রতনপুর, মহামায়া, নবরাত্রি
ছত্তীশগড়ীরা রামচন্দ্রকে মোর ভাঁচা (ভাগনা) ভেবে আপন করে নিয়েছে। তাদের মতে কোশল কি টুরি (কোশলকন্যা) হলেন কৌশল্যা। প্রাচীন ভারতবর্ষের দক্ষিণ কোশল প্রদেশ হচ্ছে এখনকার ছত্তীশগড়। কৌশল্যার পীহর বা মাঈকে। সে সুবাদে ছত্তীশগড় রামচন্দ্রের নানীহাল বা দিদিমার বাড়ি।
তাদের নামকরণেও জুড়ে আছেন রামচন্দ্র বা রামায়ণের নানা চরিত্র, যেমন বিভীষণ, ঊর্মিলা, কৌশল্যা, মৈথিলী, ভরত এমনকি হেতরাম, ছেতরামও। বয়স্ক মহিলারা এখানে মাতারাম। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ এদের। শিশুকে অন্নপ্রাশনের প্রথম অন্ন মুখে তুলে দেয় মাসি অথবা পিসি। এছাড়াও সাজগোজে, ঘরেবাইরের কাজেকর্মের সক্রিয়তায়, স্মার্টনেসে পুরুষদের তুলনায় দড় এখানকার মাতাহারী বা মায়েরা। জয় জোহার, জয় ছত্তীশগড়ের মত মাতৃশক্তিরও জয়জয়কার এখানে।
জ্যান্ত মায়েদের মত এখানে দেবীমায়েরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন পাহাড় চুড়োয়, নদীরধারে, গিরিকন্দরে বা জঙ্গলের মধ্যে। মাড়ওয়ারাণী, বিমলেশ্বরী, মহামায়া, সর্বমঙ্গলা, দন্তেশ্বরী, চন্দ্রসেনী, সম্বলেশ্বরীরা এই বনভূমি, পাহাড়ে ঘেরা রাজ্যটির স্থানে স্থানে বিরাজমান। প্রতিদিনের পূজার্চনায় তাঁরা বন্দিত হন। এছাড়াও চৈত্র নবরাত্রি বা বাসন্তী পুজোয় এবং আশ্বিনের অকাল বোধনে এঁদের দরবারে জমজমাটি ভিড়।

আমাদের বিলাসপুর যাওয়া আসার পথে পড়ত রতনপুরের মহামায়া মন্দিরটি। আমার বহুদিনের সঙ্গীটির ঈশ্বরে অগাধ বিশ্বাস। তিনি সেখানে ভক্তিভরে পুজো দিতেন, দেবীদর্শন করতেন। আমি পাপীতাপী মানুষ। ঘুরে ঘুরে মন্দিরের স্থাপত্য, ভাস্কর্য দেখতাম। প্রাচীন কোশল রাজ্য, কলচুরি বংশের সঙ্গে রতনপুরের সংযোগ জেনে পুলকিত হতাম।
মহামায়া মন্দিরটি শক্তিপীঠ বলে কথিত। বলা হয় সতীর দেহাবশেষ নিয়ে যে একান্ন পীঠস্থান গড়ে উঠেছে, সেটির একটি এই রতনপুর। পঞ্জিকাতেও তার উল্লেখ আছে। তবে পৌরাণিক সে ঘটনার সত্যমিথ্যা যাচাই করার উপায় তো নেই। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীতে রতনপুর এবং মহামায়া মন্দিরের গুরুত্ব এখনো অনস্বীকার্য।

