পুরাণ লেখকদের তো ‘ফ্রয়েড’ পড়া ছিল না। আর তাঁরা শুধু এ ধরনের আচরণ বর্ণানা করেই ক্ষান্ত হতে পারেন না, কাজেই দেবদেবীকে স্বর্গরাজ্য থেকে নামিয়ে মানুষের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে এরকম অদ্ভুত আচরণের মধ্যে একটা সঙ্গতি আনার চেষ্টা করেছেন। এতে কাহিনির মনোহারিত্বই বেড়েছে। কবি বুদ্ধদেব বসু দেখিয়েছেন যে পূরাণ কাহিনিতে আধুনিক বিচারে যে সুসংবদ্ধতা ও সামঞ্জস্যবোধের কথা, আমরা বলে থাকি তা খোঁজা বৃথা। কারণ যে গ্রীকজাতি সামঞ্জস্যবোধের জন্য বিখ্যাত তাদের পূরাণেও আমরা সুসংবদ্ধতা পাই না। কাজেই এসব ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, “অসংগতি কথাটাই এখানে অসংগত”। (মহাভারতের কথা)
শান্তনুর দ্বিতীয় পত্নী গ্রহণের ঘটনার স্রোত আর একদিকে ফিরল। শান্তনু রাজা, দেবব্রত যুবরাজ। কিন্তু শান্তনুর সঙ্গে আর একজনের দেখা হলো। মৎস্যগন্ধা সত্যবতী ধীবর রাজের (বা দাসরাজের) পালিত কন্যা। আগেই বলেছি এঁর আবার একটি কানীন পুত্র হয়েছিল কুমারী অবস্থাতেই পরাশর ঋষির ঔরসে। সত্যবতী নৌকা পারাপার করতেন। পরাশর ঋষি তাঁকে দেখে আকুল। ঋষির আশীর্বাদে অবশ্য তাঁর ‘ধর্মচ্যুতি’ হলো না। সন্তানের নাম দ্বৈপায়ন কৃষ্ণ (দ্বীপে জন্মগ্রহণ করা জন্য ‘দ্বৈপায়ন’ এবং গাত্রবর্ণের জন্য ‘কৃষ্ণ’) যিনি পরবর্তী যুগে হলেন আমাদের বেদব্যাস। মহাভারতের মূল গল্পে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এই কানীন পুত্রের কথা বেশী কেউ জানল না। আর সত্যবর্তী মৎস্যগন্ধা থেকে ঋষি পরাশরের কৃপায় হলেন পদ্মগন্ধা অথবা যোজনগন্ধা। শান্তনু তাঁকে দেখে মোহিত। কিন্তু সত্যবতীর পালক পিতা বললেন বিবাহ হতে পারে না, কারণ শান্তনুর পুত্র বর্তমান, যিনি যুবরাজ এবং পরে সিংহাসেনর উত্তরাধিকারী। পুত্রস্নেহে শান্তনু ফিরে এলেন বিমর্ষ চিত্তে। দেবব্রত বাবার এরকম বিমর্ষভাব মানতে পারলেন না, কারণটি জেনে সত্যবতীর পিতার কাছ থেকে বিবাহের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এলেন। শুধু পরিবর্তে তিনি নিজে ভয়ানক প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি কেবল নিজেই সিংহাসনের দাবি ছাড়ছেন তা হয় তিনি থাকবেন আজীবন অকৃতদার যাতে তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততিরাও পরবর্তী যুগে সিংহাসন নিয়ে বিবাদে না নামে। এই দুস্তর প্রতিজ্ঞার জন্য নাকি তাঁর নাম হ’ল ভীষ্ম। এ প্রতিজ্ঞা তাঁকে কোনদিন ভাঙতে হয়নি। পিতা শান্তনু পুত্রের এই আত্মত্যাগে প্রীত হয়ে বর দিলেন — তাঁর হবে ‘ইচ্ছামৃত্যু, বীর তিনি, নিজে ইচ্ছা করে অভীষ্ট দিনে মৃত্যুবরণ করতে পারবেন।
শান্তনুর দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। চিত্রাঙ্গদ রাজা হলেন কিন্তু গন্ধর্বের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি হত হলেন। কাজেই ভীষ্ম বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে বসালেন আর তাঁর বিবাহ দেবার জন্য কাশীরাজের তিন কন্যাকে বাহুবলে হরণ করে আনলেন — নাম অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা। তখনকার সমাজে এভাবে কন্যাহরণ বিধির দ্বারা স্বীকৃত। অম্বাকে ছেড়ে দিলেন কারণ তিনি আগে থাকতেই একজনকে (শাল্বরাজকে) মনে মনে পতিত্বে বরণ করেছিলেন। অম্বিকা ও অম্বালিকা এই দুই পত্নী নিয়ে বিচিত্রবীর্য বিচিত্র প্রেমে মশগুল। কিন্তু হঠাৎ ক্ষয়রোগে তাঁর মৃত্যু হলো। বোঝা যায় তাঁর স্বাস্থ্য ভাল ছিল না। পরবর্তীকালে পাণ্ডুও এরকম হঠাৎ মারা গিয়ে জটিল সমস্যার উদ্ভাবন করেন।

সিংহাসন শূন্য। দেবব্রত ভীষ্ম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কাজেই বারবার সিংহাসন তাঁকে বরণ করতে চাইলেও তিনি সিংহাসন বরণ করতে পারেন না। সত্যবতীর অনুরোধ ব্যর্থ হলো। তখন খোঁজা হলো ক্ষেত্রজ সন্তানের উপায়। সত্যবতীর কানীন পুত্রের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের ধর্মশাস্ত্রের দায়ভাগ ও উত্তরাধিকার অংশে বারজন পুত্রের কথা বলা আছে। এ বিষয়ে মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের অংশ উল্লেখযোগ্য। ঔরস, ক্ষেত্রজ, দত্ত, কৃত্রিম, গৃঢ়োৎপন্ন, অপবিদ্ধ — এই ছয় রকমের পুত্র হবেন দায়াদ এবং আত্মীয় (শ্লোক সংখ্যা ১৫৯) অর্থাৎ এঁদের সিংহাসনে বা পিতৃধনে থাকবে যথাক্রমে অধিকার। এখানে পৌর্বাপর্য বিবক্ষিত। অর্থাৎ ঔরসের দাবি সর্বাগ্রে, তাঁর অবর্তমানে ক্ষেত্রজের দাবি — এইভাবে চলবে। এছাড়া আরও ছয় রকমের পুত্রের কথা বলা হয়েছে যাদের পিতৃধনে বা সিংহাসনে অধিকার নেই — কানীন, সহোঢ়, ক্রীত, পৌনর্ভব , স্বয়ংদত্ত এবং শৌদ্র (শ্লোক ১৬০)।
নিজ পিতৃগৃহে থাকাকালীন কুমারীর যদি গোপনে পুত্র উৎপন্ন হয়, সেই পুত্র কন্যা-পরিণেতুর কানীন পুত্র বলে খ্যাত হবে। এভাবেই ব্যাসদেব শান্তনুর কানীন পুত্র এবং পরবর্তীকালে কুন্তীপুত্র কর্ণ হন পান্ডুর কানীন পুত্র। পঞ্চপাণ্ডবও ছিলেন ক্ষেত্রজ সন্তান। কিন্তু কর্ণকে ধরলে ষট্ পাণ্ডব হওয়া উচিত ছিল যদিও তাতে কর্ণের সিংহাসনে অধিকার জন্মাত না। কাজেই ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’-এ আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কুন্তীর মুখ দিয়ে যা বলিয়াছেন —
“দুলাবেন ধবল ব্যজন যুধিষ্ঠির,
ভীম ধরিবেন ছত্র, ধনঞ্জয় বীর
সারথী হবেন রথে, ধৌম্য পুরোহিত
গাহিবেন বেদমন্ত্র — তুমি শত্রুজিৎ
অখণ্ড প্রতাপে রবে বান্ধবের সনে
নিঃসপত্ন রাজ্য মাঝে রত্নসিংহাসনে।”
তা একেবারে কুন্তীরই স্বকপোলকল্পিত। কার্যক্ষেত্রে তা কখনও হতে পারত না। আর তাহলে ত বেদব্যাসেরই সর্বাগ্রে দাবি ছিল হস্তিনাপুরের সিংহাসনে।
বার রকমের পুত্রের একটু পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। তা থেকে আমাদের প্রাচীন সমাজচিন্তা প্রকট হবে। আধুনিক সমাজে বিশেষ করে পাশ্চাত্ত্যদেশে ‘আনওয়েড মাদার’-এর সন্তানকে অর্থাৎ কানীন পুত্র বা কন্যাকে সাধারণত ‘এডপ্টেশন এজেন্সি’তে দিয়ে দেওয়া হয় অথবা ‘অনাথ আশ্রমে’ দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে পাঠান হয়। বিবাহোত্তর জীবনে নিজ স্বামীর কানীন পুত্র বলে পরিচয় দেওয়ার মধ্যে যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ আছে তার কাছে আজকের মানবিক উদারতাও কিঞ্চিৎ ম্লানপ্রভ বলে মনে হয়।
ঔরস পুত্রের লক্ষণ সুপরিচিত। ক্ষেত্রজ সন্তান আজকের সমাজে স্বীকৃত নয়। এর লক্ষণ করতে গিয়ে মনু বলেছেন —
যস্তল্পজঃ প্রমীতস্য ক্লীবস্য ব্যধিতস্য বা।
স্বধর্মেণ নিযুক্তায়াং স পুত্র ক্ষেত্রজঃ স্মৃতঃ।। (শ্লোক ১৬৭)

স্বামী মৃত অথবা ক্লীব প্রতিপন্ন হলে অথবা শারীরিক ব্যাধিবশত পুত্রোৎপাদনে অসমর্থ হলে স্বামীর অথবা গুরুজনের আদেশ অনুসারে বিধিপূর্বক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্ত্রীর যে পুত্র উৎপাদিত হবে সে হবে ক্ষেত্রজ পুত্র। বলা হয়েছে এসব কার্যে দেবর বা স্বগোত্রের কাউকে নিয়োগ করতে হবে (অথবা এক সদ্ব্রাহ্মণকে, মহাভারতকারের মতে) এবং মৃত অথবা ব্যাধিত স্বামীর পুত্র বলেই সে গণ্য হবে, যার ঔরসজাত তার পুত্র হিসেবে ঠিক নয়। এছাড়া ‘দত্রিম’ বা দত্তক পুত্র হবে নিজের পিতামাতার দ্বারা গ্রহীত পিতামাতাকে প্রীতিপূর্বক ও বিধিপূর্বক প্রদত্ত পুত্র। কৃত্রিম পুত্র হবে সে যাকে দোষগুণ দেখে বিচারকরে সমান জাতীয়ের মধ্য থেকে গ্রহণ করা হবে। গৃঢ়োৎপন্ন পুত্রও ক্ষেত্রজের মত আধুনিককালে স্বীকৃত নয়। নিজের বিবাহিত স্ত্রীর গর্ভে উৎপন্ন অথচ নিজের ঔরসজাত নয় এমনকি কার ঔরসজাত তাও অবিজ্ঞেয় (স্ত্রী যেখানে গোপনে ব্যভিচারিণী অথবা বলাৎকারের শিকার) তাকে গূঢ়োৎপন্ন পুত্রের মর্যাদা দিতে হবে। আর মাতাপিতা যদি ত্যাগ করে চলে যায় তাকে গ্রহণ করলে সে হবে ‘অপবিদ্ধ’ পুত্র। কর্ণ ছিল অধিরথের অপবিদ্ধ পুত্র। এ ছয়জনেরই পিতৃধনে যথাক্রমে অধিকার।
