বড়রা ছোটদের দশজনের একজন হতে বলেন। অথচ তাদের ভুল ও উদাসীনতার কারণে পৃথিবীর প্রতি দশজনের একজন শিশু হয়ে উঠছে শিশু শ্রমিক। এর চেয়ে নির্মম ঠাট্টা আর কিছুই হতে পারেনা! কোভিড এই সংখ্যা আরও বাড়িয়েছে। বহু অভিভাবক কর্মহীন, অনেকে মারা গেছেন। দেশে স্কুলছুট বেড়েছে। ইউনিসেফের হিসেবে এই সময়কালে ভারতে বন্ধ হয়েছে ১৫ লক্ষ স্কুল। এতেও অনিবার্যভাবে বেড়েছে শিশু শ্রমিক। হোটেল থেকে ইঁটভাটা; গ্যারাজ থেকে চায়ের দোকান; বাজি কারখানা থেকে আবাসন শিল্প আমরা দেখছি নতুন নতুন শিশু শ্রমিকের মুখ। সেই মুখে শৈশবের চিহ্ন নেই। রয়েছে আশঙ্কা আর প্রত্যাখানের গ্লানি। এই মুখের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

এটা যাকে বলে একটা গ্লোবাল ট্রেন্ড (Globaltrends), আন্তর্জাতিক ঝোঁক। আইএলও এবং ইউনিসেফের হিসেবে চলতি বছরের শেষেই আরও ৯০ লক্ষ শিশু মজুর হওয়ার জন্য নাম লেখাবে। কোভিড নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু একটা কথা কেউ বলেননা যে কোভিড শুধুই একটা সমস্যা নয় বরং তা সব সমস্যাকেই আরও তীব্র করেছে। কোভিডে সবচেয়ে বেশি শিশু হয়তো মারা যায়নি কিন্তু শিশুদের মধ্যে তার প্রভাব সবথেকে বেশি। চোখ খুললেই দেখতে পাবেন বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, স্কুল ছুট, শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এই সময়ে।

শুধু আইন দিয়ে এই অবস্থা বদলানো যাবেনা। বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। দেশের আইনে শিশুশ্রম বেআইনি, ১৪ বছরের নিচের কাউকে দিয়ে কাজ করানো যাবেনা। অথচ দেশে শিশুশ্রম বাড়ছে। আমি আপনিই তাদের দিয়ে কাজ করাচ্ছি। ২০১১’র সেন্সাস বলছে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১ কোটি ১ লক্ষ। এরমধ্যে ৮১ লক্ষ রয়েছে গ্রামে। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে নানা বিপজ্জনক কাজ আরও ভয়ঙ্কর পরিবেশে করে চলেছে এই শিশু ভোলানাথেরা। খাওয়া দাওয়া থেকে বীমা — নিয়োগকর্তারা কোন শর্তই পূরণ করেন না। বাজি কারখানা হোক বা ইঁটভাটা শিশু শ্রমিকদের মৃত্যু হলেই মালিকের প্রথম কথা, আমার এখানে কাজ করতো না। এটা বলা সহজ কারণ এখানে হিসেব রাখার কোন ব্যাপারই নেই! সমাজ তো তাদের অস্তিত্ব অনেকদিন আগেই অস্বীকার করেছে। তাদের বাবা মাও কোন ক্ষতিপূরণ পান না। খাতায় তো তাদের নামই নেই!

শিশুদের জন্য ‘দিবস’ আছে, ‘যোজনা’ আছে, আছে সরকারি বরাদ্দ। আদতে তাদের প্রাপ্তির ঘরে শূন্য। তাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দটাই নষ্ট করে দিচ্ছে শিশুশ্রম। নিরুপায় মা বাবা ছোটদের হাত ধরে সেই রূপকথার গল্পের মত এক অন্ধকার গুহার দরজার সামনে পৌঁছে দিয়ে আসছেন। সেখান থেকে তাদের কেউ ফেরে কেউ ফেরেনা। যাদের অপদার্থতা ছাত্র, খেলোয়াড়, গবেষক, বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী সবকিছু মুছে দিয়ে শিশুর পর শুধুই ‘শ্রমিক’ শব্দটা বসিয়ে দিল তাদের আমরা বছর বছর ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাই। তারাই এমন একটা ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রাখছেন এবং বেড়ে চলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র বাড়ছে শিশু শ্রমিক। গত দু’দশকে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬০ লক্ষ। এদের ৮০ শতাংশই আসছে গ্রামীণ এলাকা থেকে।

সাসটেনেবল ডেভলপমেন্ট গোল (Sustainable Development Goals) বা সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্য কথাটা এখন বেশ পরিচিত। এই শতাব্দীতেই নাকি সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। কিন্তু এতে দারিদ্র, ক্ষুধা, শিক্ষা, শিশুর বিরুদ্ধে হিংসা, লিঙ্গ সাম্য ইত্যাদি যেসব সূচকগুলি রাখা হয়েছে শিশুশ্রম বজায় থাকলে আমরা সেখানে পৌঁছবো কি করে? কোন গোল নয়, আমাদের ঝুলিতে থাকবে শুধু একটা বড় গোল্লা।