সব মেয়েরাই মা হতে চান। কিন্তু যখন সেই আশা থেকে বঞ্চিত হন কোনো রমণী, তখন ডাক্তারের উপর বিশ্বাস হারিয়ে মন্দির-মসজিদে গিয়ে আকুল প্রার্থনা জানাতে উপস্থিত থেকেছেন। এ চিত্র গ্রাম-গঞ্জের অনেক জায়গায় এখনও তা লক্ষ্য করা যায়। এক গ্রামীণ মেলায় সন্তানহীনা এমন বহু রমণীদের মা হওয়ার আকুতি শোনা গেল। প্রতি বছর আরামবাগের প্রতাপনগরের সিয়াড়াতে বদরপীরের মেলায় সন্তানহীনা মহিলারা জড়ো হন, কেবল মা হবার আশায়। এজন্য বদর পীরসাহেবের মাজারের পাশেই পুকুরের পুণ্য জলে কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে আঁচল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত আঁচলে জলে ভেসে থাকা ফুল উঠে আসে। সেই সঙ্গে করুণ আকুতি-মিনতি।

কান পাতলে আজও তা শোনা যায়। ইসমাত, মিনতি, শুভ্রাদের (পরিবর্তিত নাম) মতো সন্তানহীনা মহিলারা প্রতি বছর মাঘের প্রথম দিনে বদরপীরের মাজারে গিয়ে মা হওয়ার করুণ প্রার্থনা নিবেদন করেন। তারপর পাশেই পুকুরের স্বল্প জলেই কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকেন। এঁদের অনেকেরই বিশ্বাস, এই পুকুরে যে সমস্ত সন্তানহীনা রমণীরা স্নান সেরে বদরপীরের কাছে সন্তানের জন্য কামনা বাসনা জানিয়েছেন, তাঁরাই মা হয়েছেন। এই রীতিপ্রথায় বিশ্বাসের অটুট বন্ধন আজও রয়ে গেছে। বিজ্ঞানকে ব্রাত্য রেখে মাঘের প্রথম দিন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর বদরপীরের মেলায় যোগ দেন।
দায়িত্বে থাকা মোসলেম শা, সাজাহান শা ও বাবলু শা-রা জানান,শতাধিক বছর ধরে এই প্রাচীন মেলা চলে আসছে। কথিত আছে, এক বদর সাহেব নামে সাধক ছিলেন। নদীর দহর পাশেই সাধনা করতেন। বদরপীর সাহেব মানবকল্যাণে ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর মানব প্রেমের কথা মানুষ আজও ভুলতে পারেনি। তাঁরই সাধনাস্থলে হিন্দু-মুসলমান ধর্ম নির্বিশেষে সম্প্রীতির মেলবন্ধন ঘটেছে। মেলা ও উৎসবের মধ্য দিয়ে ভক্তরা শ্রদ্ধা জানান পীর সাহেবের। এক দিনের এই উৎসবে হরেকরকম দোকান যেমন বসে, একইভাবে নাগরদোলা ও কুটির শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছেন গ্রামের খেটেখাওয়া মানুষ।

উল্লেখ্য, উদ্বেগের বিষয় হল সন্তান না হওয়া রমণীদের করুণ আকুতি মিনতির স্বর। কান পাতলে আজও তা শোনা যাবে। আর গৃহ কল্যাণের জন্য হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এবারেও বদর সাহেবের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে ঘোড়া-সিন্নি দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ করেন। এই প্রথা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। সন্ধ্যায় পীরের গান সকলকে আকৃষ্ট করে। আরামবাগের প্রতাপনগরের এই বদরপীরের মেলাকে ঘিরে হুগলি, হাওড়া ও বর্ধমান জেলার লক্ষাধিক মানুষের আলাদা আকর্ষণ।