কানীন পুত্রের কথা বলা হয়েছে। জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে যদি গর্ভবতী অবস্থায় বিবাহ হয় তবে সেই পুত্র (নিজের ঔরসজাত নয়) হবে ‘সহোঢ়’। মাতাপিতার কাছ থেকে মূল্য দিয়ে কেনা পুত্র হবে ‘ক্রীতক’ পুত্র। স্বামী পরিত্যক্তা অথবা বিধবা যদি স্বেচ্ছায় অন্যকে বিবাহ করে পুনরায় পুত্র উৎপাদন করে সে উৎপাদকের পৌনর্ভব পুত্র বলে খ্যাত হবে। এটা মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের ১৭৫ শ্লোকে উল্লিখিত। একদিক থেকে মনে হয় এখানে যেন বিধবা বিহাহের বিধান সুস্পষ্ট। তবে বিদ্যাসাগর আবার “নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ” ইত্যাদি পরাশর সংহিতার বচন অনুসন্ধানে গেলেন কেন? কারণ বোধহয়এই — পরের শ্লোকেই মনুর বচন ধোঁয়ার সৃষ্টি করে দিয়েছে। মনু বলেছেন —
সা চেদক্ষতযোনিঃ স্যাদ্গতপ্রত্যাগতাপি বা।
পৌনর্ভবেন ভর্ত্রা সা পুনঃ সংস্কারমর্হতি।। (শ্লোক ১৭৬)
এখানে কুল্লুকভট্টের ব্যাখ্যাতেও বিষয়টি বিশেষ পরিষ্কার হয়নি। তিনি বলেছেন — বিবাহের পর স্বামী পরিত্যক্তা অথবা বিধবা স্ত্রীর যদি কৌমার্য নষ্ট না হয়ে থাকে তবে পৌনর্ভব স্বামী তাঁকে যথারীতি সংস্কার অনুষ্ঠানের দ্বারা বিবাহ করবেন। অথবা কৌমার্যকালেই যদি স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে অন্যের কাছে চলে যান এবং পরে যে কোনো কারণেই আবার ফিরে আসেন তবে সেই স্বামী আবার তাঁকে যথারীতি অনুষ্ঠানের দ্বারা বিবাহ করে গ্রহণ করবেন। কুল্লুকের এ ব্যাখ্যাতেও অনেক প্রশ্ন অনুত্তরিত থেকে গেল এবং অনেক প্রশ্নও উঠল। বড় প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন পৌনর্ভর পুত্রের সম্পর্কে। সে কেন পিতৃধনভাগী হবে না? তবে কি সে প্রাক্তন স্বামীর পুত্র বলে গৃহীত? কারণ, যথারীতি বিবাহ সংস্কার হতে তো নতুন স্বামীর ঔরস পুত্র বলেই সে খ্যাত হবে। হয়ত বলা হচ্ছে — পৌনর্ভব পুত্র প্রথম স্বামীর ধন পাবে না। আরও দু রকমের পুত্র — স্বয়ংদত্ত যিনি মাতৃহীন পিতৃহীন হয়ে নিজে এসে কোনো পিতামাতাকে আশ্রয় করেন। আর শৌদ্রপুত্র — ব্রাহ্মণ যদি শুধু কাম চরিতার্থ করতে গিয়ে শূদ্রা বা দাসীতে পুত্র উৎপাদন করেন তিনি হবেন শৌদ্রপুত্র।
