| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সন্তান ও সিংহাসনের উত্তরাধিকার (প্রথম পর্ব) : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

Reporter
স্বর্ণাভা কারার / ৩৮৩ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০২২

দুস্তর প্রতিজ্ঞা, অভিশাপ ও বরদান না থাকলে আমাদের রামায়ণ-মহাভারত, রামায়ণ-মহাভারত হয়ে উঠত না। আমাদের আধুনিক মন বলে — এসব অতিপ্রাকৃতশক্তির খেলা রূপকথার মধ্যে চলতে পারে, সাধারণ গল্পে এসব চলে না, অর্থাৎ সম্ভব অসম্ভবের ব্যবধানকে এত সহজে অতিক্রম করা যায় না। বেশ কিছু দশক আগে বাংলায় ‘বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না’ এই শিরোনামে অনেক গল্প লেখা হতো যেগুলি ছিল হয় ‘ভুতুড়ে’ গল্প, ভোজবাজীর কাহিনী না হয় অবিশ্বাস্য ঘটনার বাঙ্ময় রূপ। ‘বুদ্ধি’ বলতে এখানে ‘রাশনালিটিকে’ বুঝতে হবে। ‘ব্যাখ্যা’ অর্থাৎ ‘রাশনাল এক্সপ্লানেশন’। বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ, যুক্তিবিচারের যুগ। আমরা অনেক সময় বলে থাকি — আমরা বর্তমান যুগের ‘আলোকপ্রাপ্ত’ নরনারী।

এখানে ‘আলোকপ্রাপ্ত’ কথাটি ইংরেজির ‘এনলাইটেণ্ড’-এর অনুবাদ। ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও চিন্তাজগতের ইতিহাসে মধ্য সপ্তদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী অথবা প্রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদ পর্যন্ত একটি যুগের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘এজ অফ এনলাইটেনমেন্ট’। ফরাসী দেশীয় চিন্তাধারায় নাকি এর সূত্রপাত, অথবা কেউ কেউ বলেন ইল্যাণ্ডের বেকন, হব্‌স্‌ ও লক এই চিন্তাধারার নাকি অগ্রদূত। ফরাসী দেশের রাজসভার নৈতিক কলুষ ও রাজশক্তির অপব্যবহার এর ইন্ধন যুগিয়েছিল। মূল সূত্র ছিল নির্বিচারে গতানুগতিক ধর্মীয় বা অন্য নিয়ম বা প্রথাগুলোকে না মেনে নিয়ে যুক্তির আলোকে সবগুলির বিশ্লেষণ করা। সাদা কথায় — শুধু বিশ্বাস দিয়ে কাজ হবে না বিশ্বাসের ভিত্তিকে ধরে নাড়া দিতে হবে। ফরাসী দেশে কিন্তু এই আন্দোলন কিছু দিন পরেই অন্তঃসারশূন্য বাক-বিতণ্ডায় পর্যবসিত হয়। অন্যান্য দেশে জার্মানী বা ইংল্যাণ্ডে দার্শনিক মহলে এর একটি সারবান রূপ দেখা যায়। এক হিসাবে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ অথবা ‘আলোকিততা’র মূল সূত্রটি চিরন্তন সত্য। অর্থাৎ যা যুক্তিগ্রাহ্য তাই গ্রাহ্য আর ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এরজন্য স্বতন্ত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু এই মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন যুক্তির প্রয়োজন নেই। বুদ্ধ বলেছিলেন নিকষ পাথরে স্বর্ণকার যেমন সোনাকে পুড়িয়ে ঘষে মেজে তার সত্যতা পরীক্ষা করে থাকে তাঁর শিষ্যরা যেন তাঁর বচনগুলিকে সেভাবেই পরীক্ষা করে সত্যাসত্য যাচাই করে। যথা — তাপাচ্ছেদাচ্চ নিকষাৎ সুবর্ণমির পণ্ডিতৈঃ।/ পরীক্ষ্য ভিক্ষবো গ্রাহ্যং মদ্বচো ন তু গৌরবাৎ।। (তত্ত্বসংগ্রহ ৩৫৮৭ তম শ্লোক)

গ্রীক দার্শনিক পারমনাইডেম নাকি বলেছিলেন — সব কিছুকে মানুষের মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে। কালিদাসও জানিয়েছেন —

সন্তঃ পরীক্ষ্যেতোহন্যতরদ্‌ ভজন্তে

মূঢ় পরপ্রত্যয়নেয়বুদ্ধিঃ।। (মালবিকাগ্নিমিত্র)

