আসলে রুশবিপ্লবোত্তর পরিসরে বাংলার সাম্যবাদী রাজনৈতিক দিশায় নতুন করে প্রচলিত ধর্মীয় মূল্যবোধেই বিতর্কের অবকাশ তৈরি করে। সেখানে মস্কো বনাম পণ্ডিচেরির প্রতিতুলনার অবকাশের পাশে শূদ্র জাগরণের বার্তাও আন্তরিক হয়ে ওঠে। সমাজের বৈষম্যবোধে মানবিক আবেদন নিবিড়তা লাভ করে। শ্রেণিবৈষম্যের নিরিখে সমাজের শ্রমজীবী মানুষের সাম্যবাদী অধিকারবোধে ঐক্যচেতনা জাগরণে স্বাভাবিকভাবেই কমিউনিস্ট রাজনীতির আদর্শ নানাভাবে ক্রমশ তীব্রতা লাভ করে। সেক্ষেত্রে যখনই সমাজের নিম্নবর্গের অস্তিত্বসংকট সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তখনই তার সেই ঐক্যচেতনা আরও প্রসারিত হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, তেতাল্লিশের দুর্ভীক্ষ থেকে ছেচল্লিশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সবেতেই তার বিস্তার লক্ষণীয়। শুধু তাই নয়, অধিকারের ক্ষেত্রে যা ছিল অতীতের অসংগঠিত শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ, তাই ক্রমশ রাজনৈতিক আদর্শে সুসংগঠিত আন্দোলন হয়ে ওঠে। বাংলার কৃষিক্ষেত্রে ১৯৪৬-এর তেভাগা আন্দোলন তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সেদিক থেকে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টি যেমন উঠে আসে, তেমনই সার্বিক দাসত্বমোচনের দাবিপূরণও প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে। স্বাধীনতাঁর নামে শাসকের পরিবর্তনই শুধু তার রূপান্তর মনে হয়, শোষকের প্রকৃতির রূপে-রঙে অবস্থান্তর ঘটে মাত্র। শুধু তাই নয়, সেই স্বাধীনতায় উৎকর্ষবোধের পরিবর্তে অপকর্ষের চেতনা স্বাভাবিক হয়ে আসে। সেখানে আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ বা ‘নাকের বদলে ন্ররুন’ পাওয়ার ভাবনা জেগে ওঠে। এজন্য দেশের স্বাধীনতার চেয়ে বামপন্থী জনমানসে মানুষের বৈষম্যহীন শোষণ-শাসনমুক্ত সমাজজীবনের হাতছানি আন্তরিক মনে হয়। অন্যদিকে পরাধীন দেশকে স্বাধীন করার মাধ্যমে দেশবাসীর দাসত্ব মুক্তির মধ্য দিয়ে ‘সব পেয়েছির দেশ’-এর স্বপ্নকে রূপায়িত করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই দেশের জাতীয়বাদী রাজনীতির কাছে কমিউনিস্ট আদর্শ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এজন্য দেশ স্বাধীন হয়, কিন্তু স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে মিলিয়ে যায়। যে স্বাধীনতা ছিল সবকিছুর উত্তর, তাই সবক্ষেত্রে প্রশ্নের আধার হয়ে ওঠে। এদেশের বামপন্থীরাই সেই প্রশ্নকে প্রকট করে সোচ্চার হয়েছেন।
১৯৪৭-এর আগস্টে দেশের দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতাকে তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। ১৯৪৮-এর ২৬ মার্চ ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ১৯৪৯-এ নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতায় দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসে শ্লোগান ওঠে, ‘এ আজাদী ঝুটা হ্যায়।’ অন্যদিকে সে বছরেই ১ অক্টোবরে মাও সেতুঙের নেতৃত্বে চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেদিক থেকে সমাজতন্ত্রী বা গণপ্রজাতন্ত্রী চীন বামপন্থীদের কাছে আরও একটি সাম্যবাদী মডেল বয়ে আনে। সেটি পূর্বের রাশিয়ার চেয়েও জনমানসে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। কেননা ইতিমধ্যে রাশিয়ার ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি তার নেতিবাচক দিকগুলিও চর্চায় উঠে আসে। এজন্য বামপন্থীদের মধ্যেও দুটি দিক ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় সেই দিকগুলি দুটি স্বতন্ত্র ধারায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সোভিয়েত বা মস্কোপন্থী আর চীনা বা পিকিংপন্থী। প্রথম পন্থীদের নির্বাচনের মাধ্যমে সাংবিধানিক ক্ষমতা লাভে আপত্তি নেই, অন্য পন্থীর সমাজবিপ্লবের পক্ষপাতী। এজন্য প্রয়োজনে অস্ত্রধারণ বা সহিংসার পথেও মস্কোপন্থীদের দ্বিধাহীন চিত্ত। সেদিকে থেকে স্বাধীনতার বিনিময়ে দেশভাগে দ্বিধাবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গের ‘ঝুটা আজাদী’ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের উত্তরণেও সেই বহুস্তরীয় রাজনীতি ও সমাজমানসের পরিচয় বর্তমান। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ সেই উত্তরণ প্রয়াসী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিশ্বস্ত সাময়িক ভাষ্য। এজন্য তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতটি ফিরে দেখা প্রয়োজন।