ছত্তীশগড়ের বিলাসপুর শহর থেকে মাত্র পঁচিশ কিলোমিটার দূরে বিলাসপুর-অম্বিকাপুর হাইওয়েতে অবস্থিত টিলা, জঙ্গল, সরোবরে ঘেরা এই জনপদটি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে কলচুরি বংশের রাজাদের রাজধানী ছিল। ভাঙাচোরা মন্দির, দুর্গের ভগ্নাবশেষে সে সব নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কলচুরি বংশের রাজা রত্নদেবের নামেই এই শহরের প্রাচীন নাম ছিল রতনপুরা, তিনিই ১০৫০ খ্রীস্টাব্দে নির্মাণ করান এই মহামায়া মন্দিরটি। উত্তরভারতের নাগর স্থাপত্য শিল্পশৈলীতে তৈরি এই মন্দিরটির পিরামিডের মত শিখর দূর থেকে লক্ষ্য করা যায়। ষোলোটি স্তম্ভের ওপর তৈরি এই দেবালয়টি। কিছু কিছু ভাস্কর্য এখনো অবিকৃত আছে মন্দির গাত্রে, সেগুলি দেখবার মত। মূল মন্দির চত্বরে আরো কিছু মন্দির রয়েছে, তার সবগুলিতে অবশ্য বিগ্রহের অবস্থান নেই। মন্দির ছাড়া রতনপুরে অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলি সময়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। সেখানে মহামায়া মন্দির এখনো অনেকটা সুরক্ষিত তাই পর্যটকদের কাছে এই প্রাচীন মন্দির একটি ঐতিহাসিক স্মারকও বটে। নাটমন্দিরেই স্থাপিত আছেন দেবী মহামায়া। তাঁর পিছনেই দেবী সরস্বতী মূর্তির অবস্থান। প্রাচীন পুঁথিতে মহামায়া দেবী কোশলেশ্বরী নামেও উল্লিখিত হয়েছেন কারণটা ঐ প্রাচীনভারতের দক্ষিণ কোশলই এখনকার ছত্তীশগড়।

তবে স্থানীয় মানুষ ইতিহাসের এত খুঁটিনাটির খবর রাখেন না। দূর দূর থেকে চৈত্র-আশ্বিনের নবরাত্রিতে মহামায়া দাঈকে দর্শন করতে আসেন লালচুনরী, কাঁচের চুড়ি, গুড়হেল (জবাফুল) নারকেলে ভরা সাজি নিয়ে। সরল মনে বিশ্বাস করেন, নারকেল যদি খারাপ হয় তবে দেবি সম্পূর্ণরূপে সেটি গ্রহণ করেছেন। ন’দিন ফলমূল খেয়ে, কৃচ্ছসাধন করে সংসারের মঙ্গলকামনায় মনোকামনা প্রদীপ জ্বালান মন্দির প্রাঙ্গনে। দন্ডী খাটেন। শাকম্ভরী দেবী অন্নপূর্ণা, তিনিই পরমাপ্রকৃতি। তারই প্রতীকরূপে নবরাত্রির প্রথমদিন যবের বীজ মাটির সরায় স্থাপন করেন, কারণ যবই নাকি পৃথিবীতে উৎপাদিত প্রথম শস্য। রাতে মাকে জাগ্রত করেন মাতা জাগ্রাতার ভজন-কীর্তনে। আদিবাসী অধ্যুষিত সমাজ তাদের, তাই মায়ের ভর হওয়া, মাকে পাওয়া, ঝাড়ফুঁক, বশীকরণ এসব থেকে তারা এখনো মুক্ত হতে পারে নি। তবে তারা এই নবরাত্রির সময় মাকে তুষ্ট করে যশগীত গেয়ে। সহজ সরল দেহাতী সুর, ভক্তি, আর্তি সেই গানে।
জগৎ আলো করা, ঝলমলে তোর ঐ দরজা খানি দিয়ে আমাকে তোর কাছে পৌঁছতে দে। যে সুন্দর পুষ্পিত, সুগন্ধিত বাগানের তুই মালিনী, সেই বাগানে আমাকে ফুল তুলতে দে। আমাকে তোর কাছে পৌঁছতে দে মা।

“জগর বগর বরথে দাঈ, তোর ডুঙ্গরিয়া,
মহর মহর মহকত হাবে
মাইয়াকে ফুলওয়াড়িয়া।
মোলা তোরন দেনা ও
মাইয়া তোরন দেনা ও
ফুলওয়া মালিন কে মাইয়া
তোরন দেনা ও।”
কত কি জানতে পারি…!!! বিভূতিভূষনের জগৎ revisit হয় যেন…!!! মেঘালয়া এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতেও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। কিন্তু ছত্তিশগড়ের তথ্যটা অবাক করে দেওয়ার মত!! উগ্র পিতৃতান্ত্রিক পৃথিবীতে মনে হয় এই খন্ড ব্যতিক্রমগুলো শীতল নদী। অনেক ধন্যবাদ… অনেক কিছু জানলাম।
আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।যতটুকু জানি, আমারও জানাতে পেরে ভালো লাগে