জ্ঞানীরা নিজে পরীক্ষা করে যা গ্রাহ্য তাই গ্রহণ করেন, আর মুর্খেরা পরের মুখে ঝাল খায়। আর মনুও দ্বাদশ অধ্যায়ের শেষে বলেছেন —

আর্যং ধর্মোপদেশং চ বেদশাস্ত্রাবিরোধিনা।

যস্তর্কেনানুসংধত্তে স ধর্মং বেদ নেতরঃ।। (শ্লোক ১০৬)

তর্ক দিয়ে ধর্মের অনুশাসন করতে পারেন যিনি তিনিই ধর্মকে জানেন, অন্য লোকে তা পারে না। মোটামুটি যুক্তির নিরিখে সব জিনিসের বিচার — এটা চিরোপলব্ধ সত্য। তবে এই আদর্শ অনুযায়ী কাজ হয় না বলেই ঐতিহাসিক কারণে যুগে যুগে ‘আলোকপ্রাপ্তি’র আন্দোলন করতে হয়।

দার্শনিকপ্রবর কাণ্ট এক প্রবন্ধে এনলাইটেন্মেন্টের লক্ষণ নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছেন যে এই আলোকপ্রাপ্তি হচ্ছে মানুষের শৈশবোচিত অপরিপক্কতা থেকে পরিপক্ক পরিশীলিত প্রাপ্তবয়স্কের কোটিতে উত্তরণ। ‘শৈশব অবস্থা’র অর্থ হলো নিজের বিচারবুদ্ধি যারা ব্যবহার করতে জানে না তাদের পরবুদ্ধিনির্ভরশীলতা। মানুষ, কাণ্টের মতে, নিজের দোষে নিজের বিচার বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে শেখে না। ‘আলোকিততা’ যুগের প্রধান বাণী হলো নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করার জন্য সাহস করে এগিয়ে এসো। (‘হোয়াট্‌ ইজ এন্‌লাইটেনমেন্ট’ প্রবন্ধ কাণ্ট)। এ ধরনের আলোকপ্রাপ্তির যুগ আজও চলছে — এ যুগেরও বাণী যুক্তিসিদ্ধং বচো গ্রাহ্যম্‌। কাজেই অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীর অনেক মতবাদ ও চিন্তাধারা আজ তুচ্ছ ও খণ্ডিত হয়ে গেলেও ‘যুক্তিসিদ্ধতার যুগ’ আজও চলছে। ইউরোপের এই আলোকপ্রাপ্তি অর্থাৎ মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণ — এর ঢেউ ভারতবর্ষেও পৌঁছেছিল। অর্থাৎ এই আলোকপ্রাপ্তি থেকে ভারতবর্ষের আধুনিক শিক্ষিত সমাজ বঞ্চিত থাকেনি। কাজেই আমরা সকলেই একভাবে আলোকপ্রাপ্ত যুগের উত্তরাধিকারী। আমরা স্ববিরোধ সহ্য করতে পারি না, আষাঢ়ে গল্পকে সত্য ঘটনা বলে মানতে পারি না, ভোজবাজীর কাহিনি বাজীকরের কৌশল ছাড়া আর কিছু বলে ভাবতে পারি না।

আধুনিক যুগের গল্পে তাই অতিপ্রাকৃত ঘটনার সমাবেশ সহ্য করা হয় না। পুরাণের গল্পে কিন্তু কল্পনার পাখাকে মেলে উড়িয়ে দেওয়া অনন্ত নীলাকাশের মাঝে। আধুনিক যুগে এ ধরনের কল্পনাকে অবাধ স্বচ্ছন্দগতি দান করতে হলে ‘রূপকথা’র আশ্রয় নিতে হয় অথবা অতি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ‘অতি রূপকথা’ রচনা করতে হয় যাকে বলা হয় ‘সায়ন্স ফিকশন্‌’। এ ধরনের কাহিনির জনপ্রিয়তা বিশেষ করে প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সাহায্যে (স্পেশাল এফেকট্‌স) এ ধরনের গল্পের সার্থক চলচ্চিত্রায়িত রূপের জনপ্রিয়তা আজ ক্রমশ বর্ধমান। মহাভারত রামায়ণের গল্প এদের কাছে একটা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। সুপারম্যান, সুপারহিরো, ইভিল্‌ ফোর্স, কল্যাণময় ফোর্স — দুষ্ট শয়তান — এ সবেরই অল্পবিস্তর প্রতিচ্ছবি রামায়ণ মহাভারতে দেখতে পাওয়া যায়। কাজেই রামায়ণ মহাভারতের গল্প শুনতে বসলে আমাদের সম্ভব অসম্ভবের ব্যবধানকে ভুলতে হবে — তবেই পারব আমরা এই অতলান্ত গল্পরত্নাকরে ডুব দিয়ে রত্ন উদ্ধার করে আনতে।