মনুর বচন উদ্ধৃত করার ফলশ্রুতি কী? দেখা যাচ্ছে ‘মনুশাসিত সমাজ’ বলতে আমাদের মনে যে নিষ্ঠুর এবং সঙ্কীর্ণ নিয়মেয় ছবি ভেসে ওঠে, যার জন্য সমাজের যূপকাষ্ঠে অনেক সময় মানবতার বলিদান দেওয়া হয়েছে বলে বলা হয়, সেটা বোধহয় সম্পূর্ণভাবে ঠিক নয়। অবশ্য অনেক কথাই মনু বলেছেন যা আজকের দিনে আমরা মানতে পারি না। কিন্তু সে কথা নয়। এখানে বিধিসম্মত উপায়ে মানুষের চারিত্রিক দুর্বলতাকে নিদ্বৃধায় মেনে নিয়ে মানবতার মূল্য দিয়ে যে যে ধরনের সন্তানের পুত্রত্বের দাবি মেনে নেওয়া হলো তা আধুনিক সমাজও অনেক সময় মানতে পারে না। মনে রাখতে হবে ক্ষেত্রজ সন্তান কামজ বা প্রেমজ নয়, এটা যেন যান্ত্রিক ক্রিয়ায় কর্মনিষ্পত্তি — এতে স্বামী বা গুরুজনের অনুমতি বা আদেশ আছে। আমাদের আধুনিক মন এটা এত সহজে মানতে পারে না — তবে বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রয়োগবিদ্যার যুগে যেখানে ‘টেস্ট টিউব বেবে’ উৎপাদিত হচ্ছে এবং স্বীকৃত হচ্ছে এবং যেখানে নাকি অদূর ভবিষ্যতে খোলাবাজারে ধানচালের বীজের মতো সুন্দর স্বাস্থ্যবান বিদ্বান পুত্রকন্যার বীজ বিক্রয় হবে এবং কিনতে পাওয়া যাবে, যেখানে নাকি নোবেল প্রাইজ পাওয়া লোকদের সন্তানোৎপাদনের বীজকে গবেষণাগারে সযত্নে আহরণ করা হচ্ছে এবং যথাযোগ্য প্রার্থনী মাতাকে দেওয়া হচ্ছে সেই মানসিকতা ও সমাজব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ‘যাত্রিক কর্মনিষ্পত্তি’ খুব দুর্বোধ্য ধারণা নয়। আরও উল্লেখযোগ্য এই যে — এই ক্ষেত্রজ ব্যবস্থায় কোনো মানসিক বা ব্যবহারগত জটিলতা যে আসত না তা হয়, হয়ত অনেক ক্ষেত্রেই তা আসত। কিন্তু তার ইতিহাস লেখা হয়নি। একথা স্বীকার করেও বলতে হয় ক্ষেত্রজবিধি প্রাচীন সমাজব্যবস্থার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, এর খারাপ দিকটা যেমন আছে, তেমন বাল দিকটাও এর উপেক্ষণীয় নয়। ‘গূঢ়োৎপন্ন’ পুত্রকে স্বীকার আরএকটি (আধুনিক মতে) আরও দুঃসাহসী পদ৭এপ। এখানে মূল কথা কোনো সন্তানই বেআইনি নয়, শুধু পিতৃধনে অধিকার ও অনধিকার নিয়ে দুটি ভাগ করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে এই বিধানে একদিকে যেমন মানবীয় দুর্বলতাকে স্বীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই উচ্ছৃঙ্খলতা বা ব্যভিচারকে নিয়ম বলে স্বীকার করা হয়নি, তাকে নিয়মের ব্যতিক্রম বলেই ধরা হয়েছে।
হস্তিনাপুরের সিংহাসন নিয়ে আলোচনা চলছিল। ক্ষেত্রজ সন্তান চাই সত্যবতীর দাবি। সিংহাসনের দাবি ভীষ্মের যেমন সর্বাগ্রে। কারণ তিনিই শান্তনুর ঔরস পুত্র, তেমনই আবার ভ্রাতৃবধূ অম্বিকা ও অম্বালিকার সহবাসে ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের দাবিও তাঁর সর্বাগ্রে। সত্যবতী তাই চাইলেন। কিন্তু ভীষ্মর চিরকৌমার্যব্রত, নিজ পিতার সুখের জন্য তিনি সত্যবতীর পিতার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিশেষ করে এই রাজপরিবারের প্রধান স্তম্ভ এখন ভীষ্ম। বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রজ সন্তান হলে তাঁদের লালন-পালন করে মানুষ করে তুলতে হবে — সে ভার ভীষ্মেরই উপর। সে-ক্ষেত্রে নিজের ঔরস সন্তান উৎপাদন করলে আর একদিক থেকেও প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হয়। বীবররাজ চেয়েছিলেন যাতে ভীষ্মের সন্তানেরাও সিংহাসন না পায়। কাজেই সমস্যার সমাধান হলো বেদব্যাস অর্থাৎ দ্বৈপায়ন কৃষ্ণ ব্যাসকে দিয়ে। তিনিও একদিক থেকে বিচিত্রবীর্যের ভ্রাতা, সত্যবতীর কানন পুত্র। সত্যবতী গোপন কথা স্বীকার করলেন। অবশ্য ঋষিদের এ কার্য অহরহই করতে হতো। ব্যাস, হলেন মুশকিল আসান। দুই ভ্রাতৃবধূ সদ্য বিধবা, শাশুড়ী গুরুজন তাঁর আদেশ। ব্যাসদেব বলেলন — রাজপুরীর রমণী অম্বিকা তাঁর কদাকার রূপ অমার্জিত ব্যবহার সহ্য করতে পারবে তো? অম্বিকা চোখ বুজিয়ে ওষুধ গেলার মতো ব্যাপারটি সারলেন। তাতে ব্যাসদেবের হলো অসন্তোষ, ফলে পরম শক্তিশালী পুত্র হ’ল বটে কিন্তু সে হলো জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র। গল্পকার যুক্তি দিলেন — মা ভয়ে বা অবজ্ঞায় চোখ বুজিয়েছিলেন বলে। এতে আসল উত্তরাধিকার সমস্যার সমাধান হলো না। কারণ চক্ষুষ্মান রাজা চাই। জাত্যন্ধের সিংহাসনে অধিকার নেই (মনু ৯ম অধ্যায়, ২০১ তম শ্লোক)। পরিবারিক অন্তর্বিরোধ-এর বীজ এখানেই দৃঢ়ভাবে মাটিতে বপন করা হলো। শান্তনুর দ্বিতীয় বিবাহে যার সূত্রপাত হতে পারত, ভীষ্মের কঠোর প্রতিজ্ঞা যে দুর্ঘটনাকে বন্ধ করতে পেরিছিল, এবারে তাকে আর রোধ করা গেল না।

আবার ডাক পড়ল ব্যাসদেবের। এবারে কনিষ্ঠ ভ্রাতৃবধূর সঙ্গে সহবাসে একটি গোটা পুত্রকে উপহার দাও — এই হলো মা সত্যবতীর দাবি। অম্বালিকা চোখ মুদ্রিত করেননি বটে, কিন্তু ভয় বা আশঙ্কায় তিনি নাকি পাণ্ডুবর্ণপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাই ছেলে হলো বটে, গোটা ছেলে, তবে পাণ্ডুবর্ণ। তাই নাম হলো পাণ্ডু। তিনিই হলেন রাজা। র্যাসদেবের কাছে সত্যবতী আরেকবার পাঠাতে চাইলেন অম্বিকাকে। কিন্তু অম্বিকা ছলনার আশ্রয় নিয়ে রূপবতী এক দাসীকে পাঠালেন ব্যাসের কাছে। দাসীর পরিচর্যায় তুষ্ট হয়ে ব্যাসদেব তাঁকেও একটি ধর্মাত্মা ও বুদ্ধিমান পুত্র উপহার দিলেন। তাঁর নাম হলো বিদুর যিনি নাকি ছিলেন শাপভ্রষ্ট ধর্ম। ধর্মশাস্ত্রের লক্ষণ ও বিভাগ অনুযায়ী বিধুর হলেন শৌদ্রপুত্র। কিন্তু দাসী রাজকূলের, তাই ব্যাসদেবের ঔরসজাত হলেও তিনি হলেন রাজকুলের পুত্র। তবে শাস্ত্রমতে শৌদ্র পুত্রের উত্তরাধিকার থাকত না, কাজেই বিদূরের সিংহাসনে অধিকার ছিল না — এ প্রশ্ন ওঠেও নি।
