শিশুর সবথেকে প্রিয় বা যেটাতে সে সব থেকে বেশি আনন্দ পায়, সেটা তার খেলনা। খেলনা হলেও তা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করে। কারণ খেলা একটা কাজ, খেলনা থেকে শিশুর চোখ ও হাতের বিকাশ ঘটে। ছোট ছোট খেলা শিশুর সূক্ষ্ম পেশিগুলির বিকাশ ঘটায়। কিন্তু সেই খেলনা শিশুদের পক্ষে কতটা নিরাপদ? শিশুদের খেলনাও যে বিষাক্ত। এটা বাস্তব সত্য।
লেড, ক্যাডমিয়াম, ব্রোমিন, ক্রোমিয়াম ইত্যাদি শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক। কারণ এগুলি বিষাক্ত কেমিক্যাল। কিন্তু এই সব রাসায়নিক শিশুদের খেলনায় রয়েছে। এর থেকে শিশুদের হাড় নরম হয়ে যাওয়া, কিডনির জটিলতা, জননেন্দ্রীয়র সমস্যা এমনকি ক্যানসার এবং শিশুদের জ্ঞানার্জনে বাধা্র সৃষ্টি হতে পারে। শিশুরা খেলনা মুখে দেবেই, তার থেকে বিষাক্ত কেমিক্যাল খুব সহজেই তাদের পেটের ভেতরে চলে যায়। কোনো কোনো খেলনায় বেশিমাত্রায় ধাতব পদার্থ থাকে, সেগুলি শিশু গিলে ফেললে কিংবা চুষলে তাদের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়।
বাজারে অনেক খেলনা পাওয়া যায় যেগুলিতে বেশিমাত্রার বিষাক্ত ধাতব পদার্থ থাকে। সেই সব খেলনা শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্লাস্টিক বা রাবার ক্ষতি করে না, এমন একটা ধারণা অনেকের আছে। কিন্তু তা একেবারেই ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের খেলনায় বেশিমাত্রায় ক্ষতিকর বা বিষাক্ত পদার্থ থাকে। অনেক খেলনায় লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম থাকে। রঙিন মাটির খেলনাতেও বেশিমাত্রায় লেড ও ক্রোমিয়াম ব্যবহৃত হয়। এই সব খেলনার থেকে শিশুদের শরীরে নানা ধরণের বিষ ঢোকে। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
বিষাক্ত খেলনার কারণে দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। যেসব খেলনা বেশি শব্দ করে সেগুলির কারণে শিশুদের শ্রবণশক্তির ব্যাঘাত ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, শিশুদের ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে শিশুদের নানা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। খেলনা যেন বেশি শব্দ না করে সে বিষয়টি অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশে উন্নত দেশগুলোর অভিভাবকরা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশের অভিভাবকদের বেলায় তা অনেক কম। তাই আমাদের শিশুরা খেলনা ব্যবহার করে নানা ধরনের সমস্যায় পড়ে।

খেলনা থেকে শিশুর শরীরে কীভাবে বিষ ছড়াচ্ছে, দেখা যাচ্ছে একটি পাঁচ বছর বয়সের শিশুর ঘ্রাণশক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে। তার সঙ্গে রয়েছে নাকে জ্বালা ও অন্যান্য উপসর্গ। মেলা থেকে কিনে আনা ইলেকট্রনিক লাট্টু নিয়ে খেলতে খেলতেই বিপদ ঘটেছে। আলো জ্বলা ওই খেলনার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ছোট্ট ব্যাটারি খেলাচ্ছলে শিশুটি নিজের নাকে ঢুকিয়ে ফেলেছে। ভয়ঙ্কর ক্ষারযুক্ত সেই ব্যাটারি যদিও বা বের করা গিয়েছে কিন্তু রাসায়নিক বিষক্রিয়ার ফলে ইতিমধ্যেই প্রচুর ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। শিশুটির চিকিৎসা করাতে প্রায়ই তার বাবা-মাকে প্রায়শই হাসপাতালে হাজির হতে হয় শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে।
অথচ এভাবেই শিশুদের ঘিরে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলনা-শিল্পের বৃত্ত তৈরি হয়েছে। আর সেই খেলনার দুনিয়ায় প্রতি নিয়ত শিকার হচ্ছে শিশুরা। শিশু মনের রসদ হিসেবে যে খেলনা হাতে তুলে দেওয়া হয়, সেটিই তাদের বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ খেলনার গুণমান বজায় রাখার জন্য নেই কোন সরকারী বিধিনিষেধ। ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড (বিআইএস) কয়েক বছর আগেই একটি খসড়া নীতি তৈরি করেছিল কিন্তু সেই নীতি তো এখনও পুরোপুরি চালু হয়েনি।
আইনী বাধ্যবাধকতা না থাকায় ন্যূনতম মান বজায় রাখার দায় নেই খেলনা নির্মাতাদের। ফলে কচিকাঁচাদের নিত্য বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে খেলনায় ব্যবহৃত রং, ধাতু ইত্যাদি। ফুটপাথ, পাড়ার দোকান, এমনকি শপিং মল থেকে কেনা আপাত নিরীহ দৃষ্টিনন্দন খেলনাই ডেকে আনছে বিপর্যয়। সাধারণত ব্যাটারিযুক্ত খেলনা ছোটদের প্রিয় হয়। এ ধরনের খেলনায় আলো জ্বলে, আওয়াজ হয়। নডেচড়ে ঘুরে বেড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভেতরের ব্যাটারি খুব সহজে বেরিয়ে আসছে। সেটা নিয়েও খেলায় মজে শিশুরা।

শুধুমাত্র খেলনা নয়, পকেট ক্যালকুলেটর, প্লাস্টিকের তৈরি চিরুণি- এসবে মিলেছে ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক। আর সব কিছুর মতো ভারতেও প্রচুর পরিমাণ খেলনা বিক্রি হয় প্রতিবছর। দেশে যেমন প্রচুর পরিমাণ খেলনা তৈরি হয়, তেমনই বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয় খেলনা। খেলনা রফতানির ক্ষেত্রে চীনের নামই প্রথমে রয়েছে। আর সব ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে ভারতের বাজারে যে সব খেলনা পাওয়া যায়, তার মধ্যেও রয়েছে ক্ষতিকর রাসায়নিক। সমস্যা যত ধরণের শিশুদের খেলনা সহজে পাওয়া যায় তাদের বেশির ভাগই শিশুদের পক্ষে ক্ষতিকর। শিশুদের রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে কম হওয়ায় তার জেরে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব খুবই দীর্ঘস্থায়ী।