ভোগিলতা একটি গ্রামের নাম। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের বিন্দোল এলাকার বাংলাদেশ সীমান্তের গ্রাম। কাঁটা তারের এপারে বসতি আর ওপারে জমি। তখন দিনে ২/৩টি বাস যাতায়াত করতো এখন বলতে পারবো না।
ভোগিলতার রাজকুমারদার বাবার সাথে দুপুরে খেতে বসেছি। বৃদ্ধ বটে তবে কালো কূচকুচে পেটাই চেহারা। রাজবংশী ভাষাটা বুঝতাম, বলতে পারতাম না। তুমি আপনি মিলিয়ে খুব আদুরে ভাষাটা বার বার শুনতে ইচ্ছা করে!
গ্রামীন সংস্কারে মেঝেটা জল ন্যাকরা দিয়ে মুছে পিড়েতে বসতে দিয়েছে দুজনকে। বাড়ীর মোটা চাল পালিশহীন। ফলে ধবধবে সাদা নয় একটু গোমরামুখো মেঘলা বেলার মতো। গরম ভাত থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে ফিনফিনে ধোয়া উঠছে। ভাতের উপরে একপাশে লাল টকটক করছে কিছু, সাথে নুন। দেখলাম বাড়ীর সর্ষের তেল গ্রামেই ভাঙ্গানো। প্রথমে বুঝি নি জিনিসটা ঠিক কি আমার ভাব দেখে বাবার বুঝতে বাকী নাই বললো,— খা ওটা গরীবের পাতের লেঠেল (ভাষাটা স্থানীয় ভাষায় ছিল)— ওটা লঙ্কার গুড়ো+তেল+নুন গরম ভাতে মেখে খেলে ডাল তরকারি কম লাগে।

সত্যি খেতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম লঙ্কার গুড়োই সত্য বাকী সব মিথ্যা! ভাত কতোটা খেয়েছিলাম মনে নাই তবে জল খেয়েছিলাম এক জগ। লঙ্কার গুড়ো বানানোটা দারুন ছিল— বাড়ীর শুকনো লঙ্কার ভ্যারাইটি দেখে অবাক। দেখে মনে হতো গাছের চেয়ে লঙ্কা বড়, গাছে পেকে লাল হবার পরে তাকে এই গরমের কাঠ ফাটা রোদে শুকিয়ে ঝুড়ঝুড়ে করে শুকনো বোটা এবং ভিতরের বীজ ফেলে হুলকিতে (এইটাই বলে বোধহয়— এক চিড়ে/মসলা কোটার এক পারম্পরিক সাধন) গুড়ো করা। ফলে পাউডার নয় একটু কুচো কুচো ভাব।
পরে অনেক স্থানীয় বাড়ীতে গরম রুটি আর চাটনির মতো লঙ্কার গুড়োর পেষ্ট খেতে দেখেছি উনাদের সাথে আমিও চেষ্টা করেছি তবে— যতবার দ্বীপ জালাতে যাই ততবার নিবে যায় মোর বাতি। কলকাতা মেট্রোসিটির জীবন রচনা আর আমার গ্রাম ভারতের জীবনশৈলী দরিদ্রতাকেও একটা একটা কালচার বানিয়ে নিয়েছে। শিব শিব শিব।
স্বাধীনতার ৭৫ বৎসরের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে সংসদে, বিধান সভায়, সেজে উঠবে সড়ক। আমার গ্রাম ভারত জানি না আজও লঙ্কার গুড়োকেই সব্জী হিসাবে ব্যবহার করে কিনা অবশ্য ঠিক জানতেও ইচ্ছে করে না কারন পাছে আয়নার সামনে মাথা তুলে দাড়াতে না পারি! মাথা ঝুকে থাকলে চুলে টেরি কাটবো কি ভাবে!

