কল্যাণ সেনগুপ্ত
অতীতে আমাদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনেক দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও সেনা প্রধানরাই তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে সাবধানবানী উচ্চারণ করেছেন যে, ভারতের পক্ষে প্রধান বিপদ হতে পারে চীন, কিন্তু আমরা পাকিস্তানকে নিয়েই সর্বদা ব্যস্ত থাকি। কারণ, পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী তথা সেনাবাহিনীর প্রভাবশালী অংশও ভারত বিরোধীতার সুর চড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে চেয়েছে। বরং বর্তমান পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান ইমরান খানের মুখে প্রথমদিকে যথেষ্ট ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের বর্তমান শাসকদল তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি। কারণ, মুসলিম ও পাকিস্তান বিরোধীতাই তাদের রাজনীতির প্রধান মূলধন বা মূলনীতি। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্যতার সম্ভবনা এখন বিশ বাউ জলে। কিন্তু আজকের আলোচ্য বিষয় হোল- চীন।
চীন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বছর কয়েক আগে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধন বলেছিলেন, চায়না ইজ এ ক্যাপিটালিস্ট কান্ট্রি রান বাই এ কমিউনিস্ট পার্টি। অর্থাৎ মানুষকে গণতান্ত্রিক অধিকার দেওয়া হয়নি, কিন্তু ব্যক্তি পুঁজি বা কর্পোরেট পুঁজির শোষনকে পুরো মাত্রায় চালু করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রের নামে এতবড় ব্যভিচার আর কিছু হয়না। মাও জমানায় নানাবিধ বিতর্কিত পদক্ষেপের ফলে দেশের অর্থনীতির চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। এরই সাথে মাওয়ের জীবদ্দশার শেষ পর্যায়ে তাঁর শারীরিক অসহয়াতার সুযোগ নিয়ে এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক ডামাডোল তৈরি হয় ও অবশেষে তাঁর স্ত্রীর নেতৃত্বাধীন চারচক্রীর পতন হয়। আবির্ভাব ঘটে দেঙ নামক এক নয়া চিন্তাধারার নেতার। তিনি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোয় বাজার অর্থনীতি চালু করেন। দুনিয়ার সর্বাধিক সফল এস.ই.জেড চালু আছে এখানেই। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন প্রচন্ড সফল হলেও এরচেয়ে বড় নীতিগত সুবিধাবাদীতা আর কিছু হতে পারেনা। এর নয়া নামকরণ হয়েছে – সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি। এই চরম সুবিধাবাদী শাসনব্যবস্থার আপাতঃ সফলতা গোটা বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান চীনের মানুষের ‘অন্ন-বস্ত্র-ছাদ’ এর সমস্যা মিটলেও গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা মেলেনি। কিন্তু ভারতসহ বিশ্বের কাছে চীন এখন আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে চাইছে।
এহেন চীন আর্থিকভাবে পরাক্রমশালী হতে পেরেছে ভারত, ইউরোপ-সহ বিশ্বের বহুদেশে সস্তায় মাল রপ্তানি করে। আর্থিকভাবে দুর্বল বহুদেশকে প্রভূত পরিমানে ঋণ দিয়ে চীনের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য করেছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচন্ড প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় চীনকে প্রতিহত করার উপায় একমাত্র তার রপ্তানি ব্যবসার বিজয় রথকে প্রতিরোধ করা বা যথাসম্ভব আটকানো। আর ব্যবসা মার খেলেই পুঁজির মালিকরা সরকারকে চাপ দেবে সর্বত্র শান্তি ও সদ্ভাব বজায় রাখার জন্য। আর পুঁজির মালিকদের তো ট্যাংক চালিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবেনা, ফলে চীনের আধিপত্য বিস্তার ও আগ্রাসী নীতি থেকে সরে আসতে হবে। হংকংয়ের স্বাধীনতার দাবী আরও জোরদার হবে। মানুষের গণতন্ত্রের ক্ষিদে বাড়বে। ফলে দলীয় একনায়কতন্ত্র দুর্বল হবে, এমনকি বিলুপ্তও হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে।