শিশুসাহিত্য বললেই শৈশবে উপভোগ্য সাহিত্যের কথা জেগে ওঠে। সে সাহিত্যে ছেলে ভোলানো ছড়া থেকে মন ভোলানো রূপকথা উঠে আসে। অথচ সেগুলোর পাঠ বড়দের মুখে মুখে ফেরে, ছোটদের কানে-চোখে শোনে আর ভাবে। সেখানে সাহিত্যের পাঠে শিশুরা বড়ই অবলা। সেদিক থেকে ভোলানোর চেয়ে জাগানোর জন্য যখন নীতিশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল, ছন্দের দোলার চেয়ে মনের ভেলা আনন্দে ভেসে উঠল, তখনই শিশুর সঙ্গে কিশোরের মিলন হয়ে গেল। শিশুসাহিত্যের কুয়াশাচ্ছন্নতা কেটে গিয়ে শিশু-কিশোর সাহিত্যের বসন্তের আকাশ ঝলমল করে উঠল। রূপকথা, উপকথা, লোককথা, নীতিকথা-র কথকথায় গল্পের বাঁধন গেল শিথিল হয়ে, অলৌকিক গল্পের জগৎ ছেডে লৌকিক জগতের দ্বার হল মুক্ত। শিশুসাহিত্যের অবলা শিশুটিই কিশোরের ছায়ায় কায়া বিস্তারে তার সাম্রাজ্যও গেল বেড়ে। সেথায় শিশুতোষ সাহিত্যের আধারটিই তার বালকত্ব কাটিয়ে কৈশোরের মনোতোষের হদিশ দিল। সেদিক থেকে বাংলা শিশুসাহিত্যের ধারার অগ্রগতিতে শিশু-কিশোর সাহিত্যে রূপান্তর ছিল সময়ের অপেক্ষা। তাতে যেমন শৈশবের সব পেয়েছিল দেশটি রঙিন হয়ে ওঠে, তার চির বসন্তের মধুবন জেগে থাকে, তেমনই বাল্য-কৈশোরের মনপবনের ডিঙা ভেসে চলে, নতুন পৃথিবীর অজানা খনির পরশমণি হাতছানি দিয়ে ডাকে, ইচ্ছেডানায় ভর করে দেশান্তরে পাড়ি দিতে চায় মন, গোয়েন্দাগিরি থেকে দেখনদারি সবেতেই তার অবাধ বিস্তার। সেখানে ছেলেবেলা বা মেয়েবেলার সুরভিত জীবনের উষ্ণ পরশ। শিশুর ধারণা স্বাভাবিক ভাবেই কৈশোরে পৌঁছে যায়। ‘অপরাজিত’ জীবনের ধারায় সকলেই ‘পথের পাচালী’ অপু-দুর্গার শরিক হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে অবশ্য শিশু-কিশোর সাহিত্য শুধু শিশুসাহিত্যের বিস্তার নয়, পূর্ণতা। তার অপর নাম ছোটদের সাহিত্য। সেক্ষেত্রে তার মধ্যের সাহিত্যের নাবালক আর সাবালক খুঁজলে ভুল হবে। আসলে জীবনের পর্ব ভেদে তা ছোট-বড়’র স্তর বিন্যাস। বাংলা সাহিত্যে সেই শিশুকিশোর সাহিত্যের ধারাটিই বিবর্তনের মাধ্যমে নব নব রূপে তার সাম্রাজ্য শ্রবৃদ্ধি করে চলেছে। সেই ধারায় আজীবন যিনি ‘ছোটদের লেখক’ হয়ে সগর্বে লেখনীকে সচল রেখেছিলেন, তিনি শিবরাম চক্রবর্তী (১৯০৩-১৯৮০)। ছোটদের লেখাতেই তাঁর বড় লেখক হয়ে ওঠা। শিবরাম বাংলা সাহিত্যে আত্মনিবেদিত ‘ছোটদের লেখক’। অথচ তাঁর ছোটদের সাহিত্য নিতান্তই শিশুসেব্য নয়, আবার শিশুদের উপযোগী করে লেখাও নয়, একান্তই অভিনব আয়োজন। শিবরামের সাহিত্যভাবনার মধ্যেই তা প্রতীয়মান। এজন্য প্রথমে সেবিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।