পাকিস্তানের অধীনে পূর্ববঙ্গের বাঙালির স্বপ্ন যে ব্যর্থ হয়েছি, তা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষিত না হওয়ার মধ্যেই প্রকট হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলাকে অন্যতম দাপ্তরিক ভাষার প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। এজন্য ১৯৪৮-এর ১১ মার্চে সে দেশে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। তার কিছুদিন পর ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহম্মদ আলি জিন্না পূর্ববঙ্গে এসে জানিয়ে যান উর্দুই সে দেশের রাষ্ট্রভাষা। ২৪ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও তিনি সেকথা আবার স্মরণ করিয়ে দেন। এতে স্বাভাবিক ভাবেই সেই ভাষা আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতা লাভ করে। অচিরেই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। ১৯৪৯-এর ২৩ জুন হোসেন সোহরাওয়ার্দি, আব্দুল হামিদ খান ভাসানি বা মৌলানা ভাসানি, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখদের নিয়ে সেদেশের প্রথম বিরোধী দল ‘আওয়ামি মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ১৯৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ প্রতিষ্ঠা করে নেতৃত্ব প্রদানে তাঁর স্বকীয়তাকে আপনাতেই প্রাসঙ্গিক করে তোলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম থেকেই পূর্ববঙ্গের সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সূচনাতেও আন্দোলন করে গ্রেফতার হয়েছেন তিনি।

শুধু তাই নয়, ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের নিয়ে আন্দোলন করে কারাবরণ করেছেন। ‘আওয়ামি মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠার সময়েও তিনি জেলে ছিলেন। অথচ তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁকে লীগের একনম্বর যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। অন্যদিকে শেখ মুজিব রাজনীতিতে বেঙ্গল মুসলিম লীগের অগ্রণী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে এসে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্নে সক্রিয় হয়েছিলেন। সেই স্বপ্নের মোহও তিনি একসময় কাটিয়ে ওঠেন। কেননা বিভেদকামী শক্তি দিয়ে দেশের মানুষকে যেমন আপন করা সম্ভব নয়, তেমনই তার সর্বজনীনতার অভাবে রাজনৈতিক ঐক্যও গড়ে তোলা অস্বাভাবিক। আসলে তাঁর মধ্যে অসম্প্রদায়িক উদারতাই শুধু নয়, নেতৃত্ব দেওয়ার মানবিক মুখেও কোনোরকম দোলাচল ছিল না। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, পরবর্তীতে ১৯৫৫-এর ২১ অক্টোবরে লিগের কাউন্সিল সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের সদিচ্ছায় ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দেওয়ায় ‘আওয়ামি লীগ’ সর্বজনীনতা লাভ করে। মুজিবর রহমানের সেই নেতৃত্ব প্রদানকারী জনপ্রিয় সংগ্রামী ভূমিকা উপন্যাসটিতে নানাভাবে উঠে এসেছে। তাঁর প্রতি আমজনতার আবেগ ও অনুরাগ এবং আস্থা ক্রমশ তাঁকে দেশের ত্রাতার আসনে আন্তরিক করে তোলে। সেখানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে উত্তরণে ঊনসত্তরের জনজাগরণের সংগ্রামমুখর সময়ের অনুবাদে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ইতিহাসের দলিল হয়ে ওঠে।
পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলন যেভাবে ক্রমশ তীব্রতার মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী মানুষের কণ্ঠে ভাষা জুগিয়েছে, সেভাবেই পাকিস্তান সরকার সেই মুক্তিকামী ভাষাকে নীরব করার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এজন্য সে দেশের সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারে আগ্রাসী শাসন নেমে আসে। সেখানে ভাষা আন্দোলনে ভাষার অধিকার মিললেও বাংলার অস্তিত্বকে পাকিস্তানীকরণ সম্পন্ন হয়। ১৯৫৫-তে পাকিস্তানের গণপরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সংবিধানে প্রদেশের নাম পূর্ব বাংলা, দেশের নামে ইসলামি প্রজাতন্ত্র না করা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের কথা জোরালোভাবে তাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরেন। অথচ ১৯৫৬-তে সেই গণপরিষদে প্রস্তাবিত পাকিস্তানের সংবিধানে কোনোটাকেই মান্যতা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ‘পূর্ববঙ্গ’ শুধু ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হয়ে গেল না, সেই বাংলাতেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ছায়া কায়া বিস্তার করে। সেক্ষেত্রে সেই বাংলার প্রাদেশিক সরকারও পরাধীনতাকেই উজ্জীবিত করে চলে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের আধিপত্যবাদী কায়েমী স্বার্থের শিকার হিসাবে সুদূরবর্তী পশ্চিমের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার দাসত্ব চেতনাই সেক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিমানসে স্বাধীনতাকামী করে তোলে। সেদিক থেকে প্রাদেশিক সরকারের অস্থিরতার পাশাপাশি পাকিস্তান সরকারে ক্ষমতার পালাবদলের তীব্র প্রভাবে পূর্ব পাকিস্তানের বিক্ষুব্ধ জনমানসে বিদ্রোহের মেঘ জমে উঠেছিল। সেক্ষেত্রে শুধু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অপেক্ষার ছিল ক্রান্তিকালের বিদ্রোহ। যার পরিণতি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অস্থিরতায় পূর্ব পাকিস্তানের উপর আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ তীব্রতর রূপ লাভ করে। ১৯৫৮-তে ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আয়ুব খানের নেতৃত্বে সারা দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। আবার সেই আয়ুব খানই রাষ্ট্রপতিকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে নিজেই ২৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আসনে সমাসীন হন।
১৯৬২-তে সামরিক শাসন প্রত্যাহারিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কঠোর মনোভাবের কোনো রকম পরিবর্তন ঘটেনি, বরং আরও নৃশংস হয়ে ওঠে। সেখানে যেকোনো ভাবে স্বাধীনতা-সংগ্রামকে প্রতিহত করার মরীয়া প্রয়াসে স্বাভাবিক ভাবেই নির্মম অমানবিক নিষ্ঠুরতা যেভাবে নেমে এসেছে, তেমনই তার প্রতিক্রিয়ায় গণআন্দোলনে অভিমুখে দেশের স্বাধীনতাই আন্তরিক হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে দেশনায়কের ভূমিকায় শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদী ভূমিকা বর্তমান। মূলত তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন জেগে ওঠে। এজন্য তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক প্রস্তুতিও বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৯৫৬-তে পূর্ব পাকিস্তানের জোট সরকারের মন্ত্রী হয়েও দলীয় কাজে বেশি করে সময় দেওয়ার জন্য মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মাধ্যম তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ক্রমশ তাঁকে জননেতার মান্যতায় আন্তরিক করে তোলে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে তাঁর অভিভাবকসুলভ ভাবমূর্তি স্বাভাবিক ভাবেই আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। ১৯৫৭-তে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ বেরিয়ে যান। অন্যদিকে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগেই থাকেন। দেশে সামরিক শাসন জারির সময়ে কয়েকবছর কারান্তরালে ও স্বগৃহে অন্তরীণ ছিলেন। সেদিক থেকে স্বাধীনচেতা শেখ মুজিব পাকিস্তানের সরকারের দেশের প্রধান বিরোধী বিদ্রোহী শক্তির লক্ষ্যে আপনাতেই নজর কেড়েছিলেন।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।