কোভিডকালে উত্তরবঙ্গের বাগিচা শ্রমিকরা বিপন্ন। চা বাগান এলাকায় বাড়ছে বাল্যবিবাহ, নারী পাচার এবং যৌন নিগ্রহের ঘটনা। অতিমারি বাগিচা শ্রমিকদের পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। কোভিডের কারণে বহু বাগান বন্ধ রয়েছে দিনের পর দিন। বাগিচা শ্রমিকদের হাতে টাকা নেই। অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবেই বিধ্বস্ত, এই অবস্থা কাজে লাগাচ্ছে দুষ্কৃতীরা।

উত্তরবঙ্গের ১৮০টি চা বাগানে কাজ করেন প্রায় ০.৩৫ মিলিয়ন মানুষ। বাগানে কাজ করা থেকে শুরু করে তার প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং ইত্যাদি নানা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা শ্রমিকরা প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় প্রায় কর্মহীন। মেয়ে বিয়ের পর অন্য পরিবারে গিয়ে ভালভাবে বাঁচতে পারবে এই আশাতে অনেকে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য রাতারাতি খোঁজখবর না নিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছেন। নারী পাচারকারীরা এটাই তো চায়। এদিকে সরকার থেকে বারবার প্রচার চালানো হলেও অনেক অভিভাবক তা কানে তুলছেন না। অভাবের সুযোগ নিয়ে নারী নিগ্রহের ঘটনাও বাড়ছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে অভাবের তাড়নাতে অভিভাবকরা অভিযুক্তের সাথে ব্যাপারটা আদালতের বাইরে মিটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ তাদের মামলা চালানোর ক্ষমতা নেই।
আগে পাহাড়ের জেলাগুলি থেকে মাসে ১০-১২টি বাল্যবিবাহের ঘটনার অভিযোগ আসতো। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০/২২টি। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার জন্য যে চাইল্ড লাইন করা হয়েছে তারাও এই অবস্থার সামনে অসহায়। তারা বলছেন, নিরুপায় অভিভাবক কিংবা বাবা-মা’রা এত গোপনে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন যে তারা তা জানতেই পারছেন না। আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাট এবং বীরপাড়া ব্লকে এই ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। চাইল্ড লাইন কর্তৃপক্ষ বলছেন পাত্র ও পাত্রীর বাড়ির লোকেরা নিজেরা বোঝাপড়া করে অভাবের তাড়নায় এই অপকর্মটি করছেন। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া তাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এমনিতেই এখানে ছেলেরা ১০/১২ বছর বয়সেই বাগানে কাজে লেগে পড়ে। ১৫০-২০০ টাকা মাইনেতে কাজ করে তারা। মেয়েরাও কাজে যায় অল্প বয়সে। সবই অভাবের কারণে। কোভিড পরিস্থিতিতে সরকার সর্বশক্তি দিয়ে এদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যার গভীরতা এত বেশি যে তা নির্মূল করা যাচ্ছেনা। শ্রমিক নেতারা বলছেন, কোভিড এদের সবার জীবন একেবারে এলোমেলো করে দিয়েছে, এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। প্রশাসনের কাছেও কোভিড মোকাবিলা, টিকাকরণ ইত্যাদি এখন অগ্রাধিকার, পাচারকারী এবং বাল্যবিবাহের সমর্থকরা এই অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। কাছেই ইন্দো-নেপাল বর্ডার। নারী পাচারকারীরা এখানে বরাবরই তৎপর। পরিস্থিতি তাদের কাজের সুবিধা করে দিয়েছে। সরকার এই অবস্থার মোকাবিলার জন্য সক্রিয় হয়েছে কিন্তু স্থানীয় মানুষ নিজেরা তৎপর না হলে, এই সমস্যার মোকাবিলা করা কঠিন।