রাজশেখর বসুর মতে স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ব্যাপারের বিচিত্র এই সংমিশ্রণ — “পড়তে পড়তে মনে হয় আমরা এক অদ্ভুত স্বপ্নদৃষ্টলোকে উপস্থিত হয়েছি। সেখানে দেবতা আর মানুষের মধ্যে অবাধে মেলামেশা চলে, ঋষির হাজার হাজার বৎসর তপস্যা করেন এবং মাঝে মাঝে অস্পরার পাল্লায় পড়ে নাকাল হন, তাঁদের তুলনায় বাইবেলের মেথুসেলা অল্পায়ু শিশুমাত্র।” (মহাভারত-সারানুবাদ-ভূমিকা)। রাজশেখর বসুর ‘স্বপ্নদৃষ্ট লোক’ আমাদের রূপকথার রাজ্য। তিনি এই রাজ্য সম্পর্কে আরও বলেছেন —

“লোকে কথায় কথায় শাপ দেয়, যে শাপ ইচ্ছা করলেও প্রত্যাহার করা যায় না। স্ত্রী-পুরুষ অসংকোচে তাদের কামনা ব্যক্ত করে। পুত্রের এতই প্রয়োজন যে ক্ষেত্রজ পুত্র পেলেও লোকে কৃতার্থ হয়। কিছুই অসম্ভব গণ্য হয় না— মনুষ্যজন্মের জন্য নারীগর্ভ অনাবশ্যক, মাছের পেট, শরের ঝোপ বা কলসীতেও জরায়ুর কাজ হয়।”

আমরা দেখি পরাশরের মত এমন ভালো ঋষি নদী পার হবার সময় হঠাৎ নবযৌবনসম্পন্না পারণকর্ত্রী সত্যবতীর রূপ দেখে অস্থিরচিত্ত হলেন। সত্যবতীরও আপত্তি হলো না শুধু পিতার লোকলজ্জার ভয়। মুনি ঋষিরা নাকি তপোবনে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হতেন। কাজেই পরাশর মুনির পক্ষে গোপনতার ব্যবস্থা করা কিছুই দুষ্কর হলো না। এভাবেই হলো সত্যবতীর কানীন পুত্র দ্বৈপায়ন ব্যাসের জন্ম। আর সত্যবতীর জন্মও স্বাভাবিকভাবে হয়নি। তাঁর পিতা পালক পিতা মাত্র। অদ্ভুত ঘটনাটি এই — উপরিচর বসু নামে এক রাজা মৃগয়া করতে গিয়ে হঠাৎ রূপবতী মহিষী গিরিকাকে স্মরণ করে কামাবিষ্ট হলেন এবং স্খলিত বেতঃ এক শ্যেনপক্ষীকে গিয়ে বললেন — তুমি শীঘ্র গিরিকাকে দিয়ে এসো। শ্যেনপক্ষীর মুখ থেকে তা যমুনার জলে পড়ে গেল আর এক মৎসী (যিনি নাকি শাপভ্রষ্টা এক অপ্সরাই ছিলেন) তা গ্রহণ করে গর্ভিণী হলো এবং দশম মাসে ধীবরের জালে ধৃত হলো। মৎসীর গর্ভে নাকি সত্যবতীর জন্ম। তাই রাজশেখর বসু বলেছেন — মাছের পেট হতেও জরায়ুর কাজ হয়। এসব স্বীকার করতে আমাদের বিজ্ঞানী মন যদি দ্বিধা করে তবে ধরে নিতে পারি উপরিচর বসু পত্নীবিরহে পাগল হয়ে ধীবর জাতির মধ্যে শাপভ্রষ্টা অপ্সরা অথবা তাদৃশ অপ্সরাসম কোন রমণীর গর্ভোৎপাদন করেছিলেন। সেই গর্ভে সত্যবতীর জন্ম। এর আগে শকুন্তলার জন্মও হয়েছিলো এইভাবেই। মেনকা কন্যা প্রসব করেই তাকে মালিনী নদীর তীরে ফেলে ইন্দ্রসভায় চলে গেলেন। কণ্ব তাকে পালন করেন। এবং দুষ্যন্তের বিবরণ থেকে আমরা জানি অপ্সরার গর্ভে যাদের জন্ম তাদের প্রেম নিবেদন করা সহজ। এ বৃত্তান্ত মহাভারতের গোড়াতেই বিবৃত হয়েছে। এবারের কাহিনিতে একটু অন্য ধরনের চমক। মৎসীরূপী অপ্সরা সন্তানের জন্ম দিয়েই স্বর্গে গেলেন। ধীবররাজ সত্যবতীকে পালন করতে লাগলেন। পরাশর মুনিও প্রেম নিবেদনের সময় বলেছিলেন — সত্যবতী, আমি তোমার জন্মবৃত্তান্ত জানি, লজ্জার কারণ নেই।