শিবরাম চক্রবর্তী ছোটদের লেখায় সক্রিয় হলেও তা শিশুকিশোর সাহিত্যের গতানুগতিক পথে হাঁটতে তিনি নারাজ ছিলেন। ১৯৬২-এর ডিসেম্বরে গোরক্ষপুরে প্রবাসী তথা নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে শিশুসাহিত্য বিভাগে সভাপতির ভাষণের জন্য লিখিত ভাষণ যা ‘কিশোরদের জন্য সাহিত্য’ নামে প্রকাশিত ও সংকলিত হয়েছে, তাতে তাঁর অভিমত অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর মতে, সাধারণ ভাবে শিশুসাহিত্যে শিশু বলতে বোঝায় যাদের বয়স ছয় থেকে ষোলোর মধ্যে। শিবরামের বিবেচনায় তারা শিশু নয়, কিশোর। তিনি মনে করতেন কেবল তথাকথিত শিশুসাহিত্যই নয়, তাদের হাতে দিতে হবে আমাদের সাহিত্যের সম্পূর্ণ সম্ভার। কারণ তারাও বড় হচ্ছে। শিবরামের কথায়, ‘বাড়ন্ত শিশুর পক্ষে শিশু-সাহিত্যের ততটা দরকার নেই যতটা দরকার খাঁটি সাহিত্যের।’ তাঁর মনে হয়েছে, আসন্ন বাস্তবের মুখোমুখো হওয়ার সহায়স্বরূপ তাদের বড়দের সাহিত্য তুলে দিতে হবে। এজন্য শিবরামের পরামর্শ : ‘অতএব তুলে দিন তার হাতে বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ। বিবেকানন্দ, বিভূতি বন্দ্যো, তারাশঙ্কর। হেমেন রায়ের সঙ্গে প্রেমেন মিত্রকেও।’ আরও বলেছেন, ‘আমার মতে বঙ্কিম রবীন্দ্র বিবেকানন্দই হচ্ছে শিশু-সাহিত্য। শৈশবেই সে সব পড়তে হবে।’ তা হলে কি শিশুসাহিত্যের প্রয়োজন নেই, বা, থাকলে কীভাবে, সে-সব নিয়েও শিবরাম ভেবেছেন। সেই লেখাতেই তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। নিজে প্রশ্ন করেছেন, নিজেই তার উত্তর জুগিয়েছেন। যৌবন সীমান্তে পৌঁছে নানান কর্মের জালে আর ভ্যাজালে যারা হৃত-শৈশবে ফিরে যেতে চায়, তাদের জন্যই প্রয়োজন শিশুসাহিত্য বলে মনে করেন শিবরাম।
তাঁর কথায় : ‘আমরা যারা হৃত-শৈশবে ফিরে যেতে চাই—আমাদের হারানো কৈশোর ফিরে পেতে চাই সেই-আমরাই পড়ব সে-সব বই। তার ভিতরেই আমরা সেই পুরানো দিনের স্বপ্ন খুঁজে পাব, নতুন করে ফিরে পাব নিজেদের।’ সেক্ষেত্রে শিশুকিশোর সাহিত্যের ধারণাতেই শিবরামের স্বতন্ত্র প্রকৃতি আপনাতেই সবুজ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তিনি যেভাবে শিশু-কিশোর সাহিত্য ভাবতেন, তাই কি সেই ধরনের সাহিত্য হয়ে উঠেছে, তা নিয়েও তাঁর নিজস্ব ধারণা ছিল স্বতন্ত্র প্রকৃতির। জীবনের উপান্তে যখন তিনি আত্মজীবনীতে লেখনীধারণ করেছেন, তখন তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। এজন্য বিষয়টিকে সেই ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’ আত্মজীবনীতে সুকৌশলে উপস্থাপনের জন্য জনৈক সাংবাদিকের সঙ্গে ছদ্ম সাক্ষাৎকারের আয়োজন করতে হয়েছে তাঁকে। সেই সাক্ষাৎকারেই সবিনয়ে তাঁর অকপট স্বীকারোক্তিতে নিজেকেই সাহিত্যিক হিসাবে গণ্য করায় আপত্তি জানিয়েছেন তিনি : ‘আমি গণ্য করি না। সাংবাদিক বলতে পারেন ইচ্ছে করলে। আসলে আমি হচ্ছি ছোটদের লেখক—ছোট লেখক।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিবরাম চক্রবর্তী কলকাতায় সাহিত্যজীবনের সূচনাপর্বে নবপর্যায় ‘যুগান্তর’(১৯২৩), ‘আত্মশক্তি’(১৯২৪) প্রভৃতি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। তাছাড়া সংবাদপত্রের সঙ্গে তাঁর জীবন জুড়ে ছিল। সেদুটি পত্রিকাও তিনি তরুণ বয়সে সম্পাদনাও করেছিলেন। অন্যদিকে ‘ছোটদের লেখক’ বলেও ‘ছোট লেখক’ বলে আবার বিনয় প্রকাশের মধ্যে তাঁর আত্মসচেতন প্রকৃতিতে কোনোরকম হীনতা নেই, বরং প্রকাশের আভিজাত্যে দীনতাই যে উৎকর্ষমুখর বনেদিয়ানা হয়ে উঠেছে, তা তার অব্যবহিত পরিসরেই প্রতীয়মান। সেখানে শিবরামের লেখকসত্তার প্রখর সচেতনতাই প্রকট হয়ে উঠেছে।
