্যের কিরণের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ।
এই ছট পুজো রাজস্থান, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে রথসপ্তমী, মাঘসপ্তমী অচল সপ্তমী ও পুত্র সপ্তমী নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে এটি ইতু ব্রত এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে মাঘ মন্ডল নামে পরিচিত। আবার পশ্চিমবঙ্গে রালদুর্গার ব্রতেও সূর্য পূজা করার প্রসঙ্গ আছে।

পুতি-পুত্রের মঙ্গলকামনা পুত্র কামনা সুখ ও সমৃদ্ধি ও সম্পদ লাভের কামনায় এই ব্রত পালন করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস হল যে এই ব্রত পালন করলে চর্মরোগ ও চক্ষু রোগের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। আবার এই ব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে ধরিত্রী শস্যপূর্ণ হওয়া ও নারীর প্রজনন শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ এর মধ্যে দিয়ে উর্বরতাবাদের কথাও ব্যক্ত হয়েছে। সংসারের মঙ্গলকামনায় কঠিন নির্জলা উপবাসের দ্বারা ছট মাইয়ার (সূর্যপত্নী ঊষা হলেন ছট মাঈ) মাধ্যমে পরম শক্তিধর সূর্যদেবের আরাধনা করা হয়। সূর্যদেব হলেন মূর্তির বাইরে একমাত্র জ্বাজল্যমান দেবতা যাঁর বাস্তব শক্তি প্রত্যক্ষ করা যায়। সদা নমস্য শক্তিকে ছটপুজোর পবিত্রক্ষণে নমন করি।
“ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্, / ধান্তারীং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।”
তথ্য সূত্র: ডাঃ শীলা বসাক — বাংলার ব্রতপার্বণ এবং অন্যান্য।
সূর্য প্রণাম।
Dhonyobad ????
কত অজানারে জাইলে তুমি???? চমৎকার প্রাসঙ্গিক পরিবেশন পেজ ফোরের পাতা আলোকিত,*সূর্য ষষ্ঠী” ব্রত আচরণে ব্রতীদের জন্য জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়
ধন্যবাদ।শুভকামনা শুভেচ্ছা।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????????
খুবই ভালো লাগল।
থ্যাংক ইউ ❤️
অপূর্ব লেখা,,,,,অনেককিছু জানতে পারলাম এই লেখার মাধ্যমে
Dhonyobad