দুই
লড়াইটা কৃষির কর্পোরেটেজাইশন ও খাদ্যের ইন্ডাষ্ট্রিয়ালাইজেশনের বিরুদ্ধে। আজ কৃষির কর্পোরেটাইজেশন নয় খাদ্যের ইন্ডাষ্ট্রিয়ালাইজেশন। আমরা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ফুডের বিরুদ্ধে ন্যাচারাল ফুডের পক্ষে। ন্যাচরাল কৃষি, ন্যাচরাল ভ্যালুএডিশন, ন্যাচরাল ফুড এটি আমাদের ভাবনা, সিদ্ধান্ত, অনুশীলন। আপনি এমনটি ভাববেন কিনা সেটা একদম আপনাদের ব্যাপার, আপনার পরিবারের স্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত একদমই আপনার ব্যেক্তিগত, আর প্রকৃতিক খাদ্যের অনুশীলনে আপনি অভিভাবক হিষাবে কতটা সফল তাতেও আমাদের খুব একটা চিন্তার কারন নেই। আমরা আমাদের দায়ীত্বটা পালন করছি মাত্র— ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ফুডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানটা প্রতিপক্ষ হীন নয়! অর্থ, আইন, আইন প্রনেতা, বিচার ব্যবস্থা এক দিকে আর এক দিকে মঙ্গলু আমি জংলি আমি পাহাড় দেশে থাকি! প্রথমে ওরা খাদ্য আর কৃষিকে আলাদা করলো, তারপর খাদ্যকে ন্যাচরাল আর ইন্ডাষ্ট্রিয়াল করলো, এবার কৃষি আর কৃষককে আলাদা করতে চাইছে! সবটাই জনতা জনার্দনের মঙ্গলের নিমিত্তে— জনতাই বুঝে নিক কি দরকার বোকাদের এতো উদ্বিগ্ন হবার।
আমাদের লঙ্কার গুড়ো তৈরীর আগে একটি করে লঙ্কার শুকনো বোটাগুলোকে আলাদা করা হয় রোদে দিয়ে ফাটিয়ে বীজগুলোকেও আলাদা করা হয় শুধু লাল পাতা আর ভীতরের শাসটা। এতোটা না করলেও চলে ইন্ড্রাষ্ট্রিয়াল ফুডে তো এমন করেনা দিব্যি টন টন লঙ্কার গুড়ো বিক্রী হচ্ছে। ওদের মেসিনে সব গুড়ো হয়— লঙ্কার বোটা, লঙ্কার বীজ, লঙ্কার বস্তায় থাকা কচড়া, খাদ্য গ্রহন কারীর স্বাস্থ্য, সামাজীক দ্বায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য চেতনা! তাতেও চলে না ইন্ডাষ্ট্রিয়াল কালার পরিমান বাড়াতে খরচ কমাতে আরো কত কি, আমাদের মেসিনে অতোটা ধরে না তাই সব বাদ দিয়ে খালি শুকনো ফ্লেক্সটা নেওয়া হয়েছে কারন এখানে এমনি গুড়ো হতে চায় না, সব মহিলা করতেও চায় না, সব শেষে হাতে পাই ১ কেজি লঙ্কা থেকে ৪৮০ গ্রাম থেকে ৫৫০ গ্রাম লঙ্কার ফ্লেক্সের কুচি কুচি টুকরো। হ্যান্ড মেড হোম মেড— প্রশাষনিক খাদ্য সংগায় এমন শব্দটাই নেই তাই আমাদের কোন কাগজও নেই। ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ফুড ব্যবস্থা এক অদ্ভূত ব্যবস্থা ওদের নিজেরটাই ঠিক আর ওরা যেটা বলে দেবে সেটাই শেষতম জ্ঞান যেন সদ্য মানব সভ্যতা ঘুম থেকে উঠেই প্রথম খেতে বসেছে। সমাজও মেনে নিয়েছে— সং সেজে মনোহারিত্যের পেশাদারীরাই ঠিক করছে কোন খাবারটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক। হার্ট ভালোর তেল বেচতে বেচতেই তিনটে ভাল্ভই ব্লক।

শুকনো লঙ্কা আর্থারাইটিস বা বাতের ব্যাথায় উপকার দেয় এতে থাকা ক্যাপসাইন যে কোন ধরনের মাসল পেইন, জয়েন্ট পেইন, অস্টিও আর্থারাইটিসের যন্ত্রনাতে আরাম দেয়। ভিটামিন ‘এ’ থাকার কারনে চোখের রেটিনার ক্ষয় রোধ করে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ক্যাপসিসাইন থাকার কারনে যৌন উত্তেজনা বাড়াতে সহায়ক, এন্ডোরফিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে যৌন চাহীদা বাড়াতে সহায়ক, মুখের লালা গ্রন্থীকে সতেজ ও সুস্থ্য রাখে, নাসিকা নালি পরিস্কার রাখে, অন্ত্র ও মূত্র নালিতে এবং ফুসফুসের সংক্রমন প্রতিরোধ করে, কোলেস্টেরল কমাতে সহযোগীতা করে, প্লেট লেট বা অনুচক্রিকাকে জমাট বাধতে দেয় না, রক্তে ট্রাইগ্লিসারেট মাত্রা কমায়, ধমনীকে প্রসারিত করে, হাইপারটেনশন কমায় এ সবের কারনে রক্তে চাপ কমে এবং স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে। কপার, পটাশিয়াম, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-বি৬ যা আমাদের এনার্জি বুষ্টআপ করে, ভিটামিন-কে এর উপস্থিতিও আছে। তবে যাদের গ্যাস, অম্বল, জন্ডিস, আলসারের প্রবনতা আছে তার লোভ সংবরন করতে হবে। শরীর সুস্থ সতেজ তেজ দৃপ্ত ও সাধকি রাখতে হবে কারন আপনি কেবল আপনার নিজের বা আপনার পরিবারের নন আপনি আমাদের রাষ্ট্রীয় (সরকারি নয়) সম্পদ তাই ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ফুড না— ন্যাচরাল ফুড হ্যাঁ।
লংকার বীজ টা কেন ফেলে দেওয়া হল তা বুঝতে পারলাম না। বাকীটা বেশ উৎসাহ নিয়ে পড়লাম। তবে দীপ জ্বালাতে চেষ্টা করবো না।