আসলে বিষয়আশয়ে শিবরাম চক্রবর্তী যতই আত্মভোলা হন না কেন, শিল্পীর সত্তাতে তিনি অসাধারণ আত্মসচেতন ছিলেন। ছোটদের লেখায় তাঁর সত্তা কোথায় স্বতন্ত্র, সে বিষয়ে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা প্রথম থেকেই গড়ে উঠেছিল। তাঁর সমকালে যে শিশুসাহিত্যের সেকাল ক্রম হ্রাসমান, কিশোরদের সাহিত্যের উৎকর্ষ ক্রম বর্ধমান, সবই তাঁর নখদর্পণে। এজন্য তাঁর ছোটদের লেখায় তিনি যতই ‘প্রিয় লেখক’ হন, তাতে যে তাঁর অনুসরণ না করার জন্যই, সেকথাও তিনি জানিয়েছেন : ‘সে আমি শিশু সাহিত্য করি না বলেই। ‘করি না’না বলে পারি না বলাটাই ঠিক। সত্যিকার শিশুসাহিত্য করেছেন দক্ষিণারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোর, কুলদাচরণ, সুখলতা রাও, সুকুমার রায় প্রভৃতিরাই—শিশুদের জন্যই লিখেছেন—শিশুদের মত করেই লেখা। সে কলম আমি পাব কোথায়। এ যুগে সে লেখনী আর সেই লেখা হারিয়ে গেছে বলেই আমার মনে হয়। কারো কারো হাতে সে ধরনের লেখা এখনও খেলা করে বটে, কিন্তু সে অতি বিরল।’ সেই ‘বিরল’ লেখকদের কথাও তার অব্যবহিত পরেই সশ্রদ্ধায় উল্লেখ করেছেন। তাঁরা সকলেই তাঁর সমকালের এবং অনেকেই আত্মজীবনী লেখার সময়ে জীবিত বা বয়সে অনেক ছোট ছিলেন। শিবরামের কথায় তাঁরা হলেন : ‘মোহনলাল, সুকুমার দে সরকার, সতীকান্ত গুহর নাম করা যায়। এর পরের ধাপে কিশোর সাহিত্যের পর্যায়ে পড়েন, হেমেনদা, প্রেমেন, নারায়ণ গাঙ্গুলী।
লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, ধীরেন ধরকেও ধরা যায়….’। সেই ধারায় যে তাঁর স্থান হতে পারে না, সেকথাও শিবরাম অব্যবহিত পরে অকপটে শিব্রামীয় ভাষায় ব্যক্ত করেন : ‘আমি এঁদের ধারেকাছেও নিজেকে ধরাতে পারি না। আমার ছোটদের লেখায় কিছু পোলা থাকে আর কিছু পান্ থাকে—এছাড়া কী আছে আর ? পোলাপানদের জন্যে লেখা আমার শিশুসাহিত্য পড়ে তাই কি আপনার ধারণা হয়নি? আমার লেখায় বেশ ভেজাল আছে, সেই অ্যাডালটারেটেড লেখা, ছেলেমেয়েদের অ্যাডাল্ট বানিয়ে ছাড়ে। আর সেজন্যই হয়ত তারা তা ভালোবাসে। কোনো হিতোপদেশ নেই আমার লেখায়, আদর্শ স্থাপনের বালাই নেই কোনো, কোনো বাণী দিইনে আমি—সেই জন্যেই হয়ত শোনার যোগ্য মনে করে তারা। বলুন, বাণী দেবার আমার কী আছে, সোনাই আসলে নেই যেখানে। খাঁটি সোনার নয়, পরিপাটি গিল্টির—সেই কারণেই আমার রচনায় এত ঝুটো অলঙ্কার, এত পানঝাল, বুঝেছেন? পান্মরা বাদ দিলে আমার লেখায় কী থাকে, আর এই কারণেই একটি একটা গিল্টি বোধ সর্বদাই আমার মনে।’ প্রথমত, শিবরাম যেভাবে তাঁর বিনয় প্রকাশ করেছেন, তাতে যে অভিনয় নেই, তাও বক্তব্যের স্বচ্ছতায় প্রতীয়মান। অন্যদিকে তাই তাঁর ছোটদের লেখার স্বতন্ত্র আভিজাত্য। সেখানে পাঠকের দরবারে তাঁর আধিপত্যে ছোটবড়’র ব্যবধান ঘুছে গিয়ে বন্ধুত্বের সহজ আন্তরিকতা লেখকের সঙ্গেও গড়ে ওঠে। এবিষয়ে শিবরাম সেই সাংবাদিককে আগেই তাঁর জনপ্রিয়তার রহস্য ফাঁস করে বলেছেন : ‘কারণ আছে তার। আমার লেখায় ছোটদের কখনই আমি ছোট করে ধরিনি, অবোধ শিশু বলে গণ্য করিণি কখনো। আমার সমকক্ষ বলেই ধরেছি তাদের। বয়স্ক বন্ধুর মতন বিবেচনা করেছি। বড় হবার উপদেশ নয়, বড়ত্বের স্বাদ পেয়েছে তারা আমার লেখায়। সেই আস্বাদ তাদের মনে লেগে রয়েছে এখনো। সেই কারণেই হয়ত এটা হবে।’ অবশ্য ‘বয়স্ক বন্ধুর মতন বিবেচনা’ করায় শিবরামের লেখায় ছোট-বড়’র ভেদ মিলিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এতে অনেক ক্ষেত্রে নাবালকদের পাত্রে বয়স্কদের রসদও পরিবেশিত হয়েছে। সেবিষয়ে প্রসঙ্গক্রমে আলোচনাই শ্রেয়।
অন্যদিকে শিবরাম শিশুসাহিত্যের অস্তিত্বের মূলে ফিরে দেখার অবকাশও লক্ষ করেছেন। সেখানে সেই রাম নেই, সেই অযোদ্ধাও নেই। শিশুসাহিত্যের শিশুর অভাবেই যে তাঁর স্বভাব গড়ে উঠেছে, তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে শিশু-কিশোর সাহিত্যিক হিসাবে তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে স্বকীয় অবস্থান আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নিজেই তিনি সেই প্রসঙ্গে আলো ফেলে জানিয়ে দেন : ‘আমার নিজের কী মনে হয় জানেন? শিশুসাহিত্যের সেই স্বর্ণযুগ আর নেই। শিশুই নেই তো শিশুসাহিত্য। শিশু কোথায় এখন ? শিশুরা জন্মায় না, জন্মালেও বাঁচে না বেশিদিন, মানে, ঐ শৈশব অবস্থাটা অতি ক্ষণস্থায়ী এখন। সময় গতিকে শিশুরা সব বয়স্ক হয়েই জন্ম নিচ্ছে, দেখতে দেখতে বুড়িয়ে যাচ্ছে—দেহের দিকে নয়, মনের দিক থেকে। ….কল্পলোকের গল্পকথা এখন অচল।’ সেদিক থেকে শিবরাম প্রখর আত্মসচেতনতা থেকেই তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্যে নিমগ্ন ছিলেন, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে তাঁর সেই সাহিত্যে শুধু যে ‘পোলাপান’ নিয়েই নয়, তাও তাঁর কথাতেই আবার উঠে এসেছে। জীবনবোধ গড়ে তোলাই যে তাঁর লক্ষ্যে ছিল, সেবিষয়েও তিনি নানাভাবে আলোকপাত করেছেন। শিশুসাহিত্যের কল্পনাপিয়াসী মনের স্বপ্নরঙিন হাতছানিতে সওয়ার করার চেয়ে বাস্তব জীবনে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার প্রতিই শিবরামের শিশু-সাহিত্যের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
