পুজো হবে, আর পূজাবার্ষিকী থাকবে না, তা কি কখনো হয়? পূজার আনন্দের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে, জড়িয়ে আছে নতুন পূজাবার্ষিকী পড়ার আনন্দ। আমাদের ছোটবেলায় নতুন পূজাবার্ষিকীর ঘ্রাণ নিয়েই শুরু হতো পুজোর আনন্দের উদযাপন। ‘পুজোয় চাই বাটার জুতো’র মতোই বড়দের কাছে আবদার ছিল ‘পুজোয় চাই নতুন পূজাবার্ষিকী’।
কেশবচন্দ্র সেনের ইন্ডিয়ান রিফর্ম এ্যাসোসিয়েশন-এর উদ্যোগে প্রকাশিত হত সাপ্তাহিক সুলভ সমাচার। ১৮৭৩ সালে এক পয়সা মূল্যের এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হল দুর্গাপূজার প্রাক্কালে। ‘ছুটির সুলভ’ নামের সেই সংখ্যাকে শারদীয় সংখ্যা বা পূজাসংখ্যার পথিকৃত বলে ধরা যায়। বিজ্ঞাপনে লেখা হলো,—
‘আগামী বৃহস্পতিবার ছুটির সুলভ বাহির হইবে। কেমন সুন্দর কাগজ, কেমন পরিষ্কার ছাপা, কেমন মজার ছবি, অথচ কেমন সস্তা দাম। ছেলে বুড়ো সকলেই মজা করিয়া ছুটির সুলভ পড়ো। দেখ যেন কেউ ফাঁকি পড়ো না।’ যদিও ছোটদের জন্য বরাদ্দ ছিল বাসন্তীরঙা কাগজে ছাপা একটি মাত্র ছবি — এক আদুরে ছেলে গাল ফুলিয়ে সাবানের বুদ্বুদ ওড়াচ্ছে।

ছোটদের জন্য পূজাবার্ষিকী প্রকাশের ব্যাপারে পথিকৃত নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের জামাতা (মীরা দেবীর স্বামী) বিলেতে থাকার সময়ে দেখেছিলেন সেখানে বড়দিন উপলক্ষ্যে বিভিন্ন পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়, বড়োদের এবং ছোটদের জন্যও। তাঁর মনে হয় বাংলাতেও দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে ছোটদের জন্য এরকম কিছু করা যেতে পারে।
সেই ভাবনা অনুযায়ী আবির্ভূত হল ‘পার্বণী’, ১৩২৫ বঙ্গাব্দে, ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে। নামকরন করেছিলেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। স্বাভাবিকভাবেই এই পুজোবার্ষিকীতে লেখক তালিকায় অধিকাংশই ঠাকুর পরিবারের মানুষজন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ প্রমুখেরা। এছাড়া, শরৎচন্দ্র, শিবনাথ শাস্ত্রী, সুকুমার রায়-এঁরাও ছিলেন। অলংকরণ করলেন গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু। সুকুমার রায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘খাইখাই’ পার্বণীতেই প্রথম প্রকাশিত হয়। তাঁরই তত্ত্বাবধানে পার্বণীর রঙীন ছবিগুলি সন্দেশের প্রেস থেকে ছাপা হল।
ঘরে ঘরে সব ছেলেমেয়েদের হাতে বইটি পৌঁছবে এই আশা করে নগেন্দ্রনাথ সংখ্যাটির দাম ধার্য করেছিলেন দেড় টাকা। দুমাসের মধ্যে হাজার বই বিক্রিও হয়ে গেল। কিন্তু প্রকাশের ব্যয় বেশী হওয়ায় তাঁকে অনেকটা ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল। খুশী মনেই তিনি এই ক্ষতি মেনে নিয়েছিলেন। খুশী হয়েছিল তারাও, যাদের জন্য নগেন্দ্রনাথের এই আন্তরিক প্রয়াস এবং ক্ষতি স্বীকার। এক পার্বণী পড়ুয়া চিঠি লিখেছিল, — ‘আজকে এখনি তোমার পার্বণী পেয়েছি। আর খুউউউউব খুশী হয়েছি। পার্বণী খুউউব সুন্দর হয়েছে ….।’
নগেন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল প্রতি বছরই এই পূজাবার্ষিকী বার করার। কিন্তু পরের বছর বার করা গেল না, তার পরের বছর দ্বিতীয় সংখ্যা বেরোল এবং সেটাই শেষ সংখ্যা।

পার্বণী আর না পেলেও পুজোয় ছোটদের হাত একেবারে শূন্য থাকল না। ১৯১৯ সালে এল বিদ্যাসাগরের দৌহিত্র সুরেশচন্দ্র সমাজপতির সম্পাদনায় ‘আগমনী’, আর এম সি সরকারের প্রকাশনায় ‘রঙমশাল’। তবে এই দুটিই স্বল্পায়ু হয়েছিল। ছোটদের পুজোবার্ষিকীর মাঠে প্রথম লম্বা ইনিংস খেলল আশুতোষ লাইব্রেরির আশুতোষ ধরের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘শিশুসাথী’। ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় দেড় টাকা দামের পুজোবার্ষিকীটির আবির্ভাব ১৯২৬ সালে। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, সুনির্মল বসু, গোলাম মোস্তাফা , দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার প্রমুখ তখনকার নামীদামি লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ। প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে বার্ষিক শিশুসাথী ছোটদের পুজোর আনন্দের সাথী হয়ে ছিল।
ছোটদের দরবারে ক্রমে আরো অনেক পুজোবার্ষিকীর আগমন হল। বিভিন্ন নামীদামী সাহিত্যিকদের সম্পাদনায় সেগুলি ছোটদের কাছে পুজোর ডালি সাজিয়ে আনত। যেমন, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের ‘রামধনু’, সুধীরচন্দ্র সরকার ‘মৌচাক’, স্বপনবুড়োর ‘মধুচক্র’, ধীরেন্দ্রলাল রায়ের ‘আনন্দ’, ক্ষিতীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘রামধনু’ প্রভৃতি। সন্দেশ তো ছিলই। শরৎ সাহিত্য ভবনের উদ্যোগে হেমেন্দ্র কুমার রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত পুজোবার্ষিকীগুলি দশ বছর ধরে ছোটদের আনন্দ দিয়েছে। কলরব, ছায়াপথ, দেশের মাটি— প্রত্যেক বার্ষিকীর স্বতন্ত্র নাম।

ছোটদের জন্যে পূজাবার্ষিকীর সম্ভারে সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান দেব সাহিত্য কুটিরের। মাঝে দু-বছর বাদ দিয়ে ১৯৩১ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত একটানা পাঁচ দশক ধরে ছোটদের পুজো রঙীন করে তুলেছিল এঁদের প্রকাশিত পূজাবার্ষিকীগুলি। প্রথম বার্ষিকীটি ছিল কবিতা সংকলন, ‘ছোটদের চয়নিকা’। একে একে বেরোতে থাকে দেবায়ন, নবপত্রিকা, আগমনী, বেণুবীণা, ইন্দ্রনীল, মন্দিরা — প্রতি বছর নতুন নতুন নামে।
লিখতেন রবীন্দ্রনাথ, কাজি নজরুল ইসলাম, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী — রীতিমতো নক্ষত্রখচিত লেখকসূচী। হাজির থাকতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় একটি করে সরস গল্প নিয়ে। ১৯৪৫ সালের বার্ষিকী ‘আলপনা’তে প্রথম আত্মপ্রকাশ করলেন ঘনাদা, গল্পের নাম ‘মশা’। এরপর প্রতিবছর ঘনাদার দেখা পাওয়া যেতে লাগল এক একটি বার্ষিকীতে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রবাদপ্রতিম ছড়া ‘তেলের শিশি ভাঙলে পরে খুকুর পরে রাগ করো’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘রাঙারাখি’তে, ১৯৪৭ সালে। হাজির থাকত টেনিদাও। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পিনডিদা’র সঙ্গে কিশোর সাহিত্যে এলেন এক অভিনব মামা, রাজকুমার মৈত্রের ‘বগলামামা’। কয়েকটি সংখ্যায় পি সি সরকার (সিনিয়র) ম্যাজিক শিখিয়েছিলেন। সমরেশ বসু লিখতেন কিশোর চরিত্র গোগোলের রহস্যসন্ধানের গল্প। রঙীন ছবি, বিষয় বৈচিত্র্য, ছাপার গুণমান, লেখকের সমারোহ, নামের নতুনত্ব — এসব কিছু মিলিয়ে দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকীগুলি ছিল পূজার এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণ — নতুন জামা, নতুন জুতোর মতোই। পুজোয় দেব সাহিত্য কুটিরের শেষ নিবেদন ‘আরাধনা’। এই পূজাবার্ষিকীর প্রকাশ বন্ধ হয়ে গিয়ে পূজোর আনন্দ অনেকটাই কমিয়ে দিয়ে গেল।

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীর প্রথম প্রকাশ ১৯৭১ সালে। দুটাকা দামের এই বার্ষিকীতেই প্রথম পাঠকের সামনে এলেন কাকাবাবু, সন্তুকে নিয়ে। গল্পের নাম ‘ভয়ংকর সুন্দর’। এরপর প্রতিবছরই সত্যজিৎ রায়ের কাহিনীর সঙ্গে কাকাবাবুর কাহিনীও এক বড়ো আকর্ষণ হয়ে দাঁড়াল। খেলার জগত নিয়ে মতি নন্দীর কালজয়ী সব গল্প — ননীদা নট আউট, স্টপার, স্ট্রাইকার, কোনি প্রভৃতি পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার সংখ্যাগুলিতে প্রকাশিত হচ্ছিল। বুদ্ধদেব গুহর ঋজুদা, সমরেশ মজুমদারের সত্যসন্ধানী অর্জুন তো ছিলই। আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীগুলির আরেক বড়ো আকর্ষণ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনীগুলি।
বর্তমানে ছোটদের পূজাবার্ষিকীর সংখ্যা কমে গেছে। তবে আনন্দমেলা ছাড়াও রমরমিয়ে রয়ে গেছে কিশোরভারতীর শারদীয় সংখ্যা, আর শারদীয় শুকতারা। কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞানেরও শারদীয় সংখ্যা পাওয়া যায়। আরো কিছু কিছু কিশোর পূজাসংখ্যা প্রকাশিত হয়, তেমন প্রচার ছাড়াই।
ভাবতে ভালো লাগে যে এত কিছু পরিবর্তনের মধ্যেও ছোটদের জন্য পূজাবার্ষিকী এখনো বের হয়, আর যাদের জন্য এগুলি বেরোয় তারা এখনো এগুলি চায়। এস ওয়াজেদ আলির ভাষায় ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে’।
ঋণ : ১. পার্বণীর কিছু কথা – পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, ২. ঘনাদার গল্প, কালানুক্রমিক পঞ্জি :সংকলনে শুভেন্দু দাশমুন্সি, ৩. স্বপ্ন মায়ার দিনগুলি : রূপা মজুমদার (আজকাল ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯), ৪. পুজোসংখ্যার সেকাল-একাল : সন্দীপ কুমার দাঁ।
ছবি : ব্যাক্তিগত সংগ্রহ
খুব ভাল লাগল সুন্দর সংগ্রহ