পাণ্ডুর দুই মহিষী কুন্তী ও মাদ্রী। ধৃতরাষ্ট্রের এক মহিষী গান্ধারী। এধারে পাণ্ডু রাজা হলেও স্বয়ং পুত্রোৎপাদনে অসমর্থ। হয় তিনি ছিলেন রোগগ্রস্ত অথবা অভিশপ্ত। গ্রন্থে এই শাপ বিবরণের চমৎকার বর্ণনা আছে। যাই হোক পুত্রোৎপাদনে অসমর্থ স্বামী ক্ষেত্রজ সন্তান খোঁজে। পাণ্ডু তাই চাইলেন। সৌভাগ্যক্রমে কুন্তী এক মন্ত্র জানতেন। পাণ্ডুর সনির্বন্ধ অনুরোধ কুন্তী মন্ত্র প্রয়োগে প্রথম ধর্মরাজকে ডাকলেন। তাঁর সহযোগে পুত্র উৎপন্ন হলো, নাম যুধিষ্ঠির। ক্রমশ পবন ও ইন্দ্রদেবকে আহ্বান করে কুন্তী পেলেন ভীম ও অর্জুনকে। আর মাদ্রীকে মন্ত্র শেখানোর পর তিনি আহ্বান করলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে। তাঁদের প্রসাদে মাদ্রী পেলেন নকুল ও সহদেবকে। এই হলো পঞ্চপাণ্ডবের উঞপত্তি বিবরণ। সকলেই ক্ষেত্রজ সন্তান। কুন্তীর জানা মন্ত্র কাজে এলো এভাবে। ক্ষেত্রজ সন্তানের উৎপত্তি সাধারণত দেবর বা সদ ব্রাহ্মণের দ্বারা করানো হয়। এক্ষেত্রে পঞ্চপাণ্ডবের উৎপত্তি দেবরের ঔরসে নয়, হলো দেবের ঔরসে।
পণ্ডিত ইরাবতী কার্ভে প্রস্তাব করেছিলেন — যুধিষ্ঠিরের প্রকৃত পিতা বোধহয় বিদুর (যুগান্ত : দি এন্ড অফ অ্যান ইপখ, পুনা, পৃ : ১০০)। এই প্রস্তাবের স্বপক্ষে বোধহয় আরও যুক্তি দেওয়া যায় যে, ক্ষেত্রজ সন্তানের জন্য দেবরের শরণাপন্ন হওয়া শাস্ত্রসম্মত ছিল। লেখিকা কার্ভে এটার উপর বিশেষ জোর দেননি, কেন জানি না। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু এমত মানেন নি। তবে বলতে হয় বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যিক মন এর মধ্যে ‘বিদুর-কুন্তীর গোপন প্রণয়’ সম্ভাবনার বিষয় খুঁজেছেন এবং তাকে নাটকের বিষয় করা যেত একথাও বলেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর ধারণা ভ্রান্ত। ক্ষেত্রজ সন্তান প্রণয়সঞ্জাত হতে পারে না এবং পতি বা গুরুজনের আদেশ অনুসারেই হয়। অন্তত মহাভারতকারের কল্পনায় — কুন্তী বিবাহের পর দ্বিচারিণী ছিলেন না। পাণ্ডু কুন্তীকে এই কাজে প্রবৃত্ত করার জন্য বিরাট বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং শেষে বলেছিলেন — শাস্ত্রে আছে স্বামীর আদেশ উপেক্ষা করে স্ত্রী যদি এ কাজে প্রবৃত্ত না হয়, তবে তিনি পাতকের ভাগিনী হবেন। কাজেই বুদ্ধদেব বসুর ‘মনোরম’ কল্পনাটি কল্পনাবিলাস মাত্র (মহাভারতের কথা ) কার্ভে ও বসুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুক্তি এই যে এরকম হলে যুধিষ্ঠির ক্ষেত্রজ না হয়ে পৌনর্ভব হতেন এবং তাতে সিংহাসনের অধিকার ভীমের কাছে হারাতেন।
গান্ধারীর গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে দুর্যোধন সহ শত পুত্র হয়। এবং ধৃতরাষ্ট্র দাসীর গর্ভেও একটি পুত্র উৎপাদন করেন। নাম যুযুৎসু। তাহলে দেখা যাচ্ছে পাণ্ডবেরা ক্ষেত্রজ সন্তান, কৌরবেরা ঔরস সন্তান। কিন্তু পাণ্ডু ছিলেন রাজাএবং যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের থেকে কিছুদিন আগে জন্মেছিলেন। এখন প্রশ্ন ওঠে যে পাণ্ডু ক্ষেত্রজ সন্তানের জন্য এত আগ্রহী ছিলেন কেন? তিনি নিজের অসমার্থ্যের কথা জানতেন। কিন্তু তবুও কথা ওঠে কেন? রাজশেখর বসু কটাক্ষ করে বলেছেন — “পুত্রের এতি প্রয়োজন যে ক্ষেত্রজ পুত্র পেলেও লোকে কৃতার্থ হয়।” কিন্তু এখানে সত্যিই কি তাই? মূল সমস্যা সিংহাসনের উত্তরাধিকার। পাণ্ডু বোধ হয় এও জানতেন যে তিনি ধৃতরাষ্ট্রের চেয়ে বেশী দিন বাঁচবেন না। রাজত্ব চলে যাবে ধৃতরাষ্ট্র এবং কৌরবদের হাতে। পাণ্ডুর নাম মুছে যাবে হস্তিনাপুর থেকে। তাই এই আগ্রহ। এই নিয়ে নাকি গান্ধারী ও কুন্তীর মধ্যেও একটা ঈর্ষার ভাব ছিল — মহাভারতকার তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গান্ধারীর সন্তান আগেই হতে পারে এই ভেবেই নাকি পাণ্ডু ও কুন্তী ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনে দ্রুত এগিয়েছেন। এ যেন দ্রুত গতিতে একজন আরেকজনকে পরাস্ত করল। যুধিষ্ঠিরের জন্মদিনে গান্ধারী খুব খুশি হননি।
কৌরব ও পাণ্ডবদের দুই প্রধানের নামকরণের মধ্যেই ‘যু্দ্ধং দেহি’ মনোভাব প্রকট। একজন ‘যুধি’ অর্থাৎ যুদ্ধে স্থির থাকেন (পাশা খেলায় নয়)। আরেকজন দুঃসাধ্য যুদ্ধ করেন। কাজেই যুদ্ধ অর্থাৎ সিংহাসন নিয়ে যে একটা লড়াই হবে তা সূত্রপাতেই বোঝা গিয়েছিল। ব্যাপারটা আরও জটিল হলো, পাণ্ডুর হঠাৎ মৃত্যুর জন্য। যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধন দুজনেই তখন শিশু। পাণ্ডুর অবর্তমানে ধৃতরাষ্ট যখন আইনত না হলেও কার্যত রাজা তখন দুর্যোধনের সিংহাসন দাবি মোটেই অসঙ্গত নয়। যদি এই বিষয়টি বোঝা যায় তবে কুরুপাণ্ডবের অন্তর্বিরোধের কথা না বোঝার কথা নয় — কুরুক্ষেত্রের সর্বঘাতী যুদ্ধ যার পরিণতি। দুর্যোধনের অধিকারে সকলের সন্দেহ ছিল, তাই তিনি কপট পাশা খেলার সাহায্যে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলেন। যুধিষ্ঠিরের সহস্র গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি দ্যূতাসক্ত, যার জন্য তিনি সব হারালেন এবং সর্বনাশা যুদ্ধকে ডেকে আনলেন।