সেকালের ঈশ্বরমুখী দীক্ষায় যে কৈশোর অতিবাহিত হত, তাই আধুনিকোত্তর পরিসরে ‘জীবনবোধের শিক্ষা’য় পরিণত করে তোলার প্রয়াস চলে। সেদিক থেকে সাহিত্যের ভূমিকাকেই শিবরাম স্মরণ করেছেন। তাঁর কথায় : ‘সাহিত্যই আমাদের তৃতীয় নয়ন তার সাহায্যেই আমরা নিজেকে অপরকে জগতকে যথার্থরূপে দেখতে পাই। সাহিত্যই সেই দৃষ্টি-প্রদীপ। সাহিত্যিকের দায়িত্বও তাই এই মনের চোখ খুলে দেওয়া। হৃদয়কে জাগানো।’ সেক্ষেত্রে শিশু-কিশোর সাহিত্যের ভোলানো প্রকৃতিই জাগিয়ে তোলার পরিসরে সবুজ সজীবতা লাভ করে। কল্পলোকের দৃষ্টি ভূলোকের অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়। শিবরাম সেই ‘সাহিত্যিকের দায়িত্ব’-এর প্রতি যে তাঁর দৃষ্টিনিবদ্ধ রেখেছিলেন, তাও সেই কৌশলে জানিয়ে দিয়েছেন : ‘আমিও সেই দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছি—আমার সাধ্যমত। কতটা পেরেছি জানিনে, কিন্তু ছোটবেলাতেই যাতে তারা নিজেদের পরিবেশ—সমাজ সংসার মানুষের ধরণধারণ সম্বন্ধে সচেতন হয়, জীবনের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে, প্রয়াস পেয়েছি তার। জীবন আর জগতের সব কিছুই তাদের জানাতেই চেয়েছি—যদিও একটু তির্যকভাবে আড় চোখে দেখলে দেখা যায় আরো।’ শিবরামের শিশু-কিশোর সাহিত্যে ‘তির্যকভাবে আড় চোখে দেখা’র মূলে আছে তাঁর হাস্যরসের সৃষ্টির প্রয়াস। তাঁর ‘পোলাপান’মিশ্রিত সাহিত্যের মূল রসই হাস্যরস। বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যকে তিনিই হাস্যরসের আধারে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। সেদিক থেকে যা তাঁর মনে ‘গিল্টি বোধ’-এ দোষ ছিল, তাই তাঁর প্রকাশগুণে ‘গিল্টি’ সোনা’র গুণ হয়ে উঠেছে। আবার শুধু খাঁটি সোনাতে অলঙ্কার হয় না, তার সঙ্গে খাদ মেশাতে হয়। সেই খাদকে কেউ ভেজাল মনে করে না। শিবরাম যে সেদিক থেকে সাহিত্যের স্বর্ণকার ছিলেন, সে তাঁর অলঙ্কারের বিপুল জনপ্রিয়তাতেই প্রতিপন্ন।
তাঁর সাহিত্যসচেতন শিল্পসত্তাতেই প্রখর শিল্পবোধ। তাঁর কথায়, ‘শিশুসাহিত্যই বলুন আর কিশোর সাহিত্যই বলুন, সর্বাগ্রে তাকে সাহিত্যই হতে হবে।’ সেদিক থেকে শিবরামের শিশু-কিশোর সাহিত্যের স্বতন্দ্র আবেদন তাঁর বংশানুক্রমে বাঙালিমানসে রসদ জুগিয়ে চলার মধ্যেই প্রতীয়মান। ১৯৭৫-এ তিনি অভিজাত ‘আনন্দ পুরস্কার’ পেয়েছিলেন। তাঁর ‘আনন্দবাজার পত্রিকা।দেশ।১৩৮২’ প্রদত্ত মানপত্রে লেখা হয়েছে : ‘বাংলা সাহিত্যে আপনি স্বয়ং একটি প্রতিষ্ঠান, কল্পনার এক অক্ষয় ভাণ্ডার নিয়ে আপনি বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছেন এই শতাব্দীর প্রায় শুরুর দিকে। একদিন যে সব শিশুরা আপনার রচনায় মুগ্ধ হয়েছিল আজ তাদের পুত্র কন্যা এবং পৌত্রীরাও সমানভাবে আপনার সম্পর্কে আকৃষ্ট। তিন পুরুষ ধরে আপনি শিশুদের কাছে রসের কাণ্ডারি। শুধু শিশুদের কাছে নয়। একসময় আপনি দেশাত্মবোধক রচনাতে গভীর মনোনিবেশ করেছিলেন। আপনি লিখেছেন বাস্তবধর্মী নাটক। চিন্তামূলক প্রবন্ধ এবং কাব্য রচনাতেও আপনার সুনাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্য সব কিছু ত্যাগ করে আপনি শিশুদের জন্যেই সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছেন। বাংলা সাহিত্য আপনার কাছে ঋণী।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিবরাম সাহিত্যজীবনের সূচনাপর্বে সিরিয়াস সাহিত্যচর্চায় কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-নাটক প্রায় সবেতেই লেখনীধারণ করেছিলেন এবং পরিচিতিও পেয়েছিলেন। সেই শিবরামই ১৯৩৫ থেকে ‘মৌচাক’ পত্রিকায় ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’ গল্পটির মধ্য দিয়ে হাস্যরসের মাধ্যমে ছোটদের সাহিত্যে মনোনিবেশ করে আর পিছনে ফিরে তাকাননি। শিবরাম চক্রবর্তী হয়ে ওঠেন স্বকৃত বানানে শিব্রাম চক্কোত্তি বা চকরবরতি। আজীবন তিনি ছোটদের পাতে রসদ জুগিয়ে গিয়েছেন। তাঁর প্রখর সাহিত্যসচেতনতাই তাঁকে হাসির লেখক বলে হাস্যকর করে তোলেনি, হাসির রাজা করে বনেদি আভিজাত্য প্রদান করেছে। অবশ্য হাস্যরসের আধারে তাঁর সাহিত্য সবসময় ছোটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অনেকসময় ছোট-বড়’র পার্থক্য বেমালুম মুছে গেছে।
আসলে শিবরাম হাস্যরসকে মূলধন করে তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্যকে উপাদেয় করে তুলেছেন। এমনিতে শিশু-কিশোর সাহিত্যে নানাভাবে হাস্যরসের আমদানি করা হয়। সেখানে হাসির বিনোদনী পাঠে শিশু-কিশোরমনের আশুতোষ প্রকৃতি আপনাতেই সজীবতা লাভ করে। শুধু তাই নয়, হাস্যরসেই শিশু-কিশোর সাহিত্যের আকর্ষণ স্মরণীয় হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে শিবরাম তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্যে হাস্যরসেই তার প্রাণের পরশ বয়ে দিয়েছেন। একের পর এক গল্প লিখেছেন, একের এক গল্পের বই পাঠককে উপহার দিয়েছেন। ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’ (১৯৩৫), ‘শুঁড়ওলা বাবা’ (১৯৩৫), ‘কাকাবাবুর কাণ্ড’ (১৯৩৭),‘কালান্তক লালফিতা’ (১৯৩৭), ‘মন্টুর মাস্টার’ (১৯৩৭) প্রভৃতি গল্পের বইয়ের মাঝেই ১৯৩৬-এ গল্পের সিরিজ ‘কলকাতার হালচাল’-এ তাঁর অমর চরিত্র তথা আসামের কাঠ ব্যবসায়ী বেহিসাবী বর্ধনভাতৃদ্বয় হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন চলে এসেছে। শুধু তাই নয়, অসংখ্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন শিবরাম। পারিবারিক সম্পর্কে তারা কত ভাবেই না প্রকাশমুখর তাঁর গল্প-উপন্যাসে ! কাকা (নিকুঞ্জ, কুঞ্জ), বোন (প্রিসিলা, ইতু, বিনি, জবা), মাসি (ডালুমাসি) ছাড়াও পঞ্চানন, মণ্টু, প্রাণকেষ্ট, গোয়েন্দা কল্কেকাশি এবং স্বয়ং শিব্রাম, কত বিচিত্র চরিত্র।
আবার ১৯৩৭-এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাড়াজাগানো কিশোর উপন্যাস ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। সেটি ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় সিনেমা (১৯৫৯) হওয়ায় জনসমাদরে সুপরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে শিবরামের শিশু-কিশোর সাহিত্যের পথ দ্রুততার সঙ্গে জনপ্রিয়তার রাজপথে পরিণত হয়। দেখতে দেখতে তাঁর হাসিখুশির ভাঁড়ারও উপচে ওঠে। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪০-এর মধ্যেই শিবরামের পনেরোটি মৌলিক গ্রন্ত প্রকাশিত হয়েছে। আবার ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫-এর মধ্যে তাঁর নয়টির মতো গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে। এছাড়া রয়েছে তাঁর বিদেশি গল্পের স্বচ্ছন্দ অনুবাদের বই। ‘টমসয়্যায়ের গল্প’ (১৯৩৯), ‘এক রোমাঞ্চকর অ্যাডবেঞ্চার’ (১৯৪০) প্রভৃতি তার পরিচয়। এভাবে ১৯৭৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরেই শিবরামের একাধিক বই বেরিয়েছে। অন্যদিকে বেশকিছু কবিতাও লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখ্য, ‘পৃথিবী বানানো’, ‘জন্মদিনের উপহার’, ‘রিহার্সাল’, ‘জমা খরচ’, ‘কথাশিল্পী’, ‘খুকুর ভাবনা’ প্রভৃতি। সেগুলি স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে প্রকাশিত না হলেও ‘শিব্রাম রচনাবলী’ থেকে ‘শিব্রাম অমনিবাস’-এ স্থান লাভ করেছে। এছাড়া তাঁর শিশু-কিশোর সাহিত্যে অসংখ্য নাটকও রয়েছে।
১৯৬৬-তে তাঁর নাট্য-সংকলন ‘শিবরাম চক্রবর্তীর শিশুনাট্য’ নামে প্রকাশিত হয়। সেগুলির মধ্যে যেমন তাঁরই গল্পের নাট্যরূপ রয়েছে, তেমনই চোদ্দটি নাটকের মধ্যে শেষ তিনটি নাটক ‘দেবা ন জানন্তি’, ‘প্রেম বিচিত্র বস্তু’ ও ‘উদ্বাস্তবিক’ সম্পর্কে সূচিপত্রে লেখা হয়েছে, ‘নেহাৎ ছোটদের জন্য নয়’। শুধু নাটকের ক্ষেত্রেই নয়, গল্প-কবিতার ক্ষেত্রেও বিষয়টি লক্ষণীয়। আসলে শিবরাম হাসির তুবড়ি ফাটিয়ে হাস্যরসের ফোয়ারা ছুটিয়ে চলতে গিয়ে মুখে হাসি ফোটানোর জন্য অকাতরে লিখে গিয়েছেন। সেখানে হাস্যরসে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বয়সের ছোট-বড়’র ভেদ মুছে গেছে। শুধু তাই নয়, সেগুলি শিশু-কিশোর সাহিত্য, না হাসির গল্প, তা নিয়ে ধন্দের অবকাশ তৈরি হয়। সেদিক থেকে বয়সে নয়, মনের দিক থেকে যারা শিশু রয়েছেন, তারাও তাঁর সে-সবের পাঠক। সেজন্য শিবরাম তাঁর সাহিত্যকে ‘আডাল্টটারেটেড’ বা মিশ্রিত বলতে চেয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাঁর সাহিত্যের লক্ষ্যেই যে সবার মনে আমোদ প্রদান করা ছিল, সেকথাও ‘শিব্রাম রচনাবলী’র পাঁচ খণ্ডের প্রতিটি খণ্ডের শিরোনাম পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে। শিবরাম চক্রবর্তী স্বয়ং সম্পাদিত সেই রচনাবলির সেই পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘বলে গেছেন উপনিষদ/আরাম নাহি অল্পে।/বাড়ি-শুদ্ধ সবার আমোদ/শিবরামের গল্পে।’ সেই আমুদে প্রকৃতি যেমন তাঁর শিশু-সাহিত্যের গুণ, তেমনই তা দোষেরও বটে। কেননা সব আমোদ যেমন শিশু-কিশোরদের অবোধ্য, তেমনই অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অহিতকর। সেদিক থেকে আত্মজীবনীর সূচনাপর্বে তাঁর মানসিক দুর্বলতা প্রকাশের মধ্যেই শিবরামের মহত্তর সাহিত্যবোধেরই পরিচয় উঠে এসেছে বলে মনে হয়।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।