রাজশেখর বসু আরও বলেছেন, “সৌভাগ্যে বিষয় অতি প্রাচীন ইতিহাস ও রূপকথার সংযোগে উৎপন্ন এই পরিবেশে আমরা যে নরনারীর সাক্ষাৎ পাই তাদের দোষগুণ সুখ দুঃখ আমাদেরই সমান। মহাভারতের যা মুখ্য অংশ কুরুপাণ্ডবীয় আখ্যান তার মনোহারিতা অপ্রাকৃত ব্যাপারের চাপে নষ্ট হয়নি।” আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে আধুনিক বৈজ্ঞানিক রূপকথা বা সায়ন্স ফিকশনেও যাদের সাক্ষাৎ পাই তারাও প্রায় আমাদের সমান। তাদের সুখ দুঃখ আশা আকাঙ্ক্ষা আমাদেরই মত। বসু মহাশয় পরিশেষে বলেছেন — “আজকাল যাকে ‘মনস্তত্ত্ব’ বলা হয় অর্থাৎ গল্পবর্ণিত নরনারীর আচরণের আকস্মিকতা এবং জটিল প্রণয় ব্যাপার, তারও অভাব নেই। অতি প্রাচীন ব্যাস ঋষি যে কোনও অর্বাচীন গল্পকারকে এই বিদ্যায় পরাস্ত করতে পারেন।” (মহাভারত-সারানুবাদ-ভূমিকা)

ব্যাস ঋষির এত বড় সার্টিফিকেট আধুনিককালে সহজে মেলে না। এক রাজপরিবারের মধ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই — এটাই মহাভারতের মূল কাহিনি। একই পরিবারের দুই শাখা পাণ্ডব ও কৌরব। দুই শাখার ইতিহাসের মধ্যেই এই সর্বনাশক বিরোধের বীজ নিহিত ছিল। বিচিত্র এই উৎপত্তির ইতিহাস। হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু। তিনি একদিন গঙ্গার তীরে এক পরমা সুন্দরী রমণীকে দেখে মুগ্ধ হলেন এবং তাঁকে বিবাহ করতে চাইলেন। রমণী ছদ্মবেশী শাপভ্রষ্টা গঙ্গা। মহাভারতে গঙ্গা প্রভৃতি নদীগুলিকে মাঝে মাঝে সুন্দরী রমণীরূপে উপস্থাপিত করা হয়েছে; তাদের বিবাহ হতো এবং সন্তানাদিও হতো। গঙ্গা শুধু বললেন — বিবাহ হবে এই শর্তে — পরিচয় জানতে চেও না ও আমার কোনো কাজেই বাধা দিতে পারবে না। আজকের স্ত্রীস্বাধীনতার যুগেও এরকম শর্ত মানতে গেলে অনেকেই পশ্চাৎপদ হতে পারেন। যাই হোক বিবাহ হলো এবং এক এক করে সাতটি সন্তানকে জন্মমাত্রই গঙ্গা নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন। তাঁরা নাকি ছিলেন শাপভ্রষ্ট বসুগণ যাঁদের উপর পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার অভিশাপ ছিল এবং তাঁরা নাকি মানবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ না করে গঙ্গাদেবীর কাছে প্রার্থী হয়েছিলেন যাতে এভাবে তাঁদের শাপমোচনের ব্যবস্থা করা যায়। শান্তনু এসব জানতেন না। ক্রমশ তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। তিনি অষ্টমগর্ভের পুত্রের সময় বাধা দিলেন। কাজেই গঙ্গাও শর্তানুযায়ী তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন। কিছুদিন পরে অবশ্য শিশুপুত্রকে ফিরিয়ে দিলেন। তাঁর নাম দেবব্রত পরে যিনি হয়েছিলেন ভীষ্ম নামে খ্যাত।

মনে হয় অভিশাপ স্বর্গনাশ প্রভৃতির অবতারণা করা হয়েছে গঙ্গার এই অদ্ভুত আচরণের সমর্থনে। এটা এক ধরনের র‍্যাশনালাইজেশন্। এতে কাহিনির চমৎকারিত্বই গেছে বেড়ে। হয়ত শান্তনুর প্রথমা পত্নীর ব্যবহারই ছিল এ-রকমের অবিশ্বাস্য। এরূপ ব্যবহার বিরল কিন্তু অসম্ভব নয়। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev